আর্থার মিলারের ‘ডেথ অফ অ্যা সেলসম্যান’ ও ঢাকার মঞ্চ
আর্থার মিলার ছিলেন বিংশ শতাব্দীর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ মার্কিন নাট্যকার ও প্রাবন্ধিক। যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কে ১৯১৫ সালের ১৭ অক্টোবর জন্মগ্রহণ করেন তিনি। ২০০৫ সালের ১০ ফেব্রুয়ারি তাঁর মৃত্যু হয়। মিলারের নাট্য রচনায় সাধারণ মানুষের জীবন, স্বপ্ন, সামাজিক চাপ, নৈতিক সংকট ও আমেরিকান সমাজের বৈষম্য উঠে এসেছে। তাঁর রচিত বিখ্যাত নাটকগুলোর মধ্যে রয়েছে ডেথ অফ অ্যা সেলসম্যান, দ্য ক্রুসিবল, অল মাই সনস, অ্যা ভিউ ফ্রম দ্য ব্রিজ।
আর্থার মিলারের নাটক মূলত ব্যক্তি ও সমাজের সংঘাত, স্বপ্ন ও বাস্তবতার দ্বন্দ্ব এবং মানুষের নৈতিক দায়বদ্ধতা নিয়ে। ডেথ অফ অ্যা সেলসম্যানও তার ব্যতিক্রম নয়। এটি মিলারের ১৯৪৯ সালে রচিত একটি বিখ্যাত ট্র্যাজেডি। নাটকটি একজন সাধারণ সেলসম্যান উইলি লোম্যান ও তাঁর পরিবারের জীবনকে কেন্দ্র করে। উইলি বিশ্বাস করেন, জনপ্রিয়তা ও ব্যক্তিগত আকর্ষণই সাফল্যের প্রধান চাবিকাঠি। কিন্তু বাস্তব জীবনে তাঁর স্বপ্ন ও প্রত্যাশা বারবার ভেঙে যায়। তাঁর বড় ছেলে বিফের সঙ্গে সম্পর্কের টানাপোড়েন নাটকের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক। নাটকটিতে বর্তমান সময়ের সঙ্গে উইলির অতীতের স্মৃতি ও কল্পনা মিশে যায়। শুধু অর্থনৈতিক সাফল্য বা সামাজিক স্বীকৃতিকে জীবনে সাফল্যের মাপকাঠি করলে মানুষ কীভাবে নিজের ও পরিবারের কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়তে পারে, এই নাটকটি মূলত সেই মানবিক সংকটের গল্প। ১৯৪৯ সালে নাটকটি পুলিৎজার এবং টনি এ্যাওয়ার্ড অর্জন করে।
নাট্যকেন্দ্র ১৯৯৪ সালের ১৪ জুলাই তারিক আনামের নির্দেশনায় আর্থার মিলারের 'ক্রুসিবল' মঞ্চে আনে। নাটকটির সর্বমোট ২৭টি প্রদর্শনী হয়েছিলো। আমি দেখেছিলাম বেইলী রোডের গাইড হাউস মঞ্চে। এখনো নাটকটির সেট ডিজাইন ও তারিক আনাম খানের অভিনয় মনে গেঁথে আছে।
দীর্ঘ সময় পর নতুন নাট্যদল থিয়েটারিয়ান আর্থার মিলারের 'ডেথ অফ অ্যা সেলসম্যান' মঞ্চে এনেছে। ১৮টি প্রদর্শনীর পর দীর্ঘ প্রায় দুই বছরের বিরতির দিয়ে পুনরায় গত ১৭ সেপ্টেম্বর শিল্পকলা একাডেমিতে নাটকটির ১৯তম প্রদর্শনী হলো। ২০২০ সালের মহান বিজয় দিবসে থিয়েটারিয়ান-এর পথচলা শুরু। প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী, দেশ-বিদেশের মানসম্পন্ন নাটক মঞ্চে আনবে থিয়েটারিয়ান। একটি প্রগতিশীল উদারনৈতিক দেশ গঠনের বার্তা দিতে থিয়েটারই হবে থিয়েটারিয়ানের প্রধান বাহন।
‘ডেথ অব এ সেলসম্যান’ সম্পর্কে নির্দেশক আশিকুর রহমান লিয়ন বলেন, 'প্রযোজনাটি দর্শকের সামনে শুধুমাত্র একটি নাট্যশিল্পকর্ম হিসেবে কখনই আমরা উপস্থাপন করতে চাই না। বরং চেয়েছি পুঁজিবাদী সমাজে যেখানে আমাদের আবাস, সেখানে প্রতিমুহূর্তে যে নিরন্তর লড়াই করে আমরা বেঁচে থাকার চেষ্টা করি বা মারা যাই—সেই ট্র্যাজিক বাস্তবতার নির্যাস কিছুটা হলেও যাতে ধরা দেয়। প্রযোজনার প্রতিটি পরতে পরতে পুঁজিবাদী সমাজে আমরা কিভাবে বেঁচে আছি আর কিভাবে মারা যাই—প্রতি মুহূর্তে সে বিষয়েই প্রশ্ন করে চলে।'
দলের প্রথম প্রযোজনা হিসেবে থিয়েটারিয়ান যথেষ্ট সাহস দেখিয়েছে। ২ ঘন্টা ১০ মিনিট ব্যাপ্তির নাটকের শুরু এবং কোথাও কোথাও এখনো কাটছাঁট করার সুযোগ রয়েছে। যদিও মূল নাটকের দৈর্ঘ্য প্রায় ৪ ঘন্টা ৩০ মিনিট। চিত্রনাট্যের সম্পাদনা এবং নির্দেশকের মুন্সিয়ানায় প্রযোজনাটি অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠেছে। নাটক দেখে কখনোই মনে হবেনা যে, এটি আলাদা কোন গল্প। গল্পের সাথে দর্শক এমনভাবে যুক্ত হবে যেন সেও নাটকের একটি চরিত্র। এটিই মূলত এই নাটকের শক্তিশালী দিক। সংলাপ ও অভিনয় নির্ভর নাটক হিসেবে এটি প্রশংসার দাবিদার। উইলি লোম্যান চরিত্রের অভিনেতা তৌহিদ বিপ্লব যথেষ্ট পরিশ্রম করেছেন চরিত্র নির্মাণে। তিনি এই চরিত্রে অনবদ্য। কোথাও কোথাও অভিনেতা চার্লি চ্যাপলিন অথবা মিস্টার বিনকে অনুকরণ করছেন বলে মনেহয়। তাতে সমস্যার কিছু নেই। তবে আরেকটু ধীর স্থির হতে পারতো চরিত্রটি, বিশেষকরে আঙ্গিক ও বাচিক অভিনয়ে। পলি চৌধুরী উইলি লোম্যানের স্ত্রী লিন্ডা চরিত্রে বেশ সাবলীল ও আকর্ষণীয় ছিলেন। উইলির বড় ছেলে বিফ লোম্যান চরিত্রে মো: মাইনুল ইসলাম সুন্দর অভিনয় করেছেন। এছাড়া অন্যান্য চরিত্রগুলো যথেষ্ট চেষ্টা করেছেন। সবাইকে অনুরোধ থাকবে বাচিক অভিনয়ে গুরুত্ব দিতে এবং তাড়াহুড়ো না করতে। আপনারা নিজের ও চরিত্রের উপর আস্থা রাখুন। অভিনয়ের শেষ বলে কিছু হয় না।
বিশাল আয়োজনের মঞ্চ পরিকল্পনা, আবহসংগীত, আলো ও পোশাক পরিকল্পনা চোখে পড়ার মতো। বিশেষকরে, টাইম ট্রাভেলের জায়গাগুলো বেশ উপভোগ্য ছিলো। সুভ্যিনিরের লেখাগুলো পড়তে সমস্যা হয়। আশাকরি ভেবে দেখবেন।
ঢাকার মঞ্চে এমন একটি প্রযোজনা নিয়মিত হওয়া জরুরি। আমি থিয়েটারিয়ানের সঙ্গে যুক্ত প্রত্যেককে সাধুবাদ জানাতে চাই মঞ্চে এতো চমৎকার একটি প্রযোজনা উপহার দেওয়ার জন্য।
লেখক অভিনেতা ও গণমাধ্যমকর্মী

পাভেল ইসলাম