নরসিংদীর ‘জঙ্গি আস্তানা’ ঘিরে যা যা হলো

কোনো রকম সংঘর্ষ, হামলা-পাল্টা হামলা ও রক্তপাত ছাড়াই শেষ হয়েছে র্যাব-১১ দীর্ঘ ১৮ ঘণ্টার অভিযান। নরসিংদীর শহরের গাবতলী উত্তরপাড়া এলাকায় জঙ্গি আস্তানা সন্দেহে ঘিরে রাখা বাড়িটিতে অবস্থানরত পাঁচজনকে আত্মসমর্পণের মধ্য দিয়ে শেষ হয় এই অভিযান।
ওই বাড়ি বা আশপাশ থেকে কোনো ধরনের অস্ত্র বা গোলাবারুদ পায়নি র্যাব। তবে আত্মসমর্পণকারীদের সঙ্গে সিলেটের আতিয়া মহলের জঙ্গি সদস্যদের যোগসূত্র রয়েছে বলে র্যাবের দাবি। কিন্তু স্বজনদের দাবি, ভিন্ন। তারা বলছে, তাদের সন্তানরা জঙ্গিবাদের সঙ্গে জড়িত নয়। পড়াশোনার সুবাদে তারা সেখানে থাকত।
গতকাল শনিবার বিকেলে গাবতলী উত্তরপাড়া এলাকার দুবাই প্রবাসী মঈন উদ্দিনের মালিকানাধীন একতলা বাড়ি ঘেরাও করে র্যাব-১১ একটি দল। পরিস্থিতি মোকাবিলায় রাতেই আশপাশের বাসিন্দাদের সরিয়ে নেওয়া হয়। জারি করা হয় ১৪৪ ধারা।
পরে একে একে পাঁচজনকে ওই বাড়ি থেকে বের করে আনা হয়। অধিকতর জিজ্ঞাসাবাদের জন্য তাদের র্যাব-১১ কার্যালয়ে নিয়ে যাওয়া হয়।
র্যাবের কাছে আত্মসমর্পণকারী পাঁচ যুবক হলেন নরসিংদীর চরদিঘলদী গ্রামের আবদুর রহমানের ছেলে সালাহউদ্দিন, সদর উপজেলার চরভাসানিয়া এলাকার নুরুল ইসলামের ছেলে বাছিকুল ইসলাম, নারায়ণগঞ্জের আড়াইহাজার উপজেলার আবদুর রাজ্জাকের ছেলে আবু জাফর, গাজীপুরের বোর্ডবাজার এলাকার আবদুল মজিদের ছেলে মাসুদুর রহমান ও কিশোরগঞ্জের ভৈরব এলাকার মশিউর। এঁদের মধ্যে বাছিকুল ইসলাম, মাসুদুর রহমান ও মশিউরকে আজ সন্ধ্যায় ছেড়ে দিয়েছে র্যাব।
ফেসবুকে স্ট্যাটাস : গতকাল রাতে ঘেরাওয়ের সময় সন্দেহভাজন জঙ্গি আস্তানা থেকে আবু জাফর নামের একজন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে স্ট্যাটাস দিয়ে প্রধানমন্ত্রীর কাছে সাহায্যের আবেদন জানান। তিনি লিখেন, ‘মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, আমাদের বাঁচান। আমরা নিরপরাধ। আমরা আওয়ামী লীগের কর্মী। আমরা ষড়যন্ত্রের শিকার। প্লিজ আমাদের বাঁচান। আমরা সাধারণ ছাত্র। প্লিজ, আমাদের উদ্ধার করুন।’
আবু জাফর মিয়া ফেসবুকে আরেকটি স্ট্যাটাসে লিখেন, ‘সাংবাদিক ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর স্যারদের উদ্দেশ্য করে বলছি, আমরা নিরপরাধ। আমরা কখনো শিবির, জঙ্গিবাদ সম্পর্কে ভালো করে জানিও না। আপনারা আমাদের সার্চ করুন। দেখুন কিছু পান কি না। বাইরে থেকে আমাদের ছিটকানি লাগানো। প্লিজ, ছিটকানি খুলে আমাদের উদ্ধার করুন।’
র্যাব ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, নরসিংদীর গাবতলী উত্তরপাড়া এলাকার দুবাই প্রবাসী মঈন উদ্দিনের বাড়ির কাছে দেশের সর্ববৃহৎ ইসলামী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নরসিংদী জামেয়া কাশেমিয়া ইসলামিয়া মাদ্রাসা। আটক সালাউদ্দিন ওই মাদ্রাসার কামিল শ্রেণির ছাত্র পরিচয় দিয়ে গত ৩ মে মঈন উদ্দিনের বাড়িটি ভাড়া নেন। এরপর ওই বাড়িতে সালাউদ্দিন চার থেকে পাঁচজন নিয়ে বসবাস করছিলেন।
অভিযান শেষে আজ বেলা ১১টায় র্যাবের গণমাধ্যম শাখার পরিচালক কমান্ডার মুফতি মাহমুদ খান সাংবাদিকদের বলেন, ‘যুবকদের আত্মসমর্পণ করানোই ছিল আমাদের মূল উদ্দেশ্য। তা ছাড়া সিলেটের আতিয়া মহলে যে জঙ্গিরা ছিল তাদের সঙ্গে এখানে অবস্থানরতদের যোগসূত্র রয়েছে। তার কিছু প্রমাণ আমরা পেয়েছি। আমরা মোটামুটি নিশ্চিত এই পাঁচজনের মধ্যে কয়েকজন সেই জঙ্গিদের সঙ্গে সম্পৃক্ত।’
বাড়িতে কিছু উদ্ধার প্রসঙ্গে র্যাব কর্মকর্তা বলেন, ‘ওই বাড়ির তিনটি কক্ষ তল্লাশি করে কোনো অস্ত্র বা বিস্ফোরক পাওয়া যায়নি। আমরা আটকদের জিজ্ঞাসাবাদ করে তথ্য পাওয়ার চেষ্টা করব।’
ছুটে আসেন স্বজনরা : জামেয়া কাশেমিয়া ইসলামিয়া মাদ্রাসার দশম শ্রেণিতে পড়ে মাসুদুর রহমান। মাসুদুর রহমান বলে, প্রাইভেট পড়তে সে বিকেলে ওই বাড়িতে গিয়েছিল। সন্ধ্যার আগ মুহূর্তে বাসা থেকে বের হতে গিয়ে দেখে, দরজার বাইরে দিয়ে ছিটকিনি লাগানো। জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে দেখে চারদিকে র্যাব ঘেরাও করে রেখেছে। তারা ভেবেছিল, কোনো ঘটনা ঘটছে এই জন্য পুলিশ দরজা লাগিয়েছে। এরপরও সে দেড় ঘণ্টার মতো সেখানে পড়াশোনা করে। কিন্তু মাগরিবের নামাজের পর দেখে, আস্তে আস্তে বাড়ির সামনে আরো পুলিশ সদস্য জড়ো হচ্ছে। বাইরে থেকে ফোন পায়, এখানে নাকি জঙ্গি পাওয়া গেছে। ফোন দেওয়ার পর সে জানতে পারে, তাদের ঘিরে রাখা হয়েছে। পরে সে সবাইকে ফোন দেয়।
খবর পেয়ে রাতেই ঘটনাস্থলে যান মাসুদের বড় ভাই ব্যাংক কর্মকর্তা আবদুর রহমান মাসুম। তিনি বলেন, মাসুদ আগে গাজীপুরের পোড়াবাড়ির একটি মাদ্রাসায় পড়ত। বছর দুই আগে সে গাবতলীর এই মাদ্রাসায় ভর্তি হয়ে পড়াশোনা চালিয়ে যাচ্ছে। তিনি আরো বলেন, ‘মাসুদ দাখিল পরীক্ষার্থী। সে সালাহউদ্দিনের কাছে প্রাইভেট পড়তে ওই বাড়িতে গিয়েছিল। সে জঙ্গিবাদের সঙ্গে যুক্ত নয়। তাকে জীবিত অবস্থায় বের করে আনেন। অপরাধী হলে আইন অনুযায়ী তার বিচার করুন।’
একই কথা বলেন আবু জাফরের ভাই আবদুল্লাহ। তিনি বলেন, ‘পাঁচ ভাইয়ের মধ্যে জাফর দ্বিতীয়। এখানে থেকে চাকরির চেষ্টা চালাচ্ছেন। রাতেই ওই বাসায় আটকা পড়ার কথা জানান। ফোন পেয়ে আমরা এইখানে আসছি। আমার ভাই, জঙ্গি না। র্যাব পুলিশ চাইলে আমরা ভেতরে গিয়ে তাদের নিয়ে আসতে পারি।’
জোসনা বেগম নামের স্থানীয় এক বাসিন্দা বলেন, ‘ওই বাসায় মেস করে কয়েকজন যুবক থাকে। তারা এলাকার বেশ কয়েকটি বাড়িতে প্রাইভেট পড়াত। তারা জঙ্গিবাদের সঙ্গে জড়িত এমন কর্মকাণ্ড চোখে পড়েনি।
যেভাবে আত্মসমর্পণ
রোববার সকাল ৯টার দিকে র্যাব কর্মকর্তা মুফতি মাহমুদ খান ঘটনাস্থলে সাংবাদিকদের বলেন, ভেতরে অবস্থানকারীদের সঙ্গে তাদের কথা হয়েছে। তারা আত্মসমর্পণে প্রস্তুত বলে জানিয়েছে। তিনি বলেন, ‘আমরা সব দিক দিয়েই চেষ্টা করছি, যাতে এখানে সর্বোচ্চ নিরাপত্তাটা থাকে। সবদিক থেকেই চেষ্টা করছি তাদেরকে আত্মসমর্পণ করানোর জন্য। তাদের স্বজনদের সঙ্গে কথাবার্তা বলে আমরা এটা চেষ্টা করছি।’
অভিযান শেষে মুফতি মাহমুদ খান সাংবাদিকদের বলেন, ওই এলাকা ঘনবসতিপূর্ণ হওয়ায় সার্বিক নিরাপত্তা বিবেচনা করে তারা রাতে অভিযান স্থগিত রাখেন। তারা তাদের আত্মীয়স্বজনকে ভেতরে নিয়ে যান। তাদের সঙ্গে কথা বলার পর যুবকরা আত্মসমর্পণ করতে রাজি হয়।
ওই যুবকরা জঙ্গি নয়- পরিবারের এমন দাবির বিষয়ে র্যাব কর্মকর্তা বলেন, অনেক সময় পরিবারও জানতে পারে না যে তারা জঙ্গিবাদে জড়িত। এ রকম ঘটনা আগে আরো ঘটেছে। হলি আর্টিজানসহ বিভিন্ন অভিযানে যারা নিহত হয়েছে, তাদের পরিবারও কিন্তু বিশ্বাস করতে পারে নাই। পরিবারের চিন্তার বাইরেই ছিল তার সন্তানরা জঙ্গিবাদে জড়িয়ে গেছে।
ওই র্যাব কর্মকর্তার দাবি, সুনির্দিষ্ট তথ্যের ওপর ভিত্তি করেই তারা এই অভিযান চালিয়েছেন। যুবকদের জিজ্ঞাসাবাদ করলে বাকিটা জানা যাবে।
বাড়ির মালিকের বরাত দিয়ে মুফতি মাহমুদ খান জানান, গত ৩ মে ওই বাসা ভাড়া নেওয়া হয়েছিল। তবে যারা ভাড়া নিয়েছিল তারা ছাড়াও আরো কয়েকজনের যাতায়াত ছিল সেখানে। তারা ভাড়া নেওয়ার সময় কিছু কাগজপত্র দিয়েছিল। বলেছিল চার থেকে পাঁচজন থাকবে। কারা কারা থাকবে তাও সুনির্দিষ্ট করে বলেছিল। কিন্তু তারা যখন আত্মসমর্পণ করেছে তখন দেখলাম আরো কিছু নতুন ফেইস এখানে যুক্ত হয়েছে।