বাণিজ্যমেলায় নজর কাড়ছে হারানো দিনের রঙিন জানালা বায়োস্কোপ

‘তোমার বাড়ির রঙের মেলায় দেখেছিলাম বায়োস্কোপ, বায়োস্কোপের নেশায় আমায় ছাড়ে না’—জনপ্রিয় সেই গানে বায়োস্কোপ থাকলেও, বাস্তবে এটি প্রায় বিলীন। একসময় গ্রাম বাংলার প্রতিটি মেলায় দেখা মিলত বায়োস্কোপের। ছবি-গল্পের সুর আর ছন্দের তালে তালে ধারা বিবরণী চলত বায়োস্কোপওয়ালার। কাঠের বাক্সে চোখ লাগিয়ে গানের তালে ছবি দেখার দৃশ্য নগরজীবনে এখন আর চোখেই পড়ে না। একসময়ের ভ্রাম্যমাণ বিনোদনের বাক্স, বায়োস্কোপের দিন ফুরিয়েছে অনেক আগেই। কিন্তু ঐতিহ্য চেনাতে প্রায় ৩০ বছরেরও বেশি সময় ধরে দেশের বিভিন্ন জেলায় জেলায় ঘুরে বেড়াচ্ছেন মো. মাঈন উদ্দিন (৫২)।
এবার সেই বিলীন প্রায় দুর্লভ বায়োস্কোপের দেখা মিলেছে কিশোরগঞ্জে। নতুন প্রজন্মের কাছে বায়োস্কোপ পরিচয় করিয়ে কিছু অর্থ উপার্জনের আশায় কিশোরগঞ্জের শহীদ সৈয়দ নজরুল ইসলাম স্টেডিয়ামের আওটারে মাসব্যাপী শিল্প ও বাণিজ্যমেলায় রাজধানী ঢাকা থেকে এসেছেন মো. মাঈন উদ্দিন (৫২)।
সরেজমিনে মেলায় দেখা গেছে, মাঈন উদ্দিনের বায়োস্কোপ ঘিরে উৎসুক মানুষের ভিড়। কেউ কেউ বায়োস্কোপের ছবি তুলছে, কেউ বা ভিডিও করছে। অভিভাবকরা দাঁড়িয়ে থেকে শিশুদের দেখাচ্ছেন বায়োস্কোপ, সেই সঙ্গে নিজেরাও ফিরে যাচ্ছেন শৈশবের সেই স্মৃতিতে। মাঈন উদ্দীনের পরনে বাহারি রঙের পোশাক, এক হাতে খঞ্জনি ও অন্য হাতে বায়োস্কোপের রিলের চাবি। সেই চাবি ঘোরানো আর গানের তালে পাল্টে যায় বায়োস্কোপের ভেতরের দৃশ্য। বায়োস্কোপ দেখে নয়া-পুরান অভিজ্ঞতার কথা জানিয়েছেন, মেলায় ঘুরতে আসা বৃদ্ধ-খোকা সবাই।
ফাতিহা ইসলাম (১১) নামের এক স্কুলছাত্রী বায়োস্কোপ দেখে এনটিভি অনলাইনকে বলেন, ‘আমি এর আগে কখনও বায়োস্কোপ দেখিনি। এবারই প্রথম দেখলাম। আমি আমার দাদা-দাদুর কাছে বায়োস্কোপের অনেক গল্প শুনেছি। আজ নিজ চোখে দেখলাম, এর মধ্যেও অনেক কিছু শেখার আছে, আমার খুব ভালো লেগেছে।’
বায়োস্কোপ দেখে আশরাফুল ইসলাম (৪৫) নামের একজন বলেন, ‘আমরা ছোটবেলায় যখন বাবা-দাদাদের সঙ্গে পাড়া, মহল্লা ও বিভিন্ন গ্রামীণ মেলায় ঘোরাফেরা করতাম তখন এই বায়োস্কোপ দেখতাম। বায়োস্কোপ তখনকার সময়ে আমাদের বিনোদনের এক অন্যতম মাধ্যম ছিল। খুব ভালো লাগত এটা দেখতে। এখন আর আগের মতো চোখেই পড়ে না বায়োস্কোপ। তবে আজ আবার এটা দেখে সেই শৈশবের দিনগুলোতে ফিরে গেলাম।’
৩০ বছরেরও বেশি সময় আগে এই পেশায় যুক্ত হয়েছিলেন মো. মাঈন উদ্দিন। তিনি জানান, একসময় বায়োস্কোপ দেখিয়ে স্বাচ্ছন্দ্যে সংসার চলত। কিন্তু এখন আর এই পেশায় আগের মতো জৌলুস নেই। ফলে এ পেশায় অল্প যে কয়জন যুক্ত ছিলেন, তারাও ছেড়ে দিয়েছেন অনেকদিন আগেই। কিন্তু হাল ছাড়েননি মাঈন উদ্দিন।

মাঈন উদ্দিন বলেন, ‘সংসার চালানো তো দূর, একা খেয়ে-পরে বেঁচে থাকাই দায়। কিন্তু ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে বাংলার এ ঐতিহ্য পরিচয় করিয়ে কিছু অর্থ উপার্জনের আশায় এখনও মেলায় মেলায় ঘুরে বেড়াই বায়োস্কোপ নিয়ে।’
নিত্য নতুন সব উদ্ভাবনী প্রযুক্তি আর ইন্টারনেটের মায়াজালে জিম্মি হয়েছে নতুন প্রজন্ম। যার ফলে এখন আগের মতো খুব একটা দেখা মেলে না বায়োস্কোপের। এক সময়ের জনপ্রিয় গ্রামীণ লোকজ সংস্কৃতির এ বস্তুটি ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে পরিচয়সহ নিজেদের ঐতিহ্য ধরে রাখতে, সম্মিলিত প্রচেষ্টা প্রয়োজন বলে মনে করছেন সচেতন মহল।
কিশোরগঞ্জ গুরুদয়াল সরকারি কলেজের বাংলা বিভাগের প্রভাষক মো. আবুল বাশার (সৌরভ) বলেন, একটা সময় বায়োস্কোপ লোকজ সংস্কৃতির বিনোদনের একটা গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম ছিল। এখন এটা নাই, আর না থাকার কারণে, নতুন প্রজন্মের ছেলে-মেয়েরা মুঠোফোনে ইন্টারনেট সংযোগ দিয়ে প্রতিনিয়ত পৃথিবী চষে বেড়াচ্ছে। যাতে করে তাদের মুঠোফোনে আসক্তি বাড়ছে। তাই বায়োস্কোপের মতো এই বিনোদনমাধ্যমকে সংরক্ষণ করে নতুন প্রজন্মের সামনে তুলে আনা প্রয়োজন।
১৮৯৮ সালে মানিকগঞ্জের হীরালাল সেন প্রথম পেশা হিসেবে বায়োস্কোপ দেখাতে শুরু করেছিলেন। এরপর কালভেদে এ পেশায় জড়িয়েছিলেন অনেকেই। দীর্ঘদিন এটাই ছিল মানুষের কাছে এক অনন্য বিনোদনের মাধ্যম। তবে ঘড়ির কাটায় বদলেছে সময়, বাজারে এসেছে নতুন নতুন সব উদ্ভাবনী প্রযুক্তি। তবে আমাদের ভুলে গেলে চলবে না, বায়োস্কোপ শুধু একটি বাক্স নয়, এটি আমাদের শৈশবের গল্প, আর স্মৃতির জানালা। সেই জানালাকে এখনও জিইয়ে রেখেছেন মাঈনুদ্দিনের মতো মানুষেরা। যারা পেশার দায়ে নয়, শুধু ভালোবাসার টানেই এখনও ঘুরিয়ে চলেছেন বায়োস্কোপের রিলের চাবি।