খালেদা জিয়ার চিকিৎসার বিষয়টি মানবিক : খন্দকার মোশাররফ

বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন বলেছেন, বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার চিকিৎসার বিষয়টি গোটা দেশের মানুষের কাছে মানবিক। কিন্তু বর্তমানে ক্ষমতাসীন বিনা ভোটের সরকার বিষয়টিকে রাজনৈতিক বিষয়ে পরিণত করেছে।
আজ মঙ্গলবার দুপুরে রাজধানীর নয়াপল্টনে দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে বিএনপি নেতা এসব কথা বলেন।
খন্দকার মোশাররফ বলেন, খালেদা জিয়াকে বিশেষায়িত ইউনাইটেড হাসপাতালে চিকিৎসা দেওয়ার ব্যবস্থা করতে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে পরিবারের পক্ষ থেকে আবেদন করা হয়েছে। দলের পক্ষ থেকে তাঁর চিকিৎসার সব খরচ বহন করা হবে।
বিএনপি নেতা বলেন, ‘খালেদা জিয়াকে সম্পূর্ণ রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ও অন্যায়ভাবে এবং তাঁর দেওয়া জবানবন্দি বিকৃত করে পাঁচ বছরের জেল দিয়ে সরকারের ইচ্ছা পূরণ করেছে আদালত। বর্তমানে তাঁকে একটি পরিত্যক্ত নির্জন কারাগারের একমাত্র বন্দি হিসেবে রাখা হয়েছে। ৭৩ বছর বয়সী এই সাবেক প্রধানমন্ত্রীকে যে পরিবেশে রাখা হয়েছে, তা যেকোনো সুস্থ মানুষকে অসুস্থ করে ফেলার মতো। এমনিতেই তিনি দীর্ঘদিন ধরে আর্থাইটিস, ডায়াবেটিস ও উচ্চ রক্তচাপে ভুগছেন। তাঁর দুই হাঁটু এবং দুই চোখেই অস্ত্রোপচার করতে হয়েছে। ফলে তাঁকে সব সময়ই যোগ্য চিকিৎসকের নিয়মিত পর্যবেক্ষণে থাকতে হয়। অথচ নির্জন এই কারাগারে তাঁকে দেখার জন্য জুনিয়র ডাক্তার ও ডিপ্লোমা নার্স নিয়োগ করে সরকার দাবি করছে যে খালেদা জিয়ার সুচিকিৎসার ব্যবস্থা করা হয়েছে। তাঁর স্বাস্থ্যের যে অবস্থা, তাতে তাঁকে সর্বক্ষণ বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পর্যবেক্ষণে এবং জরুরি পরিস্থিতিতে তাৎক্ষণিক চিকিৎসা প্রদানের ব্যবস্থা রাখা একান্তই জরুরি বলে মতামত দিয়েছেন দেশের বিশিষ্ট বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক ও সার্জনরা।
খন্দকার মোশাররফ অভিযোগ করে বলেন, ‘আমাদের দলের পক্ষ থেকে এরই মধ্যে দুবার স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করা হয়েছে। খালেদা জিয়ার স্বাস্থ্যগত সব বিষয় উল্লেখ করে তাঁকে অনতিবিলম্বে ইউনাইটেড হাসপাতালে চিকিৎসা এবং এমআরআইসহ প্রয়োজনীয় অন্যান্য পরীক্ষার দাবি জানানো হয়েছে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের আশ্বাস দিলেও বাস্তবে তার কিছুই করা হয়নি। এরই মধ্যে খালেদা জিয়ার অসুস্থতা বৃদ্ধি পেয়েছে। আর্থাইটিসের ব্যথা বৃদ্ধির ফলে তিনি চলৎশক্তিহীন হয়ে পড়ছেন এবং পাশাপাশি তাঁর অস্ত্রোপচার করা চোখ লাল হয়ে আছে। এই পরিস্থিতিতে দ্রুত তাঁর উপযুক্ত চিকিৎসা না হলে তাঁর শারীরিক অবস্থার গুরুতর অবনতি হতে পারে। আমরা এটাও সরকারকে জানিয়েছি, কিন্তু তাঁর সুচিকিৎসার কোনো ব্যবস্থাই নেওয়া হয়নি।’
বিএনপির জ্যেষ্ঠ এই নেতা বলেন, গত ৫ জুন খালেদা জিয়া হঠাৎ করে অচেতন হয়ে পড়েন। কিন্তু এই গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাটি জেল কর্তৃপক্ষ তাঁর পরিবারের কোনো সদস্যকেও জানায়নি এবং কেন তিনি অচেতন হয়ে পড়লেন, তা পরীক্ষার জন্য কোনো ব্যবস্থা নেয়নি। গত ৮ জুন তাঁর পরিবারের সদস্যরা নিয়মিত সাক্ষাতে গিয়ে এই বিষয় জানতে পারেন।
মোশাররফ বলেন, ‘গত ৫ জুন সংঘটিত এমন একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা সম্পর্কে সরকারের মন্ত্রীরা, অ্যাটর্নি জেনারেল ও আইজি প্রিজন প্রায় এক সপ্তাহ পরে ১১ জুন তারিখে মুখ খুললেন কেন? কেন এত দিন ঘটনাটি চেপে যাওয়ার চেষ্টা করা হলো? কেন এরই মধ্যে তাঁর হঠাৎ এত বেশি অসুস্থ হয়ে পড়ার কারণ অনুসন্ধানের জন্য ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি?’
এদিকে, পাঁচ দফা আবেদনের পর গত ৯ জুন কারা কর্তৃপক্ষের অনুমতিক্রমে দেশনেত্রীর চিকিৎসা করতেন এমন চারজন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক ও ঢাকা সিভিল সার্জনের উপস্থিতিতে তাঁকে দেখতে গিয়ে এ ঘটনার কথা জানতে পারেন। ৫ জুন দুপুর ১টার দিকে দেশনেত্রীর ৫/৭ মিনিট আনকনশাস থাকা এবং সে সময়ের কোনো কিছু মনে করতে না পারার বিষয়টিকে চিকিৎসকরা মারাত্মক বলে মনে করেন। তাঁদের মতে, এটা ছিল ট্রানজিয়েন্ট ইসকেমিক অ্যাটাক (টিআইএ)। বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক অধ্যাপক এফ এম সিদ্দিকী সাংবাদিকদের জানিয়েছেন যে, ‘যেটা সবচেয়ে বিপজ্জনক সেটা হচ্ছে টিআইএ যদি কারো হয়, তাহলে সেটা ইন্ডিকেট করে যে, সামনে তার একটা বড় ধরনের স্ট্রোক হওয়ার সম্ভাবনা খুব বেশি’।
সাবেক এই স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের প্রেস ব্রিফিংয়ের পর এ বিষয়ে সরকারের আইনমন্ত্রী, সেতুমন্ত্রী ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মুখ খোলেন। তারা এখন বলছেন যে, ৫ জুন রোজা রাখার কারণে খালেদা জিয়ার সুগার কমে যাওয়ায় তাঁর মাথা ঘুরে গিয়েছিল। একটা চকলেট খেয়ে তিনি ভালো হয়ে যান। আইজি প্রিজনও একই কথা বললেও স্বীকার করেছেন যে, দেশনেত্রীর আর্থাইটিস সমস্যা বেড়েছে।
গতকাল থেকে দেশনেত্রীর স্বাস্থ্য পরীক্ষার জন্য বিএসএমএমইউতে নেওয়ার কথা বলা হচ্ছে। কিন্তু দেশনেত্রীকে এর আগে সেখানে নেওয়া হলে সেখানকার ব্যবস্থাপনা, পরিবেশ এবং চিকিৎসাসেবার বিষয়ে তিনি অসন্তোষ প্রকাশ করেছিলেন।
বিএনপি নেতা আরো বলেন, আইজি প্রিজন গণমাধ্যমে বলেছেন যে, কারাবিধি অনুযায়ী প্রাইভেট হাসপাতালে চিকিৎসা দেওয়ার জন্য ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্ত প্রয়োজন। এমন কোনো সিদ্ধান্ত না থাকায় দেশনেত্রীকে ওই হাসপাতালেই নিতে হবে। প্রাইভেট হাসপাতালে নেওয়া হলে সেখানকার চিকিৎসা ব্যয় কে বহন করবে, সে সম্পর্কেও সিদ্ধান্ত প্রয়োজন হবে। তার এই বক্তব্য থেকে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের মতামত এবং দলের বারবার অনুরোধ সত্ত্বেও ইউনাইটেড হাসপাতালে দেশনেত্রীকে ভর্তির ব্যাপারে সরকারের অনীহার কারণ বোঝা গেল।
মোশাররফ বলেন, তথাকথিত ১/১১-এর সরকারের সময়েও তৎকালীন সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে স্কয়ার হাসপাতালে চিকিৎসার জন্য নেওয়া হয়েছিল। আর তিনবারের নির্বাচিত সাবেক প্রধানমন্ত্রী, দেশের নির্বাচিত রাষ্ট্রপতি এবং সাবেক সেনাবাহিনী প্রধানের স্ত্রী খালেদা জিয়ার প্রাইভেট হাসপাতালে চিকিৎসার ব্যাপারে সরকারি অনুমোদন ও অর্থ সংস্থানের বিষয়ে এত দিনেও সিদ্ধান্ত না হওয়া রহস্যজনক এবং নিন্দনীয়।
খন্দকার মোশাররফ আরো বলেন, ‘আমরা দেশনেত্রীর উপযুক্ত চিকিৎসা চাই। আপনাদের মাধ্যমে সরকারকে জানাতে চাই, খালেদা জিয়ার চিকিৎসার সমুদয় ব্যয় আমাদের দল বহন করবে। কাজেই কাল বিলম্ব না করে তাঁকে ইউনাইটেড হাসপাতালে ভর্তি করা হোক।’
সংবাদ সম্মেলনে আরো উপস্থিত ছিলেন বিএনপি জাতীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য মির্জা আব্বাস, গয়েশ্বর চন্দ্র রায়, ড. মঈন খান, নজরুল ইসলাম খান, আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী, ভাইস চেয়ারম্যান ডা. এ জেড এম জাহিদ হোসেন, সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী।