রাজনীতি
লড়াইয়ের বাস্তবতায় বামপন্থার ভবিষ্যৎ
শুরুটা হোক, ঠিক ২৫ বছর আগে। ১৯৯১ সালের শেষ ঘনঘটা। সোভিয়েত রাশিয়া ভেঙ্গে দেওয়া হল। পুঁজিবাদী বিশ্বে তুমুল আলোড়ন, জয়-জয়কার। বলা হল- ইতিহাসের পরিসমাপ্তি। মানুষ পরাজিত, জয় হল অসম বন্টনের। জন্মসূত্রে মানুষের কোন মৌলিক চাহিদার প্রয়োজন আর স্বীকার করা হবে না, তাকে লড়তে হবে অসাম্যের মধ্যে- যদি ছিটেফোঁটা সৌভাগ্য কপালে জোটে! না, তত দিনে পুঁজিও তার আগের কাঠিন্য ত্যাগ করে হাজির হয়েছে উদারনৈতিকতার মোড়কে। দেখানো হচ্ছে- রাষ্ট্র পুঁজিবাদী হলেও তার মধ্যে মানবিক গুণ থাকতে পারে; এবং সে তার প্রজাবৎসল নাগরিকদের জন্য উন্নয়নের নানান বটিকা নিয়ে হাজির হবে, যেন চোয়ানো অর্থনীতির ছিটেফোঁটার পরিমাণ বাড়ে।
কিন্তু লাভের গুড় যে প্রতিনিয়ত পিঁপড়ার পেটে যাচ্ছে, তা বুঝতে বোধ করি একদশকও সময় লাগেনি। তাই তো মিলেনিয়াম ২০০০ এর পর থেকে পৃথিবীব্যাপী শুরু হয় পুঁজিবাদের তুমুল বিরুদ্ধাচরণ। টাল সামলাতে পুঁজির মোড়ল মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের ঝোলা থেকে বের হয়- সন্ত্রাসবাদ। টুইন টাওয়ার হামলার পর দেশে দেশে যুদ্ধের ভূগোল বদলাতে থাকে; শত্রু পেয়ে অর্থনীতির দ্বন্দ্ব থেকে খানিকটা দূরে সরে যাওয়ারও সুযোগ মিলল মোড়লদের।
যদিও বিধিবাম! যুদ্ধ- যে কি না পণ্য রাজনীতির আরেক বিনিময় দ্রব্য, সেও আর অতটা লাভজনক হয়ে উঠলো না, যতটা হলে জাতীয়তাবাদকে উসকে দিয়ে শ্রমশোষণ নিশ্চিত করা যায়। সম্ভবত, প্রযুক্তির উৎকর্ষ, তথ্যের অবাধ প্রবাহ এবং তার ব্যবহারের সুযোগ (এটা নিয়েও যুদ্ধ চলছে, সেটা অন্যখানে তোলা থাক) ও বণিকের সমারোহ- যুদ্ধকে আগের মতো লাভজনক করতে দিল না। নাই নাই করে ভাগ চায় সবাই। ইউরোপ চায়, সেখানকার হিস্যা নিয়ে যুক্তরাজ্য, জার্মানি, ফ্রান্স, ইতালি, বেলজিয়াম সবার মনকষাকষি। রাশিয়া চায়, চীন চায়, ভারত চায়, আফ্রিকা চায়, ব্রিকস চায়.. সবাই চায়। ভোগের বাজার সম্প্রসারণের এ পোডিয়ামে তেল আর সস্তা শ্রমের সুযোগে বড় হয়ে ওঠা সব খেলোয়াড়রা ভাগ বসাতে মরিয়া হয়ে ওঠে।
আঞ্চলিক আর বিশ্বসভায় খেলতে চাওয়া এত সব স্ট্রাইকারের চাহিদার নিগড়ে পড়ে বেচারা যুদ্ধেরও বাজার পড়ে যায়। যার ফলে ‘সন্ত্রাসবাদ’ যতই ম্যাক্রো থেকে মাইক্রোতে, লার্জ স্কেল থেকে ইউনিটে যাক না কেন; যুদ্ধের লাভ আর সুদসহ ঘরে ওঠানো যায় না। প্রথম বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তী সাম্প্রদায়িকতা ও ফ্যাসিবাদের যুগপৎ সন্ধির পুরনো গেইমেও তাই আর সুবিধা হয় না করপোরেশনগুলোর। তাই তো আসে মন্দা; কৃষক-শ্রমিকের অভিশাপেই কি না বাড়তে থাকে প্রকৃতির রুদ্ররোষও।
এ জন্যই কি বড়দের নানান দাবা খেলার নিচে হারিয়ে যেতে যেতে ক্রমেই উঁচু হয়ে উঠতে থাকে ভাত-কাপড়-জমি-কাজের দাবিগুলো, সাধারণ মানুষের অধিকারের আন্দোলনগুলো; যেগুলো নাকি ২৫ বছর আগে বিলুপ্ত হয়ে গিয়েছিল? ইতিহাস কি তবে ফ্যাশনের মতোই ২৫ বছর পর আবারও ফিরে আসছে প্রবল প্রতাপে? না মনে হয়। কারণ, ‘ফ্যাশনের’ চকমকি করিডরে কেবল এ বছর, কিংবা বছর দুয়েকের জন্যই এ প্রপঞ্চ সত্যি নয়; সত্যিটা হচ্ছে- দুই হাজার পরবর্তী বিশ্ব বাস্তবতা কেবলই বদলাচ্ছে। বদলে যাচ্ছে মাত্রই সিকি শতাব্দী পুরনো- ইতিহাসের পরিসমাপ্তির উচ্চস্বরও।
সমীকরণ বদলে যাচ্ছে বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও। এমনিতেই আমাদের দেশের বাস্তবতায় ‘ক্ষমতা’ই হলো আইন। যার কাছে ক্ষমতা, সে তার মতো করে আইন করবে। কিংবা সাধারণের জন্য যে আইন ডাণ্ডবেড়ি নিয়ে হাজির হবে, ক্ষমতাসীনদের সে ‘খুঁজেই পাবে না’। এ ব্যাপারটারও একটা তুমুল সন্ধিক্ষণ চলছে। দ্বন্দ্ব নয়, সন্ধিক্ষণ। কেননা, ক্ষমতা কুক্ষিগত রাখার নব নব সংযোজনের প্রয়োগ আমরা দেখে আসছি অর্ধশতক আগে মুক্তির লক্ষ্যে স্বাধীন করা বঙ্গে। ঠিক যে সময়টা সোভিয়েতের পতন হয়েছে, একইসময়ে আমরা এনেছি তথাকথিত গণতন্ত্র। এই গণতন্ত্রের নামে গত ২৬ বছর ধরে আমরা দেখছি দ্বিদলীয় পরিবারতন্ত্র। মাঝে মাঝে মানুষের রুদ্ররোষ, তাকে অস্বস্তিতে ফেললেও, চূড়ান্ত ধাক্কা না খাওয়ায় তা আরো জেঁকে বসেছে।
বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ড বা যুদ্ধাপরাধীদের বিচার সম্পন্ন করা অবশ্যই একটা বিরাট সাফল্য। স্বাধীনতার সাড়ে চার দশকের ব্যর্থতা পেরিয়ে এগুলো সম্পন্ন করা মোটেই ছোট কোনো কাজ নয়, সেটা স্বীকার করলেও উপরের কথাগুলো মিথ্যা হয়ে যায় না। না, সবকিছুতে পিছিয়ে নেই আমরা। এ সময়ের মধ্যে দেশের অর্থনীতির বিকাশ দৃশ্যত অনেকদূর এগিয়ে গেছে। এই অগ্রগতির প্রধান কারিগর ও নায়ক হচ্ছে দেশের কৃষক-ক্ষেতমজুর, গার্মেন্টস শ্রমিকসহ শ্রমজীবী জনগণ, প্রবাসে কর্মরত মেহনতি মানুষ ও ক্ষুদে-মাঝারি উদ্যোক্তারা। আর্থ-সামাজিক ব্যবস্থার প্রতিক্রিয়াশীল চরিত্র ও শাসকগোষ্ঠীর গণবিরোধী কার্যকলাপ সত্ত্বেও এই অগ্রগতি যে সম্ভব হয়েছে, তা এ দেশের মজুর-কিষাণ ও আপামর জনগণের অপার সৃষ্টিক্ষমতা, সৃজনশীলতা ও দেশপ্রেমের সাক্ষ্য বহন করে।
লুটপাটের শ্রেণিকে হটিয়ে দেশের রাষ্ট্রক্ষমতা কৃষক-মজুর-শ্রমিকদের হাতে আসলে, এ দেশ যে অসাধ্য সাধন করতে পারবে-এটি তারও একটি বড় প্রমাণ। কিন্তু, শাসক শ্রেণির চরিত্র আর সর্বগ্রাসী আচরণের কারণে দেশে আজ বিরাজ করছে রুগ্ণতা ও সংকটের আবর্ত। কৃষক তার ফসলের ন্যায্য দাম পাচ্ছে না, দাম চলে যাচ্ছে মধ্যস্বত্ত্বভোগীদের পকেটে। সবেচেয়ে বেশি রেমিটেন্স এনেও মাসে পাঁচ হাজার টাকার ন্যূনতম মজুরি মিলছে না গার্মেন্টস শ্রমিকদের। সবক্ষেত্রে চলছে নিম্নবিত্ত আর মধ্যবিত্তের পকেট কাটার মচ্ছব।
উন্নয়নের নামে দেশি-বিদেশি চক্রের একের পর এক লুটপাটের কাহিনীর প্রমাণও সর্বত্র, কিন্তু তা নিয়ে কথা বলা যাবে না। বলতে গেলে সামনে এসে দাঁড়াবে পেশিশক্তি। এগুলোর অবশেষ হয়ে বদলে যাচ্ছে দেশের আর্থ-সামাজিক চালচিত্রও। প্রতিক্রিয়াশীল ধর্মান্ধ সাম্প্রদায়িক জঙ্গি সংগঠনগুলো তৃণমূলে তাদের প্রভাব বাড়িয়েই চলেছে।
কয়েকজন শীর্ষস্থানীয় যুদ্ধাপরাধীর বিচার ও দণ্ড কার্যকর হওয়া সত্ত্বেও দেশে আইনের শাসন প্রশ্নাতীত। আইন ক্ষমতাসীন এবং তাদের ধামাধরাদের কাছে নতজানু- সাধারণের ধারণাও এমনই। ‘অবাধ বাজার অর্থনীতির’ দর্শন অনুসরণের ফলে রাজনীতিসহ সর্বক্ষেত্রে পণ্যায়ন, বাণিজ্যিকীকরণ, ভোগবাদ, প্রদর্শনবাদ ইত্যাদি আরো গভীরে বিস্তৃত হচ্ছে। সম্পদ-বৈষম্য ও শ্রেণি-বৈষম্য ক্রমাগত বাড়ছে। ধর্মীয় ও জাতিগত সংখ্যালঘুদের ওপর অত্যাচার-নির্যাতন-হামলার দিনদিন বাড়ছে। নদী-বনসহ পরিবেশ-প্রকৃতির বিরুদ্ধে সর্বগ্রাসী আগ্রাসনও অব্যাহত রয়েছে। সব মিলিয়ে সাম্রাজ্যবাদ, সাম্প্রদায়িকতা, লুটপাটতন্ত্র ও গণতন্ত্রহীনতা- দেশের সামনে আজ সবচেয়ে বড় বিপদ রূপে বিরাজ করছে।
এগুলোই কি শেষ কথা? না, কেননা কোনো অপরাধই নীরবে হারিয়ে যাচ্ছে না। প্রতিবাদের পথ রুদ্ধ করা হলেও, কোনো না কোনোভাবে মানুষ ফুঁসে উঠতে চায়। ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে যাওয়ায় যেমন করে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তির আমলেও মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে পড়ে শাহবাগের গণজাগরণ। তরুণপ্রজন্মের সেই দিশারি আন্দোলন নতুন করে শত শত পথ ও সংগ্রামের প্রক্রিয়াকে উন্মোচন করেছে। সেই ধারাবাহিকতায় চলছে একের পর এক সংগ্রাম। চলছে সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে সংগ্রাম, গণতন্ত্র বাঁচানোর লড়াই। উন্নয়নের নামে প্রাণ-পরিবেশ হত্যা রুখে দেওয়া র মরণপণ লড়াইও এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে। বলা বাহুল্য, এসব লড়াইয়ে বাম-প্রগতিশীল অংশই সামনের কাতারে হাঁটছে।
আজ বিশ্বের বিভিন্ন স্থানে মার্কিন সাম্ররাজ্যবাদ, অবাধ পুঁজির সন্ত্রাস, যুদ্ধ আর শোষণের বিরুদ্ধে লড়াইগুলো খবরের কাগজের এক কলাম থেকে লিড সংবাদে রূপান্তরিত হচ্ছে। যে ইউরোপ-আমেরিকা ‘পুঁজি আর ভোগ’কেই ইতিহাসের শেষ বলে রায় দিয়েছিল, সেখানেই সে ভাবনাকে ভুল প্রমাণিত করে নতুন রাজনীতির উত্থান ঘটছে। লড়াইয়ের এ নতুন বাস্তবতা বাংলাদেশের মতো দেশগুলোতেও বামপন্থাকে তরুণদের কাছে নতুন করে আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দুতে হাজির করছে; জানাচ্ছে, সংগ্রামেই নতুন পথের দিশা মিলবে।
বামদের নিয়ে কথা বললে, সঙ্গত কারণেই আপনার চোখ কপালে উঠতে পারে। অনেকেই বলেন, বামপন্থীদের কেউ কেউ তো ক্ষমতারও অংশীদার, তাহলে কেন এ দ্বিমুখী আচরণ। এখানেও লড়াইয়ের বার্তা আছে, বামদের অনেক দলই দক্ষিণমুখী বিচ্যুতিতে ডুবে আছে, ধামা ধরে আছে ক্ষমতাসীন দলের। অনেকেই আবার নিজেদের কৌলিন্য নিয়ে দূরে সরে আছে জনগণের কাছ থেকে। সমাজ-রাজনীতির অন্য সব বিষয়ের সঙ্গে এই দুই ত্রুটির বিরুদ্ধেও লড়তে হচ্ছে বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টিকে। ১৯২০ সালে ভারতবর্ষে প্রতিষ্ঠিত কমিউনিস্ট পার্টির এ উত্তরাধিকার এই অঞ্চলের সব শ্রেণি ও জাতীয় আন্দোলনে নেতৃত্ব দিয়েছে। তেভাগা, নানকা আর টঙ্ক আন্দোলনে কৃষক-শ্রমিকদের পাশে দাঁড়িয়ে রক্ত দিয়েছে। মুক্তিযুদ্ধে অস্ত্র হাতে লড়াই করেছে। স্বাধীনতার পর বঙ্গবন্ধু হত্যাসহ সব অন্যায় অত্যাচারের বিরুদ্ধে লড়েছে অকুতোভয় সাহস নিয়ে। রক্ত দিয়ে স্বৈরাচার হটিয়েছে।
এখনো তার লড়াই থামেনি। জাতীয় সম্পদ আর পরিবেশ, মানুষের অধিকার সবকিছুর জন্য এখনো অব্যাহত তার সংগ্রাম। সেই সংগ্রামের ধারাবাহিকতায় আগামী ২৮-৩১ অক্টোবর তার একাদশ কংগ্রেস। যে কংগ্রেস থেকে কৃষক-শ্রমিক মেহনতি মানুষ, প্রগতিশীল তারুণ্য নতুন বাংলাদেশের ঘোষণা তৈরি করবে। বাস্তবতার নতুন এ রণক্ষেত্রে লড়াইরত যুথবদ্ধ ‘সর্বহারা’রা আগামী দিনের সাম্যের বাংলাদেশ গড়ে তুলবে, এ প্রত্যাশায় সবাইকে একাদশ কংগ্রেসের আমন্ত্রণ।
লেখক: গণমাধ্যমকর্মী ও সাবেক ছাত্রনেতা

মীর মোশাররফ হোসেন