ঘুরে আসুন আর্জেন্টিনার চোখ ধাঁধানো ছয়টি জাদুকরী স্থান
লিওনেল মেসির হাতে বিশ্বকাপ ট্রফি কিংবা নীল-সাদা জার্সির জাদুকরী ফুটবল ভ্রমণপিপাসুদের কাছে আর্জেন্টিনার চেনা রূপ তো এটাই। কিন্তু মাঠের সেই ফুটবলীয় উন্মাদনা ছাপিয়ে এই লাতিন রূপসীর যে আরেকটি রূপ আছে,তা সত্যিই অন্তহীন বিস্ময়ের। মাঠের ফুটবলে যেমন প্রতি মুহূর্তে রোমাঞ্চ, আর্জেন্টিনার প্রকৃতিতেও ঠিক তেমনি পরতে পরতে জাদু। কোথাও আদিম বরফের নদী, কোথাও মেঘ ছুঁয়ে যাওয়া পাহাড়ের চূড়া, আবার কোথাও রাজকীয় গর্জে ওঠা জলপ্রপাত।
বিশ্বকাপ জয়ী এই দেশে পা রাখলে আপনার মনে হতে পারে, প্রকৃতি যেন তার সব রূপের পসরা এই নীল-সাদার বুকেই সাজিয়ে রেখেছে। সম্প্রতি আর্জেন্টিনার ছয়টি বৈচিত্র্যময় জনপদের কিছু জাদুকরী দিন ডায়েরির পাতায় বন্দী হয়েছিল যেভাবে—
ইগাজু জলপ্রপাত
দেশের উত্তর-পূর্বে অবস্থিত বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ জলপ্রপাত ইগাজু । দূর থেকেই কানে ভেসে আসে এক গম্ভীর গর্জন। যতই সামনে এগোবেন, বাতাসের জলকণা শরীর ছুঁয়ে দেবে আপনাকে। লাখ লাখ গ্যালন জলরাশি একসাথে তীব্র বেগে আছড়ে পড়ছে অতল গহ্বরে। চারপাশের ঘন ক্রান্তীয় অরণ্য আর জলপ্রপাতের ওপর ভেসে থাকা রংধনু সব মিলিয়ে ইগাজুর এই রুদ্র সুন্দর রূপ আজীবন চোখে লেগে থাকার মতো।
বারিলোচে
ইগাজুর উষ্ণতা পেছনে ফেলে যখন আপনি আন্দিজ পর্বতমালার কোলে সান কার্লোস দে বারিলোচে শহরে পৌঁছাবেন, তখন মনে হবে ভুল করে সুইজারল্যান্ডের কোনো পাহাড়ে চলে এসেছেন! গ্লেসিয়ার লেক বা হিমবাহের হ্রদ নাহুয়েল হুয়াপির তীরে গড়ে ওঠা এই শহরের কাঠের বাড়িগুলোর স্থাপত্য অসাধারণ। তবে বারিলোচের আসল আকর্ষণ এর ‘চকলেট’। এখানকার মূল সড়ক ‘ক্যালে মিট্রে’র দুপাশে সারিবদ্ধ চকলেটের দোকান। একদিকে বরফাবৃত পাহাড়ের দৃশ্য, আর হাতে গরম চকলেটের কাপ এক স্বর্গীয় অনুভূতি দেবে আপনাকে।
এল বলসন: হিপি সংস্কৃতি আর প্রকৃতির মেলবন্ধন
বারিলোচে থেকে মাত্র ১২০ কিলোমিটার দক্ষিণে অবস্থিত এক শান্ত সবুজ উপত্যকা এল বলসন। সত্তর দশকের হিপি সংস্কৃতির প্রভাব এখনো এই শহরের বাতাসে টের পাওয়া যায়। এখানে চারপাশের পাহাড়ি শান্ত পরিবেশ মনকে এক নিমেষে শান্ত করে দেয়। শহরের ঐতিহ্যবাহী ক্রাফট মার্কেটে দেখা যায় স্থানীয়দের হাতে তৈরি দারুণ সব কারুপণ্য, অর্গানিক জ্যাম আর চমৎকার সব লোকজ খাবার আছে এখানে। প্রকৃতি ও সাধারণ জীবনযাপনের এক অপূর্ব মেলবন্ধন এই শহর।
পুয়ের্তো মার্ডেইন
এবার পাহাড় ছেড়ে আটলান্টিক মহাসাগরের উপকূলের শহর পুয়ের্তো মার্ডেইন -এ আসাতে পারেন। এই জায়গাটি সামুদ্রিক বন্যপ্রাণী প্রেমীদের জন্য স্বর্গ। সাগরের নীল জলরাশির দিকে তাকিয়ে থাকতেই হঠাৎ ভেসে উঠবে বিশাল আকৃতির রাইট হোয়েল বা তিমি! সমুদ্রের ঠিক বুক চিরে তিমির লেজ নাড়ানোর দৃশ্য দেখার অনুভূতি ভাষায় প্রকাশ করার মতো নয়। সৈকতের অদূরেই পেঙ্গুইন আর সি-লায়নদের অলস সময় কাটানোর দৃশ্য মন ভরিয়ে দেবে।
এল চাল্টেন
আর্জেন্টিনার ট্র্যাকিংয়ের জাতীয় রাজধানী বলা হয় পাতাগোনিয়া অঞ্চলের এই পুঁচকে পাহাড়ি গ্রাম এল চাল্টেন-কে। চারপাশে মেঘের চাদরে ঢাকা মাউন্ট ফিটজ রয়ের তীক্ষ্ণ চূড়া। ব্যাকপ্যাক পিঠে ঝুলিয়ে যখন ট্রেইল ধরে হাঁটতে শুরু করবেন, প্রতি বাঁকেই যেন নতুন নতুন ল্যান্ডস্কেপ উঁকি দেবে। পাথুরে পথ পেরিয়ে যখন ‘লগুনা দে লস ত্রেস’ বা নীল জলের হ্রদের সামনে পৌঁছাবেন, তখন সামনের ফিটজ রয় পাহাড়ের মহিমান্বিত রূপ দেখে পেছনের সব ক্লান্তি এক নিমেষে উধাও হয়ে যাবে আপনার।
পেরাইটো মরেনো হিমবাহ
ভ্রমণের শেষ গন্তব্য ছিল পৃথিবীর অন্যতম সচল এবং জীবন্ত বরফের নদী পেরিতো মরেনো হিমবাহ। মাইলের পর মাইল জুড়ে বিস্তৃত নীলচে সাদা বরফের এই বিশাল সাম্রাজ্য চোখের সামনে এক অবিশ্বাস্য দৃশ্য তৈরি করল। কাঠের তৈরি ওয়াকওয়ে বা হাঁটার পথ দিয়ে হিমবাহের খুব কাছাকাছি যাওয়া যায়। হঠাৎ হঠাৎ প্রচণ্ড শব্দে বিশাল আকৃতির বরফের চাঁই ভেঙে লেকের নীল জলে আছড়ে পড়ে। প্রকৃতির এই আদিম রূপের শব্দ আর দৃশ্য মনের ভেতর এক অদ্ভুত রোমাঞ্চ আর শ্রদ্ধাবোধ তৈরি করে।
ইগাজুর গর্জন থেকে শুরু করে পাতাগোনিয়ার শান্ত বরফ আর্জেন্টিনার এই ছয়টি রূপ যেন একটি চেইন লাইটের মতো, যার প্রতিটি স্থানই ভিন্ন রঙে উজ্জ্বল। মাঠের ফুটবলের মতোই আর্জেন্টিনার প্রকৃতি প্রতি পদে পদে মানুষকে রোমাঞ্চিত করে। প্রকৃতি যে কত বৈচিত্র্যময় হতে পারে, এই দেশের মাটি ছুঁয়ে না দেখলে হয়তো তা জানতেই পারবেন না।

ফিচার ডেস্ক