বেসিকের বড় ভিত্তিই গেছে নীলসাগরে!
রাষ্ট্রায়ত্ত বেসিক ব্যাংকের অর্থ আত্মসাতের ঘটনায় গত সপ্তাহে টানা তিনদিনে রাজধানীর তিন থানায় বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে ৫৬টি মামলা করে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। মামলার নথি বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকটির ভিত্তির একটা বড় অংশই গেছে নীলসাগর গ্রুপের চেয়ারম্যান ও পরিচালকদের হাতে। মামলায় তাঁদের বিরুদ্ধে প্রায় ২৭২ কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগ করা হয়েছে। একক প্রতিষ্ঠান হিসেবে এই টাকার পরিমাণ সবচেয়ে বেশি।
বেসিক ব্যাংকের প্রধান শাখা থেকে ২৫ কোটি ৮৭ লাখ টাকা আত্মসাতের অভিযোগ আনা হয়েছে নীলসাগর অ্যাগ্রো ইন্ডাস্ট্রিজের বিরুদ্ধে। এই অভিযোগে গত ২৩ সেপ্টেম্বর প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক আহসান হাবিব লেলিন ও বেসিক ব্যাংকের পাঁচ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে মামলা করা হয়েছে।
এ ছাড়া বেসিক ব্যাংকের সৈয়দপুর শাখা থেকে ২৩ কোটি পাঁচ লাখ ৯৩ হাজার টাকা ঋণের নামে আত্মসাৎ করার অভিযোগে নীলসাগর অ্যাগ্রো ইন্ডাস্ট্রিজের বিরুদ্ধে আরেকটি মামলা করেছে দুদক। এ মামলাতেও আহসান হাবিব লেনিনকে আসামি করা হয়েছে।
সুদসহ ৫৮ কোটি ৫৮ লাখ ৬৭ হাজার টাকা আত্মসাতের অভিযোগে মামলা করা হয়েছে মেসার্স পারুমা ইঞ্জিনিয়ারিং ওয়ার্কসের বিরুদ্ধে। বেসিক ব্যাংক থেকে প্রতিষ্ঠানটি ঋণ নিয়েছিল ৫৩ কোটি ৮০ লাখ ৫৯ হাজার ৪৮০ টাকা। ২৩ সেপ্টেম্বর করা এই মামলায় আসামি করা হয়েছে মোট আটজনকে। এদের মধ্যে সাতজন ব্যাংক কর্মকর্তা এবং অন্যজন নীলসাগর গ্রপের চেয়ারম্যান আহসান হাবিব লেলিন।
লতায় পাতায় যোগাযোগ
শুধু বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের নামে ঋণ নিয়েই ক্ষান্ত হননি নীলসাগর গ্রুপের চেয়ারম্যান আহসান হাবীব লেলিন। নানান সময়ে নানান ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানকে বেসিক ব্যাংক থেকে ঋণ নিতে সাহায্যও করেছেন তিনি। হয়েছেন ঋণের গ্যারান্টর।
মোট ১১ জনকে আসামি করে মেসার্স আলী কনসট্রাকশন অ্যান্ড সাপ্লাইয়ার্সের বিরুদ্ধে ৭০ কোটি ১০ লাখ টাকা আত্মসাতের অভিযোগে গত ২২ সেপ্টেম্বর মামলা করেছে দুদক। এই মামলার আসামিদের মধ্যে ছয়জন বেসিক ব্যাংকের কর্মকর্তা। এ ছাড়া অন্য আসামিরা হলেন, প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ হামদুজ্জামান, চেয়ারম্যান মোহাম্মদ মাহবুবুল আলম, পরিচালক মো. আহাদুজ্জামান বাতেন, ঋণের গ্যারান্টর ‘মেসার্স নীলসাগর অ্যাগ্রো ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আহসান হাবিব লেলিন, এসডি সার্ভে ফার্মের ম্যানেজিং পার্টনার ইকবাল হোসেন ভূইয়া ও সার্ভেয়ার মো. ফারুক।
গত ২১ সেপ্টেম্বর ৩৫ কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগে বীথি এন্টারপ্রাইজের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করে দুদক। প্রতিষ্ঠানের মালিক কামরান শহীদের নেওয়া এ ঋণের গ্যারান্টর ছিলেন আহসান হাবিব লেলিন। ওই মামলার দ্বিতীয় আসামি করা হয়েছে তাকে। এ ছাড়া কামরান শহীদ নিজেও নীলসাগর গ্রুপের একজন পরিচালক।
এ ছাড়া ৭০ কোটি ১০ লাখ টাকা আত্মসাতের অভিযোগে মেসার্স আলী ট্রেড ইন্টারন্যাশনালের চেয়ারম্যান মাহবুবুল আলমকে আসামি করে মামলা করেছে দুদক। মাহবুব আলম মেসার্স আলী কনস্ট্রাকশন অ্যান্ড সাপ্লাইয়ার্সেরও চেয়ারম্যান। তাঁর নেওয়া এই ঋণের গ্যারান্টর আহসান হাবিব লেলিন। তাই মামলায় তাঁকেও আসামি করা হয়েছে। গত ২২ সেপ্টেম্বর এই মামলা করা হয়।
একই দিনে ১৫ কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগে হক ট্রেডিং এন্টারপ্রাইজের বিরুদ্ধে মামলা করে দুদক। প্রতিষ্ঠানের স্বত্বাধিকারী জিয়াউল হকের নেওয়া ওই ঋণের গ্যারান্টরও ছিলেন লেলিন। জিয়াউল হকও নীলসাগর গ্রপের পরিচালক। তিনি গ্রুপটির ব্যবস্থাপনা পরিচালকও ছিলেন।
সুদে-আসলে ৪৪ কোটি ৩১ লাখ ৬৮ হাজার টাকা আত্মসাৎ করার অভিযোগ মেসার্স বর্ষণ ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড নামের একটি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে মামলা করে দুদক। এই মামলায় মোট আট জনকে আসামি করা হয়। এর মধ্যে ব্যাংকের পাঁচ কর্মকর্তা ছাড়া রয়েছেন প্রতিষ্ঠানটির চেয়ারম্যান শামিয়াজ আক্তার, ব্যবস্থাপনা পরিচালক কামরান শহীদ এবং বিডিএস অ্যাডজাস্টার্স নামের আরেকটি প্রতিষ্ঠানের প্রধান নির্বাহী ইবনে মোফাজ্জল বকরী।
অভিযোগ ও মামলার বিষয়ে টেলিফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও নীলসাগর গ্রুপের চেয়ারম্যান আহসান হাবিব লেলিনকে পাওয়া যায়নি।
আরেক প্রতিষ্ঠানের কাছে ২০৫ কোটি
নীলসাগর গ্রুপ ছাড়াও বেসিক ব্যাংক থেকে ২০৫ কোটিরও বেশি টাকা আত্মসাৎ করার অভিযোগ উঠেছে এমারেল্ড নামের একটি ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে। চারটি আলাদা প্রতিষ্ঠানের নামে এসব টাকা আত্মসাৎ করা হয়েছে বলে অভিযোগ দুদকের।
চারটি প্রতিষ্ঠানের নামে করা দুদকের মামলার এজাহার ঘেঁটে দেখা গেছে চারটি প্রতিষ্ঠানের মালিক একই ব্যক্তি। বেসিক ব্যাংক থেকে ৪৮ কোটি ৬৮ লাখ ২২ হাজার ৯৩০ টাকা আত্মসাতের অভিযোগে গত ২৩ সেপ্টেম্বর মেসার্স এমারেল্ড অটো ব্রিকস লিমিটেডের বিরুদ্ধে মামলা করে দুদক। মামলায় আসামি করা হয় প্রতিষ্ঠানের চেয়ারম্যান সৈয়দ মাহবুবুল গণি, ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ হাসিবুল গণি গালিব, পরিচালক সৈয়দ এনামুল গণি প্রমুখকে। একই দিন ৬৪ কোটি ৬২ লাখ ২১ হাজার ১৭১ টাকা আত্মসাতের অভিযোগে এমারেল্ড স্পেশালাইজড কোল্ড স্টোরেজের বিরুদ্ধে মামলা করে দুদক। ওই মামলার আসামি করা হয় প্রতিষ্ঠানের চেয়ারম্যান সৈয়দ মাহবুবুল গণি, পরিচালক সৈয়দ এনামুল গণি, সৈয়দ হাসিবুল গণিসহ অন্যান্য কর্মকর্তার বিরুদ্ধে।
বেসিক ব্যাংক থেকে ৭৪ কোটি ১৫ লাখ টাকা আত্মসাতের অভিযোগে এমারেল্ড অয়েল ইন্ডাস্ট্রিজের বিরুদ্ধে এর আগের দিন অর্থাৎ ২২ সেপ্টেম্বর মামলা দায়ের করে দুদক। মামলায় আসামি করা হয়েছে প্রতিষ্ঠানের চেয়ারম্যান সৈয়দ মনোয়ারুল ইসলাম ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ হাসিবুল গনি গালিবসহ অন্য কর্মকর্তাদের।
১৭ কোটি ৫৭ লাখ ৩৯ হাজার টাকা আত্মসাতের অভিযোগ এনে গত ২১ সেপ্টেম্বর এমারেল্ড ড্রেসেসের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করেছে দুদক। এ মামলারও অন্যতম আসামি এ প্রতিষ্ঠানের চেয়ারম্যান সৈয়দ হাসিবুল গণি গালিব।
তাহমিনা ডেনিম :
৮ কোটি ৪০ লাখ টাকা আত্মসাতের অভিযোগে গত ২২ সেপ্টেম্বর তাহমিনা ডেনিম লিমিটেডের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করে দুদক। মামলায় আসামি করা হয় প্রতিষ্ঠানের চেয়ারম্যান কামাল জামান মোল্লা, পরিচালক কাজী রিজওয়ান মোমিনুল হকসহ একাধিক কর্মকর্তাকে।
একই দিন তাহমিনা নিটওয়্যার লিমিটেডের বিরুদ্ধে ২৭ কোটি ৩১ লাখ টাকা আত্মসাতের অভিযোগ এনে মামলা দায়ের করেছে দুদক। ওই মামলার আসামি করা হয়েছে প্রতিষ্ঠানের পরিচালক কাজী রিজওয়ান মোমিনুল হকসহ একাধিক ব্যক্তিকে।
মামলা ও আসামি :
বেসিক ব্যাংক থেকে টাকা আত্মসাতের অভিযোগে গত সপ্তাহে টানা তিনদিনে রাজধানীর তিন থানায় বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে ৫৬টি মামলা করে দুদক।
৬৫৪ কোটি ৭১ লাখ ৫০ হাজার ৪৮৯ টাকা আত্মসাতের অভিযোগে গত ২১ সেপ্টেম্বর করা হয়েছে ১৮টি মামলা। এতে আসামি করা হয়েছে ১৫৩ জনকে। ৭৮১ কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগে পরের দিন ২২ সেপ্টেম্বর করা হয়েছে ২৩টি মামলা। এতে আসামি করা হয়েছে ১৮৫ জনকে। ৭৮৬ কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগে ২৩ সেপ্টেম্বর করা হয়েছে ১৫টি মামলা। এতে আসামি করা হয়েছে ১৮৫ জনকে।

নিজস্ব সংবাদদাতা