‘অর্থনীতিকে গতিশীল করতে সিএমএসএমইর উন্নয়নের বিকল্প নেই’
সিএমএসএমই খাতের উন্নয়ন মানেই দেশের উন্নয়ন, তাই এ খাতের সামগ্রিক অগ্রগতির জন্য ঢাক চেম্বার ও সরকার একযোগে কাজ করতে পারে বলে জানিয়েছে প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনা বিষয়ক উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর। তিনি একটি সমন্বিত অর্থনৈতিক কাঠামো তৈরির উপর জোরারোপ করেন। একইসঙ্গে বাংলাদেশের বাস্তবতায় ব্যাংক কোম্পানি আইনসহ আর্থিক খাতের অন্যান্য আইনের সংস্কার কোনো বিকল্প নেই বলে মনে করেন তিনি।
আজ বুধবার (১৫ এপ্রিল) বিকেলে ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (ডিসিসিআই) আয়োজিত ডিসিসিআই অডিটোরিয়ামে ‘ব্যাংকিং খাতের সমন্বয় : ঋণদাতা ও ঋণগ্রহীতার দৃষ্টিভঙ্গি’ শীর্ষক ফোকাস গ্রুপ আলোচনায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে অর্থ উপদেষ্টা এসব কথা বলেন।
শ্রমঘন শিল্প, যার মাধ্যমে কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরিতে ইতিবাচক ভূমিকা রাখা সম্ভব জানিয়ে অর্থ উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর বলেন, সেগুলোর উন্নয়নে বর্তমান সরকার প্রতিজ্ঞাবদ্ধ। এছাড়া ইতোমধ্যে বন্ধ হওয়া শিল্প-কারখানাগুলো চালুর পাশাপাশি অন্যান্য শিল্পখাতে উৎপাদন বাড়ানো ও নারী উদ্যোক্তাদের প্রয়োজনীয় সহায়তা প্রদানে সরকারের পক্ষ উদ্যোগ গ্রহণ করবে।
মানুষের কষ্ট হবে এ কারণে জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানো হয়নি মন্তব্য করে রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর বলেন, বর্তমান সরকার যেহেতু বিপুল জনরায় নিয়ে সরকার পরিচালনায় এসেছে, তাই বৈশ্বিক সংকটের অভিঘাতের কারণে দেশে মানুষের জীবনযাত্রায় যেন কষ্ট লাঘব হয়, সেই বিষয়টিকে বেশি হারে প্রাধান্য দিচ্ছে, যার কারণে জ্বালানি তেলের মূল্য এখনও বৃদ্ধি করা হয়নি। আবার দেশের আর্থিক খাতের দুরবস্থার বিষয়ে আমরা সবাই অবগত রয়েছি, তবে এ অবস্থা উত্তরণে সরকার প্রয়োজনীয় নীতি প্রণয়ন, সংস্কারসহ অন্যান্য উদ্যোগ গ্রহণ করা হবে। দীর্ঘমেয়াদি টেকসই ঋণ ব্যবস্থা প্রবর্তনের জন্য একটি শক্তিশালী বন্ড মার্কেট ও পুঁজিবাজারের কোনো বিকল্প নেই বলে জানান তিনি।
আলোচনা সভায় মূল প্রবন্ধ উপস্থাপনকালে ডিসিসিআই সভাপতি তাসকীন আহমেদ বলেন, দীর্ঘদিন যাবত ব্যবসা সহায়ক পরিস্থিতির অভাবে শিল্পখাতে উৎপাদন হ্রাস, বকেয়া ঋণ বৃদ্ধি, উচ্চ খেলাপি ঋণ, বেসরকারিখাতে ঋণ প্রবাহ হ্রাস এবং সরকারের ঋণ গ্রহণ বৃদ্ধির কারণে দেশের শিল্পখাত মারাত্মক চ্যালেঞ্জিং সময় অতিবাহিত করছে। এ অবস্থা উত্তরণে ব্যাংক খাতের কাঠামোগত দুর্বলতার সংস্কার, স্থিতিশীলতা ও সুশাসন নিশ্চিতকরণের পাশাপাশি ব্যাংক ও বেসরকারিখাতের মধ্যে কার্যকর সমন্বয় বাড়ানোর ওপর জোরারোপ করেন।
বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাত বর্তমানে এক চ্যালেঞ্জিং পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছে এবং এখাতের টেকসই ব্যবসায়িক প্রবৃদ্ধির জন্য ব্যাংক ও বেসরকারিখাতের মধ্যে কার্যকর সমন্বয় এখন সময়ের দাবি জানিয়ে তাসকীন আহমেদ বলেন, আমাদের ব্যাংকখাতে তারল্যের সংকট নেই, বরং রেকর্ড তিন লাখ ২১ হাজার ২৫৫ কোটি ৪৭ লাখ টাকার অতিরিক্ত তারল্য রয়েছে, তারপরও বর্তমানে বেসরকারিখাতে ঋণের প্রবৃদ্ধি সংকুচিত হয়ে ছয় দশমিক শূন্য তিন শতাংশে নেমে এসেছে, যা আগের বছরের তুলনায় সাত দশমিক ১৫ শতাংশের অনেক কম।
তাসকীন আহমেদ বলেন, শিল্প খাতের মোট ঋণের বর্তমানে ৫০ দশমিক ৪৬ শতাংশ অনাদায়ি এবং খেলাপি ঋণের হার ৩১ দশমিক দুই শতাংশে পৌঁছানোয় ব্যাংকগুলো এখন চরম আতঙ্কে ভুগছে, সেই সঙ্গে এসএমই উদ্যোক্তাদের নেওয়া ঋণের ৩৫ দশমিক ৪৩ শতাংশও এখন সময়মতো পরিশোধে ব্যর্থ হওয়ায়, তা খেলাপি হয়ে গেছেন।
খেলাপি ঋণ বৃদ্ধির ফলে ব্যাংকের সম্পদ ক্রমান্বয়ে হ্রাস পাওয়া মূলধন সংকট এবং ব্যবসায়িক ঋণের চেয়ে ট্রেজারি বিলে বিনিয়োগে প্রাধান্য দেওয়া প্রভৃতি কারণে ব্যাংগুলো ঋণ প্রদানে উৎসাহ হারিয়ে ফেলছে। অপরদিকে দীর্ঘদিন যাবত ব্যবসা সহায়ক পরিস্থিতির অভাবে শিল্পখাতে উৎপাদন যথাযথ ভাবে সম্পন্ন হচ্ছে না, ফলে শিল্পের বকেয়া ঋণ ক্রমাগত বাড়ছে, যা কোনোভাবেই কাম্য নয় বলে জানান তিনি।
সামগ্রিক অবস্থা উত্তরণে ব্যাংকখাতের গভীরে থাকা কাঠামোগত দুর্বলতার সংস্কার, ব্যাংক ব্যবস্থায় স্থিতিশীলতা আনয়ন ও সুশাসনের উপর প্রাধান্য প্রদান এবং রপ্তানিমুখী শিল্পের ওপর অতিরিক্ত প্রাধান্য না দিয়ে স্থানীয় শিল্পায়নে অর্থায়ন নিশ্চিতকরণের সুপারিশ করেন ঢাকা চেম্বার সভাপতি।
আলোচনায় অংশগ্রহণ করে বক্তব্য দেন বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকসের (বিএবি) চেয়ারম্যান আব্দুল হাই সরকার, বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিচালক (গবেষণা) মো. আব্দুল ওয়াহাব, পরিচালক (এসএমই ও স্পেশাল প্রোগ্রামস বিভাগ) নওশাদ মোস্তফা, পরিচালক (গবেষণা) সেলিম আল মামুন, এনসিসি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক এম. শামসুল আরেফিন, সিটি ব্যাংকের উপ-ব্যবস্থাপনা পরিচালক আশানুর রহমান প্রমুখ অংশগ্রহণ করেন। মুক্ত আলোচনায় অংশগ্রহণ করেন ঢাকা চেম্বারের সাবেক পরিচালক মো. সারফুদ্দিন ও এফবিসিসিআইর সদস্য তানভীর মোহাম্মদ দিপু।

নিজস্ব প্রতিবেদক