বিদ্যুৎ উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা পূরণে বড় ভরসা রুফটপ সৌরবিদ্যুৎ
ঢাকা শহরের বিভিন্ন ভবনের একসময় অব্যবহৃত ছাদগুলো ধীরে ধীরে সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের কেন্দ্র হয়ে উঠছে। এর মধ্য দিয়ে নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে বাংলাদেশের যাত্রায় এক গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের সূচনা হয়েছে। সম্প্রতি প্রকাশিত জলবায়ু বাজেট প্রতিবেদন ২০২৬-২৭ অনুযায়ী, রাজধানীর আগারগাঁও এলাকার বিনিয়োগ ভবনের ছাদে স্থাপিত একটি ১৫০ কিলোওয়াট-পিক ক্ষমতাসম্পন্ন সোলার বিদ্যুৎ প্রকল্প পরিবেশ ও অর্থনীতিতে অনন্য দৃষ্টান্ত হয়ে উঠেছে। এটি দেখিয়ে দিয়েছে, কীভাবে সরকারি প্রতিষ্ঠান ও বিদ্যুৎ বিতরণ সংস্থা একযোগে কাজ করে নগরের অব্যবহৃত স্থানকে বিদ্যুৎ উৎপাদন, আয় এবং জলবায়ু সহনশীলতার উৎসে রূপান্তর করতে পারে।
ব্যয়হীন অংশীদারিত্ব ও পরিবেশগত সাফল্য
‘জাতীয় রুফটপ সোলার কর্মসূচি’র আওতায় বাস্তবায়িত এই প্রকল্পটি বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিডা) ভবনে স্থাপন করা হয়েছে। সেখানে বিডা শুধু তাদের ছাদের জায়গাটি বরাদ্দ দিয়েছে, অন্যদিকে ঢাকা ইলেকট্রিক সাপ্লাই কোম্পানি লিমিটেড (ডেসকো) এর মূলধনী বিনিয়োগ ও পরিচালনার দায়িত্ব পালন করছে। এই উদ্যোগ প্রমাণ করেছে, সরকারি প্রতিষ্ঠান ও সেবা প্রদানকারী সংস্থার পারস্পরিক সহযোগিতা কীভাবে সরকারের ওপর বড় কোনো অগ্রিম খরচের বোঝা না চাপিয়েই নবায়নযোগ্য জ্বালানির বিস্তারকে ت্বরান্বিত করতে পারে। প্রতিবেদন অনুযায়ী, এ ব্যবস্থার মাধ্যমে প্রতিদিন ৫০০ থেকে ৬০০ ইউনিট বিদ্যুৎ উৎপাদিত হচ্ছে, যার মাসিক উৎপাদনের পরিমাণ প্রায় ১৫ হাজার ইউনিট। সেই সঙ্গে বছরে কার্বন ডাই অক্সাইড নিঃসরণ কমছে আনুমানিক ১৫০ থেকে ১৮০ টন। রাজস্ব বণ্টন ব্যবস্থায় উভয় পক্ষই লাভবান হচ্ছে; ছাদ ব্যবহারের বিনিময়ে বিডা পাচ্ছে উৎপাদিত বিদ্যুতের ১০ শতাংশ এবং বাকি ৯০ শতাংশ ও ভবিষ্যতের কার্বন ক্রেডিট থেকে যাচ্ছে ডেসকোর কাছে।
দ্রুত বিনিয়োগ ফেরত ও আর্থিক সক্ষমতা
প্রায় ৫০ লাখ টাকা প্রাথমিক বিনিয়োগে গড়ে ওঠা এই কেন্দ্র থেকে বছরে আয় হবে ১৪ থেকে ১৫ লাখ টাকা। এই হিসাবে মাত্র সাড়ে তিন বছরেই বিনিয়োগের পুরো অর্থ ফিরে আসবে। এ ধরনের আর্থিক সক্ষমতা বাংলাদেশের জ্বালানি রূপান্তরে ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুতের ব্যাপক সম্প্রসারণযোগ্য সম্ভাবনার ইঙ্গিত দেয়। অর্থনৈতিক সুবিধার পাশাপাশি এ উদ্যোগ দেশের বৃহত্তর জলবায়ু ও উন্নয়ন কর্মসূচিরও প্রতিফলন। জলবায়ু বাজেট প্রতিবেদন ২০২৬-২৭-এ জলবায়ু-সংক্রান্ত বিনিয়োগের গুরুত্ব তুলে ধরে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, “বাংলাদেশ এমন এক গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে রয়েছে, যেখানে জলবায়ু ঝুঁকি এবং টেকসই ও অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়নের চ্যালেঞ্জ একসঙ্গে সামনে এসে দাঁড়িয়েছে। এ প্রেক্ষাপটে জলবায়ু অর্থায়ন শুধু সহায়তার উৎস নয়; এটি সহনশীলতা, উদ্ভাবন ও টেকসই উন্নয়নের অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি।”
২০৩০ সালের মহাপরিকল্পনা ও সরকারি প্রণোদনা
২০৩০ সালের মধ্যে মোট বিদ্যুৎ চাহিদার ২০ শতাংশ নবায়নযোগ্য জ্বালানি থেকে পূরণ, মোট উৎপাদন সক্ষমতা ৩৫ হাজার মেগাওয়াটে উন্নীত করা এবং সঞ্চালন লাইন ২৫ হাজার সার্কিট কিলোমিটারে সম্প্রসারণের লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে সরকার। দীর্ঘমেয়াদে ২০৫০ সালের মধ্যে নবায়নযোগ্য উৎস থেকে ৩০ থেকে ৫০ শতাংশ বিদ্যুৎ উৎপাদনের পরিকল্পনাও রয়েছে। এই লক্ষ্য পূরণে ছাদভিত্তিক ও বৃহৎ পরিসরের সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্প সম্প্রসারণ, উপকূলীয় অঞ্চলে বায়ু বিদ্যুতের সম্ভাব্যতা যাচাই, বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানি সরঞ্জামের দেশীয় উৎপাদনে সহায়তা প্রদান করা হচ্ছে। পাশাপাশি ২০৩৫ সাল পর্যন্ত সৌর খাতে শূন্য শতাংশ করহার এবং গ্রাহকদের সৌরবিদ্যুৎ বিলের ওপর ৫ শতাংশ রেয়াতের মতো দারুণ আর্থিক প্রণোদনা দেওয়া হচ্ছে। পর্যবেক্ষকদের মতে, বিনিয়োগ ভবনের সৌর প্যানেল শুধু বিদ্যুতের উৎস নয়, বরং উদ্ভাবনের মাধ্যমে কীভাবে বাংলাদেশ একটি সবুজ ভবিষ্যৎ গড়ে তুলতে পারে, তার বাস্তব উদাহরণ।

বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থা (বাসস)