শিক্ষা
ইঁদুর দৌড়ে মেধার মাপকাঠি রেজাল্ট
বর্তমান বিশ্বে প্রতিযোগিতা শব্দটি সবচেয়ে জনপ্রিয় । সবাই সবার সাথে প্রতিযোগিতায় লিপ্ত । কেউ গাড়ি-বাড়ি কেনার প্রতিযোগিতায়, আবার কেউ শেয়ার বাজারের প্রতিযোগিতায় । এটুকু পর্যন্ত ঠিকই ছিল । কিন্তু মানুষ যখন জ্ঞান অর্জনের প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হয় তখন সংকীর্ণতা ভর করে মানুষের মননে চিন্তাশৈলীতে। আমাদের দেশও তার ব্যতিক্রম নয় । এ প্লাস নামক দৌঁড়ে দৌঁড়াচ্ছে আমাদের দেশের কোমলমতি শিশুরা ।
এমন একটি অবস্থা সবাইকে পেতে হবে গোল্ডেন এ প্লাস আর না হলে জীবনে মিলবে না ভালো জায়গায় পড়ার সুযোগ । জীবনের একমাত্র লক্ষ্য যখন জ্ঞানার্জনকে ছাড়িয়ে গোল্ডেন এ প্লাসের দিকে ধাবিত হয় তখন জানার জন্য মানুষ জানে না, শেখার জন্য মানুষ শেখে না বরং সেই শিক্ষার মূলে থাকে কতগুলো বাণিজ্যিক লক্ষ্য যেমন: ভালো একটি প্রতিষ্ঠানে ভর্তি হওয়া ,ভালো চাকরি পাওয়া ইত্যাদি । বর্তমান যুগে শিক্ষা একটি পণ্য আর এই পণ্যের বিক্রেতা অসৎ শিক্ষক তো বটেই সাথে রয়েছে বিভিন্ন চক্র ; যাদের যোগসাজশ রয়েছে বিভিন্ন প্রশ্নপত্র ফাঁসের ক্ষেত্রে, যারা করে বেড়াচ্ছে বিভিন্ন জায়গায় তদবির : হতে পারে তারা শিক্ষক , হতে পারে তারা রাজনৈতিক নেতা বা প্রখ্যাত নেতাদের তথাকথিত ডান হাত বাম হাত । যাদের প্রভাবে কোনো অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করার সাহস হয়তো আমাদের নেই ।
সভ্যতার খোলসে কোনো এক অসভ্য সমাজে আমাদের বসবাস। যেখানে আমাদের লক্ষ্য বাণিজ্যিক, লক্ষ্যে পৌঁছানোর রাস্তা অসৎ আর সেই রাস্তায় অসংখ্য অসৎ মানুষের ভিড় যারা কম কষ্টের মাধ্যমেই লক্ষ্যে পৌঁছে দেওয়ার স্বপ্ন দেখায় কোমলমতি শিক্ষার্থীদেরও । আর এমন একটি সমাজে যখন শুধু পরীক্ষায় অর্জিত ফলাফলকে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ে অনার্সে ভর্তি হওয়ার একমাত্র শর্ত হিসেবে বিবেচনা করা হয় তখন সেটার যৌক্তিকতা প্রশ্নের সম্মুখীন হয় । কারণ প্রশ্ন চুরি করে পাওয়া অর্জিত ফলাফল কখনোই একজন শিক্ষার্থীর জ্ঞান পরিমাপের মাপকাঠি হতে পারে বলে অন্তত আমি মনে করি না । আর এরা যে বয়সে সৃজনশীল পরীক্ষা দেয় তখন সৃজনশীল শব্দটার অর্থই অনেকে বোঝে না ।
একজন মানুষ যে সাহিত্যের অ আ শিখেনি সে তো উপন্যাস , মহাকাব্য লেখার মতো সৃজনশীল হতে পারবে না । সৃজনশীল কোনো কিছু তৈরি করতে গেলে আগে জ্ঞান অর্জন করতে হয় তারপর সেটাকে ভেঙে চুড়ে নতুন করে সৃজনশীল উদ্ধাবনী জ্ঞানের সৃষ্টি হয় । সৃজনশীলতার চর্চা করার জন্য যে প্রস্তুতি দরকার তার আগেই আমরা নিয়ে নিচ্ছি সৃজনশীলতার পরীক্ষা । এখন তো রাস্তাঘাটে যার কাছেই শুনি গন্ডায় গন্ডায় গোল্ডেন এ প্লাস । আর যে বস্তুটি অর্জন না করলে অভিভাবক থেকে শুরু করে শিক্ষক কারোরই মর্যাদা রক্ষা হয় না ।
এটা কেমন সমাজ যে বয়সে হেসে-খেলে প্রকৃতি থেকে, সমাজ থেকে জ্ঞান অর্জন করার কথা তখনই বইয়ের ভারে পিষ্ট সেই কোমলমতি শিশু-কিশোর । তার উপর চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে গোল্ডেন এ প্লাস অর্জন করে পরিবারকে খুশি করার দায়ভার । আর এ দায়ভার পূরণ করতে গিয়ে শিক্ষার্থীর সুকোমল বৃত্তি, সৃজনশীলতা ও মননের চর্চা হচ্ছে বিঘ্নিত । আর এদের শৈশবের আশা কৈশোরের স্বপ্ন বাষ্পায়িত হয়ে উড়ে যাচ্ছে । ওরা যে দৌঁড়ে নাম লিখিয়েছে সেখানে তাদের সহযাত্রীদের দেখছে হয়তো কাউকে ধাক্কা মেরে, চিটিং করে পৌঁছে যাচ্ছে লক্ষ্যে । আর সেই চিটিংবাজ দৌঁড়ের সহযাত্রীই হয়তো পাচ্ছে সবার কাছে সংবর্ধনা । তার মা-বাবাও তাকে বরণ করে নিচ্ছে সহাস্যে । তাই বাধ্য হয়ে বাকিরাও দৌঁড়ে কুকৌশলে জয়ী হওয়ার কৌশল রপ্ত করে নিচ্ছে । আর সেখানে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিচ্ছে গোল্ডেন এ প্লাস নিয়ে চিন্তিত মা-বাবা। তার মা-বাবা তাকে এমন কোচিংয়ে ভর্তি করাচ্ছে যেখানে পাওয়া যায় সাজেশন ,খুব কম পড়েই লাভ করা যায় ভালো ফলাফল। আবার তারা শরণাপন্ন হয় এমন মানুষের কাছে যেখান থেকে টাকার বিনিময়ে প্রশ্ন পাওয়া যাবে। কী দরকার এত পড়াশোনা করার? জানার? বোঝার? টাকাই তো কিনে দিতে পারছে শিক্ষা ও মর্যাদা।
আবার অনেকেই আছে যারা হয়তো এই চলমান দৌড়ে নিজের নামটি লেখায়নি : তারা হয়তো জানার চেষ্টা করে, বোঝার চেষ্টা করে বা দৌড়ে জিতে যাওয়ার কুকৌশলগুলো রপ্ত করার মতো বাণিজ্যিক সে হতে পারেনি বা সে শিক্ষাটা হয়তো সে তার মা-বাবার কাছ থেকে পায়নি । সে নিজের চেষ্টায় হয়তো ভালো ফলাফল পেয়েছে কিন্তু দৌড়ে বিজয়ী হয়ে গোল্ডেন এ প্লাস নামক মেডেলটি পায়নি । তাহলে এখানে ভালো শিক্ষার্থী কে?
আমার মনে হয় অনেকেই গোল্ডেন এ প্লাস না পাওয়া শিক্ষার্থীর কথা বলবেন । এ রকম একটি অবস্থায় যখন আমাদের বাংলাদেশ চলছে তখন শুধু ফলাফল একজন মানুষের মেধাকে কখনোই যাচাই করার মাপকাঠি হতে পারে না । আর যে ব্যবস্থায় গোড়ায় গণ্ডগোল সে নষ্ট গোড়ার উপরে কখনো গাছ দাঁড়িয়ে থাকতে পারে না । তাই সে গাছ যদি রোপণ করতেই হয় তবে আগে থেকেই শক্ত সমর্থ্য গোড়া দরকার। এখনো সে সময় আসেনি যখন শুধু ফলাফলের ওপর ভিত্তি করে আমরা জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থী ভর্তি করাতে পারি। তাতে করে হয়তো অনেক গোল্ডেন এ প্লাস প্রাপ্ত জঞ্জাল পড়ার সুযোগ পাবে আর গোল্ডেন এ প্লাস পায়নি এ রকম অনেক হীরকখণ্ড আমরা হারিয়ে ফেলতে পারি । আর পরীক্ষা না দিয়ে অনার্স লেভেলে একজন মানুষের সৃজনশীলতা, জ্ঞান কোনোটাই যাচাই-বাছাই করা সম্ভব নয়। অনেকেই বলছেন এবার শুধু ফলাফলের ভিত্তিতে যদি জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি করা হয় তবে কোচিং বাণিজ্য থেকে শুরু করে ভর্তি পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস, পরীক্ষা গ্রহণের বাড়তি বিড়ম্বনা, তদবিরের ঝামেলা এবং বিভিন্ন ধরনের দুর্নীতি থেকে মুক্তি পাওয়া যাবে।
এই ব্যাপারে যদি শিক্ষা মন্ত্রণালয় থেকে কিছু গুরুত্বপূর্ণ ব্যবস্থা নেওয়া হয় তাহলে এ সমস্যা মোকাবিলা করা সম্ভব। প্রথমেই উচিত এই ব্যাঙের ছাতার মতো গজানো কোচিং সেন্টারগুলো বন্ধ করে স্কুল-কলেজভিত্তিক পড়াশোনার দিকে গুরুত্ব দেওয়া । কারণ এতে অনেক ভোগান্তির শিকার হতে হয় অভিভাবকদের । ভর্তি পরীক্ষায় প্রশ্নপত্র ফাঁসের কথা এবং তদবির ও দুর্নীতির কথা যারা বলছে তাদের উদ্দেশ্যে বলছি স্কুল, কলেজে যারা ফাঁসকৃত প্রশ্নে পরীক্ষা দিয়েছে তাদের অনেকেরই পুনরায় যাচাইয়ের জন্য পরীক্ষা নেওয়া উচিত। আর সে ক্ষেত্রে শিক্ষা মন্ত্রণালয় থেকে যদি সম্পূর্ণ নিরপেক্ষ একজন ব্যক্তিত্ব, একজন শিক্ষাবিদ, একজন আইনজীবী, পুলিশের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা নিয়ে কয়েকটি টিমের সমন্বয়ে মোবাইল কোর্ট গঠনের মধ্য দিয়ে এ ধরনের ভুয়া শিক্ষার্থী বা প্রশ্ন ফাঁসকারীর শাস্তির ব্যবস্থা করা যায় তবে তা রোধ করা সম্ভব। কারণ আমাদের সমস্যাটা এমনই সুশৃঙ্খল হতে হলে আমাদের লাগামটা টেনে ধরতেই হয়।
আমি মনে করি সবকিছুরই সমাধান সম্ভব যদি সঠিক ব্যবস্থা গ্রহণ করা যায় । নতুন কোনো ব্যবস্থা নেওয়ার আগেই আমাদের ভাবা উচিত সেটা কতটুকু বাস্তবসম্মত ও সময় উপযোগী। শুধু জেএসসি, এসএসসি বা এইচএসসি পরীক্ষা একজন মানুষের মেধা যাচাইয়ের মাপকাঠি হতে পারে না, মেধা যাচাইয়ের জন্য দরকার লিখিত পরীক্ষা । এর মধ্য দিয়ে ভুয়া বা ভেজাল শিক্ষার্থীকে বাদ দিয়ে শুধু মেধাবী শিক্ষার্থীকে পড়ার সুযোগ করে দিতে পারি আমরা ।
লেখক : প্রভাষক, উইমেন অ্যান্ড জেন্ডার স্টাডিজ, বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়, রংপুর

কুন্তলা চৌধুরী