আগেও কয়েকবার জাবি প্রক্টরের পদত্যাগের দাবি উঠেছিল
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে বিশ্ববিদ্যালয় প্রক্টর অধ্যাপক তপন কুমার সাহার পদত্যাগের দাবিতে চলছে আন্দোলন। সর্বশেষ আজ বুধবার ধর্মঘট পালন করেছে বামধারার ছাত্র সংগঠনগুলো এবং জাহাঙ্গীরনগর সাংস্কৃতিক জোট। এর আগে সোমবার উপাচার্যের কার্যালয় চার ঘণ্টা অবরুদ্ধ করে রাখা ও দুই দফায় বিক্ষোভ প্রদর্শন, মঙ্গলবার বিক্ষোভ মিছিল ও উপাচার্য বরাবর স্মারকলিপি দেয় আন্দোলনকারীরা।
তবে প্রক্টর তপন কুমার সাহার পদত্যাগ দাবির এটাই প্রথম ঘটনা নয়। এর আগে ২০১৪ সালের মে মাসে সাধারণ ছাত্রদের নিরাপত্তা দিতে ব্যর্থ হওয়ার অভিযোগ তুলে প্রক্টরের কার্যালয়ে তালা ঝুলিয়ে তাঁর পদত্যাগ দাবি করে শাখা ছাত্রলীগ। সে সময় প্রক্টর কার্যালয়ে তালা ছিল তিনদিন।
২০১৫ সালে পয়লা বৈশাখে যৌন নিপীড়নের ঘটনায় নিরাপত্তা দিতে না পারার অভিযোগ তুলে তাঁর পদত্যাগ চায় আন্দোলনকারী শিক্ষক-শিক্ষার্থী ঐক্য মঞ্চ।
শিক্ষকের বিরুদ্ধে ছাত্রলীগের এক নেতাকে উসকানি দেওয়ার ‘গুরুতর’ অভিযোগে ২০১৫ সালের ডিসেম্বরে তাঁর পদত্যাগ দাবি করে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকদের একটি অংশ।
সে সময় ফার্মেসি বিভাগের পুনর্মিলনী অনুষ্ঠানস্থলের কাছে এক ছাত্রলীগ নেতা কয়েক রাউন্ড ফাঁকা গুলি ছুড়লে ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য অন্য এক ছাত্রলীগ নেতা প্রক্টরের সঙ্গে মুঠোফোনে যোগাযোগ করেন। প্রক্টর ফার্মেসি বিভাগের সভাপতিকে ছাত্রলীগের ওই নেতাকে আটকে রাখার পরামর্শ দেন। কথোপকথনে তাঁকে দাওয়াত দেওয়া হয়নি বলে প্রক্টর ওই বিভাগের সভাপতির প্রতি উষ্মাও প্রকাশ করেন।
পরে ছাত্রলীগ নেতার সঙ্গে প্রক্টরের মুঠোফোনে কথোপকথনের অডিওটি ফাঁস হয়ে যায়। এটা নিয়ে সর্বপ্রথম এনটিভি অনলাইন সংবাদ প্রকাশ করে। এনটিভি অনলাইনে সংবাদ প্রকাশের পর এ নিয়ে ক্যাম্পাসে তোলপাড় সৃষ্টি হয় এবং তাঁর পদত্যাগ দাবি করেন শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা। প্রক্টরের এ ধরনের ‘উসকানিমূলক’ কর্মকাণ্ডের নিন্দা জানিয়ে বিবৃতি দেয় কয়েকটি ছাত্রসংগঠন।
সর্বশেষ সোমবার আধাবেলা হরতালে পুলিশি অ্যাকশন ও আটকের ঘটনায় বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর তপন কুমারের মদদের অভিযোগে জাবি ক্যাম্পাসে ফের শুরু হয় আন্দোলন।
তবে প্রক্টর তপন কুমার সাহা বিশ্ববিদ্যালয় উপাচার্যের ‘আস্থাভাজন’ বলে জানা গেছে।
কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া কলেজের শিক্ষার্থী সোহাগী জাহান তনুসহ সকল গুম, হত্যা ও ধর্ষণের বিচারের দাবিতে প্রগতিশীল ছাত্রজোট ও সাম্রাজ্যবাদবিরোধী ছাত্র ঐক্যের ডাকা হরতাল জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে পালনকালে বিশ্ববিদ্যালয় প্রক্টরের উপস্থিতিতে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রান্তিক গেটে নেতাকর্মীদের ওপর হামলা চালায় পুলিশ বাহিনী। এতে তিনজন গুরুতরসহ ২০জন আহত হন এবং গ্রেপ্তার হন ১২ জন। এতে প্রক্টরের মদদ থাকার অভিযোগ উঠেছে।
গত সোমবার আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্যে আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের তিন সংগঠনের পক্ষ থেকে বলা হয় , ‘আমরা মনে করি বিশ্ববিদ্যালয়ের গেটে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের সবুজসংকেত ছাড়া এ ধরনের কোনো হামলা ও গ্রেপ্তারের ঘটনা ঘটতে পারে না। আমরা বিস্ময়ের সঙ্গে লক্ষ করেছি যে, ঘটনার সময় প্রক্টরিয়াল বডি এবং নিরাপত্তা কর্মকর্তা নীরব ভূমিকায় ছিলেন।’
ছাত্রজোট নেতারা অভিযোগ করে বলেন, ‘আমরা যখন অবরোধ শুরু করি তখন প্রক্টর স্যার ছিলেন, যখন পুলিশ হামলা শুরু করেন তার একটু আগে তিনি সেখান থেকে সরে যান। যাওয়ার সময় নিরাপত্তা কর্মকর্তাকে গেট বন্ধ করে রাখার নির্দেশ দিয়ে যান। পুলিশ আক্রমণ করলে আমরা যখন দৌড়ে ক্যাম্পাসে ঢুকতে যাই তখন দেখি গেট বন্ধ। এতে পুলিশ আমাদের বেধড়ক পেটাতে ও আটক করে নিয়ে যেতে পারে। এতে প্রমাণ হয় পুলিশের সঙ্গে প্রক্টরের এ বিষয়ে যোগাযোগ ছিল।’
তবে প্রক্টর তপন কুমার আন্দোলনকারীদের সব অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছেন। এনটিভি অনলাইনের সঙ্গে আলাপচারিতায় তিনি বলেন, ‘সকাল থেকেই সেখানে ছিলাম। ক্ষুধার্ত হয়ে গেলে নাশতা করার জন্য ক্যাম্পাসের ভেতর কিছু দূর গিয়ে শুনলাম পুলিশ অ্যাকশনে গেছে। তখন জানতে পারলাম একজনকে আটক করা হয়েছে। ওই ছাত্রের ফাইনাল পরীক্ষা থাকায় আমি তখনই পুলিশের সঙ্গে যোগাযোগ করে ক্যাম্পাসের গাড়ি পাঠিয়ে তাঁকে ছাড়িয়ে নিয়ে আসি। পরে ছাত্ররা জানাল, ১০ থেকে ১২ জনকে আটক করা হয়েছে। এ ব্যাপারে উপাচার্যকে দিয়ে পুলিশের উচ্চ মহলে যোগাযোগ করিয়ে আমার জিম্মায় আটক ব্যক্তিদের ছাড়িয়ে নিয়ে আসি।’
প্রশাসনের সবুজসংকেত ছিল কি না সে সম্পর্কে প্রক্টর বলেন, ‘পুলিশ আমাদের সঙ্গে কোনো যোগাযোগই করেনি। আর ঘটনাটা ক্যাম্পাস এলাকার বাইরে মহাসড়কে হওয়ায় এ ব্যাপারে পুলিশের আমাদের অনুমতি নেওয়ারও তো কোনো বাধ্যবাধকতা ছিল না। এটা তো কমনসেন্সের ব্যাপার।’
গেট বন্ধ থাকার ব্যাপারে তিনি বলেন, ‘মহাসড়কে যানজট তৈরি হলে অনেক গাড়িই ক্যাম্পাসের ভেতর দিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছিল। ক্যাম্পাসের ভেতরে যাতে কোনো বিশৃঙ্খলা না হয় তাই গাড়ি ঠেকাতে সবগুলো গেটই তখন বন্ধ ছিল। শুধুমাত্র ওই গেট নয় বরং সবগুলোই বন্ধ ছিল।’
গেট বন্ধ থাকার ব্যাপারে একই কথা বলেছেন নিরাপত্তা কর্মকর্তা জেফরুল হাসান চৌধুরী।
আন্দোলকারীরা স্মারকলিপি দিতে গেলে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ফারজানা ইসলাম তদন্ত করে এ ব্যাপারে ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেছেন বলে এ প্রতিবেদককে নিশ্চিত করেছেন তাঁরা।

জাবি সংবাদদাতা