জাবির তদন্ত কমিটির নিরপেক্ষতা নিয়ে সন্দেহ
বাসচাপায় জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের (জাবি) দুই ছাত্র নিহত হওয়ার ঘটনায় গঠিত তদন্ত কমিটির নিরপেক্ষতা নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করেছেন শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা। কমিটির সদস্যদের সবাই জাবি প্রশাসনের বিভিন্ন পদে যুক্ত থাকায় এই সংশয় প্রকাশ করেন তাঁরা।
ছাত্র নিহতের ঘটনায় বিক্ষোভের জেরে গত ২৭ মে বিশ্ববিদ্যালয়ের সিন্ডিকেটের জরুরি সভায় ক্যাম্পাস অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ ঘোষণা করা হয়। ওই সভায় আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের বিরুদ্ধে মামলার সিদ্ধান্তের পাশাপাশি ক্যাম্পাসে ‘বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি’র ঘটনা তদন্তে ছয় সদস্যবিশিষ্ট একটি কমিটি গঠন করা হয়।
বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের অধ্যাপক অসিত বরণ পালকে ওই কমিটির প্রধান করা হয়েছে। কমিটির অন্য সদস্যরা হলেন অধ্যাপক মো. শাহেদুর রশিদ, অধ্যাপক লুৎফর রহমান, অধ্যাপক রাশেদা আখতার ও সহযোগী অধ্যাপক নাজমুল হাসান তালুকদার। এ ছাড়া ডেপুটি রেজিস্ট্রার (টিচিং/কাউন্সিল) মো. আবু হাসানকে সদস্য সচিব করা হয়েছে।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, কমিটির সদস্যদের মধ্যে অধ্যাপক অসিত বরণ পাল বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর হলের প্রভোস্ট, অধ্যাপক শাহেদুর রশিদ একই সঙ্গে সিন্ডিকেট ও সিনেট সদস্য, ফজিলাতুন্নেছা হলের প্রভোস্ট এবং ভূগোল ও পরিবেশ বিভাগের সভাপতি, অধ্যাপক রাশেদা আখতার সিন্ডিকেট সদস্য, ছাত্র কল্যাণ ও পরামর্শদান কেন্দ্রের পরিচালক এবং যৌন নিপীড়ন বিরোধী সেলের প্রধান, সহযোগী অধ্যাপক নাজমুল হাসান তালুকদার সিন্ডিকেট সদস্য ও মওলানা ভাসানী হলের প্রভোস্ট, অধ্যাপক লুৎফর রহমান সিনেট সদস্য হিসেবে দায়িত্বপালন করছেন।
তদন্ত কমিটির সদস্যদের প্রশাসনপন্থী দাবি করে গঠিত কমিটি পুনর্গঠনের আনুষ্ঠানিক দাবি জানিয়েছে শিক্ষক-শিক্ষার্থী ঐক্যমঞ্চ। শিক্ষক-শিক্ষার্থী ঐক্যমঞ্চের আট দফা দাবির মধ্যে তদন্ত কমিটি পুনর্গঠন অন্যতম একটি দাবি। আট দফা দাবির কথা জানিয়ে গতকাল শনিবার সংবাদ সম্মেলন ও রোববার মানববন্ধন করে সংগঠনটি। দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দেয় তারা।
গতকাল বিশ্ববিদ্যালয়ের নতুন কলা অনুষদে শিক্ষক-শিক্ষার্থী ঐক্যমঞ্চের ডাকা এক সংবাদ সম্মেলনে নৃবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষক অধ্যাপক সাঈদ ফেরদৌস সাংবাদিকদের বলেন, ‘তদন্ত কমিটিতে যাঁরা আছেন, আপনারা খোঁজ করে দেখুন, তাঁরা সবাই প্রশাসনপন্থী, প্রশাসনের বিভিন্ন পদের সঙ্গে যুক্ত আছেন। তদন্তে প্রশাসনের ইচ্ছের প্রতিফলন ঘটবে বলেই আমাদের আশঙ্কা।’ তদন্ত কমিটিতে নিরপেক্ষ ও প্রশাসন সংশ্লিষ্ট নয় এমন শিক্ষকদেরও যুক্ত করার দাবি জানান তিনি।
বিশ্ববিদ্যালয়ের সাংস্কৃতিক জোটের সাধারণ সম্পাদক নাজমুল হোসাইন বলেন, ‘তদন্তে নিরপেক্ষতা থাকবে না বলেই আমাদের আশঙ্কা। কারণ, এ কমিটির সদস্যরা সবাই প্রশাসনঘনিষ্ট ও বিভিন্ন পদে দায়িত্ব পালন করছেন। আমরা চাই নিরপেক্ষ শিক্ষকদের নিয়ে তদন্ত কমিটি পুনর্গঠন করা হোক।’
‘আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের শায়েস্তা করার জন্য তড়িঘড়ি করে তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। কিন্তু আন্দোলনকারীদের ওপর হামলার তদন্তে এখন পর্যন্ত কোনো তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়নি। আমরা এ ব্যাপারে ২৭ মে উপাচার্যকে লিখিত অভিযোগ দিয়েছিলাম, তাঁকে হামলার ভিডিও ফুটেজ ও দেখিয়েছিলাম। তিনি আমাদের তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দিয়েছিলেন, কিন্তু ঘটনার এতদিন পরও এ ব্যাপারে কোনো তদন্ত কমিটি গঠিত হয়নি। এতেই প্রশাসনের মনোভাব বোঝা যায়।’
নাজমুল হোসাইন নামের আন্দোলনকারী এই শিক্ষার্থী বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের দায়ের করা মামলার এক নম্বর আসামি। চিকিৎসাধীন অবস্থায় তাঁকে পুলিশের হাতকড়া পরানোর ঘটনায় দেশজুড়ে আলোচনার সৃষ্টি হয়।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে তদন্ত কমিটির প্রধান অধ্যাপক অসিত বরণ পাল বলেন, ‘কে, কী অভিযোগ করল না করল, সেটা তো বিষয় না। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন তদন্ত কমিটি গঠন করেছে, বিশ্ববিদ্যালয়ের নিয়ম অনুযায়ী কমিটি তদন্ত করবে। এভিডেন্স (তথ্যপ্রমাণ) তো আছেই সব।’
‘নাসিম আখতার হোসাইন (শিক্ষক-শিক্ষার্থী ঐক্যমঞ্চের আহ্বায়ক) তো একটা মিথ্যাবাদী। সে তো মিথ্যা কথা বলে সব সময়। তদন্ত কমিটি নিরপেক্ষভাবেই কাজ করবে। তাদের কাছে যে এভিডেন্স আছে সে অনুযায়ীই কাজ করবে। এখানে তো বায়াসনেস (পক্ষপাতদুষ্ট) হওয়ার কোনো কারণ নেই।’
গত ২৬ মে থেকে ঘটে যাওয়া সার্বিক বিষয়েই তদন্ত করা হবে জানিয়ে ওই শিক্ষক আরো বলেন, ‘যা যা ঘটনা ঘটেছে, সার্বিক বিষয়েই তদন্ত হবে। যে অভিযোগ আছে, ক্যাম্পাসে নিহত শিক্ষার্থীদের লাশ কেন আনতে দেওয়া হলো না। দুই শিক্ষার্থীদের গার্ডিয়ানদের আমরা ডাকব। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন লাশ আনতে চায়নি, নাকি তাঁরা আসতে চায়নি, এটাও আমাদের জানতে হবে।’
‘ওইদিনের ঘটনায় যে রিকশাচালক আহত হয়েছেন, তদন্ত কমিটির প্রথম সভা বসেই আমরা তাঁর ওখানে চলে গেছি। কোনো গাড়ি এক্সিডেন্ট করেছে, সে ভিডিও ফুটেজ আমাদের হাতে আছে। আশা করা যায় গাড়ি শনাক্ত করা যাবে। অতএব তদন্ত কমিটির বায়াসনেস থাকলে এ কাজগুলো কেন করবে! বিশ্ববিদ্যালয়ে একটা গ্রুপ শিক্ষক থাকে তারা বিশ্ববিদ্যালয়কে সবসময় অচল করে দিতে চায়। একটা হীনস্বার্থ ইয়ে করার জন্য।’
বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য আবুল হোসেন এনটিভি অনলাইনকে বলেন, ‘আমরা যাদের কমিটিতে দিয়েছি তারা নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করবে, স্বচ্ছই হবে। আমরা তাই আশা করি।’
গত ২৬ মে তাবলিগ থেকে ক্যাম্পাসে ফেরার পথে রাজধানীর উপকণ্ঠ সাভারে বাসের নিচে চাপা পড়ে জাবির দুই শিক্ষার্থী নিহত হন। নিহত দুজনের জানাজা ক্যাম্পাসে না হওয়ায় বিক্ষুব্ধ শিক্ষার্থীরা ঢাকা-আরিচা মহাসড়র অবরোধ করে। এর পরের দিন শিক্ষার্থীরা আবার ঢাকা-আরিচা মহাসড়ক অবরোধ করে। সেখানে পুলিশ দিয়ে পিটিয়ে তাঁদের তুলে দিলে শিক্ষার্থীরা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের বাসভবন ঘেরাও করে বিক্ষোভ শুরু করে। ওই রাতেই বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধের ঘোষণা আসে সিন্ডিকেট থেকে।

জাবি সংবাদদাতা