গর্বের নাম ডিইউসিএস
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগে লেখাপড়া করেন আহসান রনি। লেখাপড়ার পাশাপাশি দেশ, সংস্কৃতি এসব নিয়েও বিস্তর ভাবনা তাঁর।
রনির মনে হয় জারি, সারি, ভাওয়াইয়া, ভাটিয়ালির মতো বাংলার প্রাচীন সব ঐতিহ্যগুলোর সঙ্গে এখন আর তেমন পরিচিত নয় নতুন প্রজন্ম। ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে দাঁড়ানো এসব লোক সংস্কৃতিকে লালন ও চর্চার জন্য তাই একটি সংগঠন তৈরির কথা ভাবতে থাকেন তিনি। একসময় বন্ধুদের সঙ্গে আলাপ করেন বিষয়টি নিয়ে।
রনি খোঁজখবর নিয়ে দেখেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে বিভিন্ন সাংস্কৃতিক প্রতিযোগিতায় প্রতিনিধিত্ব করার মতো কোনো দল নেই। ফলে অনেক প্রতিযোগিতায় দল পাঠানো যায় না, আবার কোনো প্রতিযোগিতার কর্তৃপক্ষ বিশ্ববিদ্যালয়ে কার কাছে আমন্ত্রণপত্র পাঠাবে তা বুঝতে পারে না। ফলে একটা শূন্যতা তৈরি হয়।
এসব মিলিয়ে নিজের তীব্র ইচ্ছা আর বন্ধুদের আগ্রহে ২০১৫ সালের সেপ্টেম্বর মাসে রনির হাত ধরে জন্ম নেয় ঢাকা ইউনিভার্সিটি কালচারাল সোসাইটি (ডিইউসিএস)।
এখন দেশে-বিদেশে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে উপস্থাপন করছে এই সাংস্কৃতিক সংসদ। সংক্ষেপে যার নাম দেওয়া হয়েছে ডিইউসিএস। এই অল্প সময়ের মধ্যেই সংগঠনের সদস্যরা অর্জন করেছেন জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পুরস্কার। বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন বিভাগের শিক্ষার্থীরা সংগঠনটির মাধ্যমে পরিচিত হচ্ছেন দেশের হারানো সংস্কৃতির সঙ্গে। মূলত বাংলা সংস্কৃতির জারি গান, সারি গান, আবৃত্তি, অভিনয়, নাচ এই বিষয়গুলোকে প্রাধান্য দেয় ডিইউসিএস।
বর্তমানে আহসান রনি ডিইউসিএসের সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। এরই মধ্যে তরুণ উদ্যোক্তা হিসেবে পেয়েছেন যমুনা টেলিভিশন পুরস্কার।
পথচলার শুরু থেকেই চমক দিতে থাকে ডিইউসিএস। ২০১৫ সালেই বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব প্রফেশনালস (বিইউপি) আয়োজিত আন্তবিশ্ববিদ্যালয় সাংস্কৃতিক উৎসবে গীতিনাট্য ‘হৃদয়ে বাংলাদেশ’ পরিবেশন করেন সংগঠনটির সদস্যরা। এতে নয়টি বিশ্ববিদ্যালয়কে পরাজিত করে চ্যাম্পিয়ন হয় ঢাকা ইউনিভার্সিটি কালচারাল সোসাইটি।
হৃদয়ে বাংলাদেশ গীতিনাট্যে মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে গান, কবিতা ও ভাওয়াইয়া গান পরিবেশন করা হয়। ডিইউসিএসের সেই পরিবেশনা দেখে অনুষ্ঠানের বিচারক ও দর্শকরা দাঁড়িয়ে সম্মান প্রদর্শন করেন।
এরপর আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি ডিইউসিএসকে। মাত্র দুই বছরেই সংগঠনটির ঝুলিতে এসেছে ছয়টি চ্যাম্পিয়ন ট্রফি ও পাঁচটি রানার আপ ট্রফি।
আন্তর্জাতিক পর্যায়ে ২০১৬ সালে ভারতের ওপি জিন্দাল ইউনিভার্সিটি আয়োজিত প্রতিযোগিতায় তিনটি বিভাগে চ্যাম্পিয়ন ও তিনটি বিভাগে রানার আপ হয় ঢাকা ইউনিভার্সিটি কালচারাল সোসাইটি। পুরো প্রতিযোগিতায় বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে রানার আপ হয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।

একই বছর বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট) আয়োজিত আন্তবিশ্ববিদ্যালয় আবৃত্তি উৎসবে নিজেদের মৌলিক পরিবেশনা ‘অস্তিত্বে মোর বাংলাদেশ’ মঞ্চায়ন করে ব্যাপক প্রশংসিত হয় সংগঠনটি। এরপর ২০১৬ সালের ১৫ মার্চ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মল চত্বরে বসন্ত উৎসবের আয়োজন করে সংগঠনটি। সেখানে গ্রামীণ মেলা, পুতুলনাচ, বায়োস্কোপ, সাপের খেলা, লাঠিখেলা, গম্ভীরা, পুঁথিপাঠ, লোকগানসহ বাঙালির হারিয়ে যাওয়া নানা ঐতিহ্যের কথা মনে করিয়ে দেওয়া হয়।
এই আয়োজন সম্পর্কে আহসান রনি বলেন, গত এক দশকে মঙ্গল শোভাযাত্রার পরে বসন্ত উৎসব ছিল সবচেয়ে বড় উৎসব।
২০১৬ সালের জুনে ডিইউসিএস আয়োজন করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্প। যেখানে দেশের প্রায় ৩০ জন গণমাধ্যম ব্যক্তিত্ব প্রশিক্ষক হিসেবে অংশ নেন। এরপর বঙ্গবন্ধুর ৪১তম মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে তাঁর লেখা ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’র ওপর রিভিউ প্রতিযোগিতার আয়োজন করা হয়। যা শিক্ষার্থীদের মধ্যে বঙ্গবন্ধু সম্পর্কে আগ্রহ বাড়ায় ও ব্যাপক সাড়া ফেলে।
এ ছাড়া এ ট্রিবিউন টু স্যার লাকী আকন্দ, ছবিতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, ডাবর ভাটিকা ক্যাম্পাস স্টার, পঞ্চম সঞ্জীব উৎসব, আন্তবিশ্ববিদ্যালয় সাংস্কৃতিক প্রতিযোগিতার আয়োজন করে বিভিন্ন মহলের প্রশংসা অর্জন করে ডিইউসিএস।
শুধু কি সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড? সামাজিক কর্মকাণ্ডেও পিছিয়ে নেই ডিইউসিএস। গত বছর ঈদে সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের মাঝে নতুন কাপড় বিতরণ করে সংগঠনটি। আবার ‘জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে বাংলাদেশ’ শিরোনামে মানববন্ধনও করেন ডিইউসিএসের সদস্যরা।
সংগঠনটির মডারেটরের দায়িত্বে আছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক সাবরিনা সুলতানা চৌধুরী।
বর্তমানে সংগঠনটির সদস্য সংখ্যা পাঁচশর ওপরে। প্রতিবছর মৌখিকভাবে বাছাইয়ের মাধ্যমে ২০০ জনকে সদস্যকে হিসেবে নেওয়া হয়। যাঁরা বাংলা সংস্কৃতিকে জানেন ও চর্চা করেন, তাঁরাই কেবল এই সংগঠনের সদস্য হিসেবে নির্বাচিত হতে পারেন।
সংগঠনের সামগ্রিক কার্যক্রম নিয়ে সভাপতি আহসান রনি বলেন, সংগঠন হিসেবে ডিইউসিএসের সাফল্যে তিনি আনন্দিত। সংগঠনের প্রয়োজনের তুলনায় বাজেটের পরিমাণ কম, বাজেট বাড়ানো উচিত বলে মনে করেন তিনি।
সংগঠনটির সাধারণ সম্পাদক অর্ক রাহাবার বলেন, সংগঠনটি দেশে ও বিদেশে বিভিন্ন প্লাটফর্মে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে প্রতিনিধিত্ব করে, সুষ্ঠু সংস্কৃতির চর্চা করে। সে কারণে দিন দিন এর সাফল্যের মুকুটে যোগ যোগ নতুন নতুন পালক।

শামীমা নাসরিন শাম্মী, মাহাবীর হাসান মারুফ