চিকিৎসাবিদ্যা নয়, সংগীতকেই বেছে নিয়েছেন আশা
বাবা-মা চেয়েছিলেন মেয়ে চিকিৎসক হবে, পরিবারের মুখ উজ্জ্বল করবে। কিন্তু মেয়ে আশা সরকারের মনে ছিল অন্য আশা। তাই পরিবারের মুখ তিনি উজ্জ্বল করেছেন ঠিকই, তবে সেটা চিকিৎসক হয়ে নয়।
এ বছর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিনস অ্যাওয়ার্ড পেয়েছেন আশা। সংগীত বিভাগ থেকে স্নাতক ও স্নাতকোত্তরে প্রথম স্থান অর্জন করায় তাঁর হাতে তুলে দেওয়া হয়েছে এই পুরস্কার।
আর এভাবেই পরিবারের নয় বরং নিজের পছন্দের বিষয়ে সেরাদের একজন হয়ে ঠিকই পরিবারের মুখ উজ্জ্বল করেছেন আশা সরকার।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন বিভাগের প্রথম স্থান অর্জনকারী শিক্ষার্থীদের প্রতিবছর দেওয়া হয় এই ডিনস অ্যাওয়ার্ড। পুরস্কার হিসেবে তাঁদের হাতে পদক তুলে দেওয়া হয়। প্রতি ব্যাচ থেকে কেবল একজন শিক্ষার্থীর স্বপ্নই বাস্তবে রূপ নেয়। এ বছর সেই তালিকায় রয়েছে আশার নাম।
এনটিভি অনলাইনের সঙ্গে কথোপকথনের একপর্যায়ে আশা জানালেন, ছোটবেলা থেকেই সংগীতে আগ্রহ ছিল তাঁর। বগুড়ায় জন্ম নেওয়া আশা দুই ভাইবোনের মধ্যে ছোট। মূলত বড় ভাইয়ের কাছ থেকেই সংগীতচর্চার আগ্রহ জন্মে তাঁর মধ্যে। সেই সঙ্গে ছিল মা-বাবার উৎসাহও।
আশা সরকার বলেন, পড়াশোনার পাশাপাশি তৃতীয় শ্রেণি থেকেই গান শিখতেন তিনি। ছোটবেলাতেই বগুড়া জেলা শিশু একাডেমিতে পাঁচ বছরের একটি কোর্স করেন। গান শিখতে ভর্তি হন বগুড়া করতোয়া সংগীত নিকেতনে। তাঁর গানের গুরু ছিলেন বাবুল স্যার। গানের প্রতি ভালোবাসাটাও জন্মেছে এই শিক্ষকের কাছ থেকে।
একপর্যায়ে বিভিন্ন প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়ে পুরস্কার জিততে শুরু করেন আশা। এর মধ্যে প্রথমবারের মতো শিশু একাডেমির ২১শে ফেব্রুয়ারি প্রতিযোগিতায় দেশাত্মবোধক গান গেয়ে দ্বিতীয় পুরস্কার পান। এ ছাড়া ‘আমরা কজন শিল্পগোষ্ঠী-তে পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত নাচও শিখেছেন আশা। তবে পঞ্চম ও অষ্টম শ্রেণিতে বৃত্তি পরীক্ষার কারণে গানের চর্চাটা কিছুদিনের জন্য বাদ পড়ে যায়। কারণ বাবা-মা চাইতেন লেখাপড়ায় যেন আশা বেশি মনোযোগ দেন। সে কারণে নবম শ্রেণিতে ওঠার পর এসএসসি পরীক্ষার কারণে গানের চর্চা বন্ধ করে দেন।

আশা জানালেন, তাঁর পরিবার সব সময় চাইত তিনি যেন চিকিৎসাবিদ্যা পড়েন। কিন্তু তাঁর ইচ্ছা ছিল সৃজনশীল কোনো বিষয়ে পড়ার। অষ্টম শ্রেণিতে পড়ার সময় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সংগীত বিভাগের শিক্ষক মো. শোয়েবের সঙ্গে পরিচয় হয় একটি কর্মশালায়। সে সময় তাঁর কাছ থেকে সংগীত বিভাগ সম্পর্কে জেনে ওই বিভাগে পড়ার আগ্রহ তৈরি হয় তাঁর মধ্যে।
২০০৭ সালে এসএসসি পরীক্ষাতে বগুড়া সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের বিজ্ঞান বিভাগ থেকে গোল্ডেন জিপিএ ৫ ও ২০০৯ এইচএসসি পরীক্ষাতে বগুড়ার সরকারি আযিযুল হক কলেজের বিজ্ঞান বিভাগ থেকে জিপিএ ৪.৮০ পান আশা।
এরপর ইচ্ছা না থাকলেও মেডিকেলে ভর্তি পরীক্ষা দেন। একই বছর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষায় ‘ঘ’ইউনিটে ১,২৩৬তম স্থান অর্জন করেন। মৌখিক পরীক্ষা শেষে ভর্তি হন স্বপ্নের বিভাগে। আর এ জন্য পাশে থেকে উৎসাহ দিয়েছেন আশার বড় ভাই। তাঁর বড় ভাইয়ের মতে, যেদিকে ইচ্ছা ও আগ্রহ সেদিকেই যাওয়া উচিত, যে বিষয় নিয়েই পড়া উচিত যাতে ভালো কিছু করা যায়।
সংগীত নিয়ে পড়ার আগ্রহ সম্পর্কে আশা বলেন, ‘যেহেতু ভালো লাগার জায়গা থেকে এসেছি, ভালোবাসার একটা সাবজেক্ট তাই আমাকে অবশ্যই ভালো একটা কিছু করতে হবে।’
তাই ভর্তি হয়েই থেমে থাকেননি আশা। লক্ষ্য ঠিক করে এগিয়ে যান তিনি। প্রথম সেমিস্টারে তাঁর ব্যাচের মধ্যে সর্বোচ্চ সিজিপিএ ৩.৮১ পান। প্রথম সেমিস্টারে প্রথম হওয়ার পর তাঁর আগ্রহটা আরো বেড়ে যায়, তার মধ্যে একটা সাহস চলে আসে। বিভাগের শিক্ষক ও সিনিয়ররা অনেক উৎসাহ দেন, অনুপ্রেরণা দেন।
অনার্স শেষে সংগীত বিভাগের তাঁর ব্যাচের সর্বোচ্চ সিজিপিএ ৩.৮৭ পান আশা সরকার। ফলস্বরূপ একে একে জিতে নিয়েছেন ডিনস অ্যাওয়ার্ড, নীলুফার ইয়াসমিন স্মৃতি বৃত্তি, রোকেয়া হল অ্যালামনাই অ্যাসোসিয়েশন বৃত্তি। মাস্টার্স শেষে দেখা গেল, আশা পেয়েছেন ব্যাচের সর্বোচ্চ সিজিপিএ ৩.৯৯।
আশা বললেন, তাঁর এই সাফল্যের পেছনে রয়েছে পরিশ্রম আর জানার আগ্রহ। ভালো ফলাফল করার জন্য পরিশ্রমের কোনো বিকল্প নেই। নবীন শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে তিনি বলেন, সংগীতটাকে ভালোবেসে শেখা উচিত, জোর করে নয়। কিছু অর্জন করে নেওয়া সংগীত থেকে, এখান থেকে অনেক কিছু অর্জন করে নেওয়ার আছে। এনটিভি অনলাইনকে তিনি বলেন, ‘ভালো গান গাওয়ার জন্য ভালো মানুষ হতে হয় আগে, আত্মাকে পরিশুদ্ধ করতে হয়।’

শুধু লেখাপড়াই নয়, স্কুলপর্যায় থেকেই খেলাধুলা ও অন্যান্য সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে পারদর্শী ছিলেন তিনি। বিশ্ববিদ্যালয়ে এসে নিয়মিত সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে নেন।
শুধু ভালো ফলাফলেই নয়, আন্তর্জাতিক পর্যায়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে প্রতিনিধিত্বও করেছেন আশা। ২০১৫ সালে ভারতের দিল্লিতে ‘ইয়ুথ ডেলিগেশন’ প্রোগামে বাংলাদেশ থেকে ১০০ জনের একটি প্রতিনিধিদল যায়। যেখানে আশা তাঁর সংগীত বিভাগকে প্রতিনিধিত্ব করেন। রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখার্জির নিমন্ত্রণে তাঁরা রাষ্ট্রপতির ভবনে যান। এটা তাঁর জীবনের বড় একটা অর্জন বলে জানান তিনি।
ওই সফরে দিল্লির পার্ক প্লাজা হোটেলের লবিতে গান গেয়ে দর্শকদের অভিভূত করেন আশা। মূলত সেখানে মেলোডি ধাঁচের গান করেন। ‘বন্দে মাতারাম’, ‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি’—এই গানগুলো পরিবেশন করেন তিনি।
এর আগে জাতীয় পর্যায়ে ২০০২ সালে ‘জাতীয় শিশু পুরস্কার’ অনুষ্ঠানে প্রথম রানার আপ এবং নতুন কুঁড়িতে দেশাত্মবোধক গানে প্রথম হন আশা। সংগীত বিভাগ আয়োজিত বিভিন্ন অনুষ্ঠানে অংশ নেন তিনি। ঢাবির বটতলায়, হোটেল রেডিসনে, বিজনেস ফ্যাকাল্টিতে গানের অনুষ্ঠান করেন। চ্যানেল আইয়ে ‘গানে গানে সকাল’ এনটিভিতে ‘টিফিনের ফাঁকে’ ও মোহনা টিভিতেও তিনি গানের অনুষ্ঠান করেন। আর এসব সুযোগের জন্য আশা ধন্যবাদ জানালেন সংগীত বিভাগের চেয়ারপারসনকে।
বর্তমানে আশা সরকার জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের সংগীত বিভাগের প্রভাষক হিসেবে কর্মরত। ভবিষ্যতে সংগীতকে নিয়ে আরো এগিয়ে যাওয়া এবং শুদ্ধভাবে সংগীতকে শিখতে চান তিনি। আশা বলেন, ‘সংগীতটা বিশাল সমুদ্রের মতো, সেখানে ডুব দিয়ে দেখতে চাই। যতদিন বেঁচে আছি, সংগীত নিয়েই বেঁচে থাকব এবং সংগীত শিখে যেতে চাই।’
সংগীতের বিভিন্ন ধারার মধ্যে আশার পছন্দ নজরুলসংগীত। তাই নজরুলের সনাতনধর্মী গানের ওপরেই এমফিল করছেন ঢাবির শিক্ষক আকলিমা হোসেন কোহিলির তত্ত্বাবধানে।
অবসরে ছবি দেখতে ও বই পড়তে পছন্দ করেন আশা সরকার। কোন ধরনের ছবি পছন্দ করেন এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, “এ বিউটিফুল মাইন্ড’, ‘মাটির ময়না’, ‘বেলা শেষে’, ‘পোস্ত’, সত্যজিৎ রায়ের ‘হীরক রাজার দেশে’, ‘গোপী গাইন বাঘা বাইন’—এসব মুভি আমার অনেক ভালো লেগেছে।”
এ ছাড়া সমরেশ মজুমদারের ‘সাতকাহন’, ‘গর্ভধারিণী’, ‘জোছনা ও জননীর গল্প’, জাফর ইকবালের ‘আমি তপু’ তাঁর পছন্দের বইগুলোর মধ্যে অন্যতম।

মাহাবীর হাসান মারুফ, শামীমা নাসরিন শাম্মী