দেশব্যাপী স্বেচ্ছায় রক্তদানে উদ্বুদ্ধ করছে বাঁধন
প্রত্যাশার মা বারডেম হাসপাতালে ভর্তি। জরুরি ভিত্তিতে অস্ত্রোপচারের জন্য এক ব্যাগ ‘এ নেগেটিভ’ রক্তের প্রয়োজন। রক্তের গ্রুপ দুর্লভ হওয়ায় হাসপাতালের ব্লাড ব্যাংকেও জমা নেই। এ জন্য চলে আসলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসি সংলগ্ন বাঁধনের অফিসে।
প্রতিদিন দূর-দূরান্ত থেকে রক্তের জন্য এভাবে বাঁধনের অফিসে ছুটে আসেন শত শত মানুষ। শুধু টিএসসি নয়, বর্তমানে ৩৭ জেলায় রয়েছে বাঁধনের শাখা। এভাবেই দেশব্যাপী স্বেচ্ছায় রক্তদান ও বিপুল মানুষের রক্তের চাহিদা মেটাচ্ছে বাঁধন। বাঁধনের উদ্যোগে ২০১৬ সালে প্রায় ৫৭ হাজার ৮৩৯ ব্যাগ রক্ত সংগৃহীত হয় এবং গত ২০ বছরে বিনামূল্যে ছয় লাখ ৮৫ হাজার ব্যাগেরও বেশি রক্ত সরবরাহ করা হয়েছে।
বাঁধন মূলত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসিকেন্দ্রিক শিক্ষার্থীদের পরিচালিত অঞ্চল, দল-মত, বর্ণ নিরপেক্ষ, সম্পূর্ণ অরাজনৈতিক, অসাম্প্রদায়িক ও স্বেচ্ছাসেবী সামাজিক সংগঠন। ১৯৯৭ সালের ২৪ অক্টোবর শহীদুল্লাহ হলের ছাত্র শাহিদুল ইসলাম রিপনের হাত ধরে সংগঠনটির যাত্রা শুরু হয়।
এ সম্পর্কে বাঁধনের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় জোনের বর্তমান সভাপতি শহিদুল ইসলাম সনেট বলেন, শহীদুল্লাহ হল ঢাকা মেডিকেলের কাছাকাছি হওয়ায় বিভিন্ন সময়ে লোকজন রক্তের জন্য হলে আসতেন। এই সময় শাহিদুল ইসলাম রিপন সাহায্যের জন্য রক্তের প্রয়োজনীয়তা অনুভব করলেন এবং নিজ উদ্যোগে মানুষের রক্তের গ্রুপ জানতে চান, সেখান থেকেই রক্তদানের জন্য শহীদুল্লাহ হল থেকেই প্রাথমিক পর্যায়ের কার্যক্রম শুরু করেন। স্বেচ্ছায় রক্তদানকে সামাজিক আন্দোলনে পরিণত করতে চান। এরপর টিএসসি থেকে সারা দেশে বাঁধনের নাম ছড়িয়ে পড়ে।
‘একের রক্ত অন্যের জীবন, রক্তই হোক আত্মার বাঁধন’ স্লোগান নিয়ে কাজ করে বাঁধন। এই সংগঠন প্রধানত স্বেচ্ছায় রক্তদানকে উদ্বুদ্ধকরণ, স্বেচ্ছায় রক্তদান, অন্যান্য সেবা ও কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে সুস্থ সমাজ বিনির্মাণে সামাজিক আন্দোলন গড়ে তোলে।
বাঁধনের বিভিন্ন কর্মসূচির মাধ্যমে দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র ও যুবসমাজকে স্বেচ্ছায় রক্তদানে উদ্বুদ্ধ করে, বিনামূল্যে রক্তের গ্রুপ নির্ণয়, মুমূর্ষুদের প্রয়োজনে স্বেচ্ছায় রক্তদান, বিভিন্ন প্রাকৃতিক ও মানবসৃষ্ট দুর্যোগ মোকাবিলায় জরুরি ত্রাণ, পুনর্বাসনের কার্যক্রম পরিচালনা করে।
বাঁধনের প্রতিটি কর্মী স্বপ্ন দেখেন, যেদিন বাংলাদেশের প্রতিটি মানুষ নিজ রক্তের গ্রুপ জানবে এবং স্বেচ্ছায় রক্তদানে এগিয়ে আসবে। আর সেই দিন এই দেশে রক্তের অভাবে একটি জীবন প্রদীপও নিভে যাবে না।
সংগঠনটি ২০ বছর অতিক্রম করে ২১ বছরে পদার্পণ করেছে। ২০১৬ সাল নাগাদ ৩২ জেলায় ও ৪৮টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ৮টি জোন, ১০৭টি ইউনিট এবং সাতটি পরিবারের মাধ্যমে কার্যক্রম চলছে।
বর্তমান সভাপতি বলেন, আগামী ২০২১ সালের মধ্যে বাংলাদেশের ৬৪ জেলায় কমপক্ষে একটি করে ইউনিটের কার্যক্রম শুরু করার স্বপ্ন দেখেন তাঁরা। বাংলাদেশের বিভিন্ন প্রান্তের বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ের শিক্ষার্থীরা বাঁধনের সঙ্গে যুক্ত থেকে রক্তদানের মতো কার্যক্রমের মহান দায়িত্ব পালন করছেন।
আবার বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষার সময়ে কলাভবন, ব্যবসায় শিক্ষা অনুষদ, বিজ্ঞান অনুষদ ও সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের সামনে বাঁধনের উদ্যোগে ফ্রি ব্লাড গ্রুপিং ক্যাম্প অনুষ্ঠিত হয়। বাঁধনের টিএসসির অফিস সন্ধ্যা ৬-৯ পর্যন্ত খোলা থাকে এবং হল ইউনিট রাত ১০-১১ পর্যন্ত খোলা থাকে। আবার প্রতিবছর সর্বোচ্চ রক্তদাতাকে সম্মাননা দেওয়া হয়।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় জোনের সাধারণ সম্পাদক ইসমাইল হোসেন বলেন, একজনের মাধ্যমে অন্যের উপকারে আসা, আন্তরিক জায়গা থেকে রক্ত দেওয়া ইত্যাদি উদ্যোগের ফলে একটা আত্মিক সম্পর্ক গড়ে ওঠে। আর সেই কাজটি করছে বাঁধন।

শামীমা নাসরিন শাম্মী