দেশের সর্বোচ্চ শহীদ মিনার
ভারত ও পশ্চিম পাকিস্তান পূর্ণ স্বাধীনতা ভোগ করতে থাকলেও পূর্ব পাকিস্থানে শুরু হলো শোষণের নতুন মাত্রা। পশ্চিম পাকিস্তানিরা বাঙালিদের নিগ্রহ করতে থাকল বর্ণনাতীত, জোর জবরদস্তি চালাতে থাকল এখানকার ভাষা ও সংস্কৃতির ওপর। এই নতুন পরাধীনতার জালে আবদ্ধ হয়ে বাঙালির সংগ্রামও শুরু হয় নতুন করে। এই সংগ্রামের মধ্যে প্রথম এবং অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে বায়ান্নর ভাষা আন্দোলন। সাতচল্লিশ পরবর্তী সময়েই যখন শাসকরা অন্যায়ভাবে উর্দুকে রাষ্ট্রভাষা হিসেবে চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করল, তখন থেকেই সংগ্রামের সূচনা।
১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি ছিল এ সংগ্রামের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিন। রফিক, জব্বার, সালাম, বরকতসহ আরো নাম না জানা বীরের আত্মত্যাগের বিনিময়ে অর্জিত হলো অধিকার, বাংলাকে পেলাম রাষ্ট্রভাষা হিসেবে, আর রচিত হলো এমন এক বীরত্বের ইতিহাস যার নজীর পৃথিবীতে ছিল না কখনো। ভাষার জন্য আত্মত্যাগ করা এই বীরদের জন্যই আজো আমরা বাংলায় কথা বলছি, গান গাচ্ছি, কবিতা লিখছি। তাঁদের এই মহৎ আত্মত্যাগকে শ্রদ্ধা জানানোর জন্য এবং অমর এই কৃর্তিকে স্মরণীয় করে রাখতে দেশের বিভিন্ন স্থানে প্রতিষ্ঠা করা হয় শহীদ মিনার।
পূর্ব বাংলার মানুষদের সর্বশেষ সংগ্রাম বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের ঠিক পর পরই প্রতিষ্ঠিত হয় দেশের অন্যতম প্রধান এই বিদ্যাপীঠ। ৩০ লাখ শহীদের এই আত্মত্যাগের আবেগও তাই জড়িয়ে আছে জাহাঙ্গীরনগরের সাথে। তাই বায়ান্নর ভাষা আন্দোলন এবং একাত্তরের স্বাধীনতা যুদ্ধের স্মরণে এবং শহীদদের শ্রদ্ধা জানানোর জন্য জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রতিষ্ঠা করা হয় দেশের সর্বোচ্চ এবং অন্যতম সুন্দর ও মনোমুগ্ধকর স্থাপত্যশৈলীতে সমৃদ্ধ শহীদ মিনার। এই শহীদ মিনারের স্থাপত্যকর্মে খুব সুন্দরভাবে চিত্রিত হয়েছে এই ভূখণ্ডের বিধৃত ইতিহাসের প্রতিচ্ছবি ও গৌরবগাঁথা। ১৯৫২ সালের মহান ভাষা আন্দোলনকে সব অর্জনের ভিত্তি হিসেবে বিবেচনা করে তৈরি এ শহীদ মিনারের ভিত্তিমঞ্চের ব্যাস রাখা হয়েছে ৫২ ফুট এবং ৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধ ও শহীদদের জানিয়ে ভিত্তিমঞ্চ থেকে উন্মুক্ত আকাশগামী তিনটি স্তম্ভের উচ্চতা রাখা হয়েছে ৭১ ফুট। ঊর্ধ্বগামী প্রতিটি স্তম্ভের রয়েছে পৃথক পৃথক বিশেষ তাৎপর্য।
এর মধ্যে প্রথমটি 'বাংলা ভাষা- সাহিত্য-সংস্কৃতি', দ্বিতীয়টি 'মাটি-মানুষ, প্রতিবাদ-প্রতিরোধ, আন্দোলন-সংগ্রাম' এবং তৃতীয়টি 'স্বাধীনতা- সার্বভৌমত্ব, অর্থনীতি, মুক্তি ও গণতান্ত্রিক চেতনার' প্রতীক হিসেবে বিবেচিত হয়েছে। শূন্যের দিকে উন্মুক্ত এই স্তম্ভগুলো আমাদের মুক্ত বিহঙ্গের মতো স্বাধীন হতে শেখায় এবং আমাদের অসীমের দিকে গন্তব্যকে নির্দেশ করে। শহীদ মিনারে ভিত্তিমঞ্চে ব্যবহার করা হয়েছে আটটি সিঁড়ি, যেগুলো হচ্ছে আমাদের দেশ- বিভাগোত্তর জাতীয় জীবনের স্বাধীনতা-অভিমুখী নানা আন্দোলনে তাৎপর্যমণ্ডিত আটটি বছর অর্থাৎ ১৯৪৭, ১৯৫২, ১৯৫৮, ১৯৬২, ১৯৬৬, ১৯৬৯, ১৯৭০ ও ১৯৭১-এর প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন এবং এসব আন্দোলনের ধারাবাহিকতার প্রতীক। সিঁড়ি থেকে আরেকটু দূর পর্যন্ত শহীদ মিনারের চার পাশে ইট বিছিয়ে তৈরি করা হয়েছে গোল চক্কর। শহীদ মিনার তৈরিতে ব্যবহৃত প্রত্যেকটি ইট লাল। এই লাল হচ্ছে বিভিন্ন সংগ্রামের সময় ঝরেপড়া রক্তের প্রতীক।
প্রায় ৬৫ লাখ টাকা ব্যায়ে তৈরি অসাধারণ স্থাপত্যশৈলীর অনন্য এই শহীদ মিনারের নকশা করেছেন খ্যাতনামা স্থপতি রবিউল হোসাইন। শহীদ মিনারটির ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করা হয় ২০০৪ সালের ৬ নভেম্বর। এরপর ২০০৬ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি ভাষা শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে পুস্পস্তবক অর্পণের মাধ্যমে শহীদ মিনারটির উদ্বোধন করেন বিশ্ববিদ্যালয়ের তৎকালীন উপাচার্য খন্দকার মুস্তাহিদুর রহমান। প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের লীলাভূমি, সবুজে আচ্ছাদিত জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় প্রকৃতিপ্রেমিদের এক আরাধ্য স্থান। এই নৈসর্গের ভেতরই সংস্কৃতির দীপ্ত পদচলা। সংস্কৃতির রাজধানী নামকে আরো পাকাপোক্ত করেছে এর ঐতিহাসিক ঘটনার ওপর নির্মিত স্থাপত্যগুলো। তাই ইতিহাস, সংস্কৃতি ও স্থাপত্যপ্রেমীদের জন্যও জাহাঙ্গীরনগর এক আগ্রহের ও আবেগের নাম। এসব স্থাপত্যকর্মের মধ্যে দেশের সর্বোচ্চ এই শহীদ মিনার সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ।
ক্যাম্পাসের কেন্দ্রস্থলে অবস্থিত এই শহীদ মিনার স্বগর্বে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে। ক্যাম্পাসের ফটক দিয়ে সোজা তাকালেই দেখা যায় এর অস্তিত্ব। এর পাশেই অবস্থিত নতুন কলা ভবন, এর অন্য পাশে একটু সামনে এগোলেই কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগার। ফটক থেকে রাস্তাটি সোজা শহীদ মিনারের পূর্ব পাশ পর্যন্ত এসে এর দুটি শাখা দুদিকে চলে গিয়ে আবার সংযুক্ত হয়েছে পশ্চিম পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া প্রধান সড়কের সাথে। এর ফলে শহীদ মিনার প্রাঙ্গণটি হয়েছে ত্রিকোণাকার, যা একে করেছে আরো সৌন্দর্যমণ্ডিত। পুরো শহীদ মিনার প্রাঙ্গণটি সবুজ ঘাসে ও বাহারী রঙের ফুলগাছে আচ্ছাদিত। রাস্তার পাশের উঁচু উঁচু বৃক্ষের ডালপালার আচ্ছাদনে বর্ণিল হয়ে উঠে স্থানটি। ওপর থেকে দেখতে বৃত্তাকার হওয়ায় সবুজ ক্যাম্পাসের মাঝে লাল শহীদ মিনারটিকে মনে হয় জাতীয় পতাকার লাল বৃত্ত! শহীদ মিনার প্রাঙ্গণের সবুজ ঘাসে বসে এর চূড়ার দিকে চেয়ে দেখতে থাকা আকাশটার মতো মনে হয় এর উচ্চতা। সত্যিই তো তাই, যুগ যুগ ধরে পৃথিবীর বুকে মাথা উঁচু করে রাখবে আমাদের গৌরবগাঁথা, শ্রদ্ধায় চিরদিন স্মরণীয় করে রাখবে শহীদদের, এই লাল ইটের শহীদ মিনার।
যাতায়াত :
ঢাকা থেকে অল্প সময়ে খুব সহজেই পৌঁছে যেতে পারেন সংস্কৃতির রাজধানী জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে। ঢাকার বিভিন্ন বাসস্ট্যান্ড থেকে একটু পর পরই নবীনগর কিংবা ধামরাইগামী বাস ছেড়ে আসে। তার কোনো একটাতে চড়ে এলেই আপনাকে নামিয়ে দেবে ক্যাম্পাসের ফটকে। আসতে পারেন নিজের গাড়িতেও। ফটক থেকে ক্যাম্পাসের প্রধান সড়ক বরাবর তাকালেই আপনার চোখে পড়ে যাবে লাল সিরামিক ইটের তৈরি দেশের সর্বোচ্চ শহীদ মিনারটি। কয়েক মিনিট হাঁটলেই পৌঁছে যাবে শহীদ মিনার প্রাঙ্গণে, দেখতে থাকবেন দেশের সর্বোচ্চ শহীদ মিনার, মন জুড়ে ভাসতে থাকবে বায়ান্ন কিংবা একাত্তরে সেই বীরত্বগাঁথা, গৌরবগাঁথা, নিজের ভেতর চমকে উঠবে অন্যরকম এক মর্যাদাবোধ। সেই বোধকে জাগাতে চলে আসুন জাবির ক্যাম্পাসে। এই ক্যাম্পাসে আপনাকে স্বাগতম।

হাসান মেহেদী