চেতনা ফিরছে না অধ্যাপক সিরাজুল হকের
‘মাঝে মাঝে দু-একবার চোখ মেললেও ক্ষণিকের মধ্যেই তা বন্ধ হয়ে যায়। কারণ সাধারণ মানুষের যেখানে চেতন থাকার মাত্রা ১৫, সেখানে তাঁর মাত্র ছয়-সাত। এভাবে তিনি অচেতন পড়ে আছেন এক মাসেরও বেশি সময় ধরে। আরো এভাবেই অচেতন হয়ে থাকতে হবে কমপক্ষে ছয় মাস থেকে বছর খানেক। তবে পূর্ণ সুস্থতা কখনোই সম্ভব না।’
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের সাবেক সভাপতি ও প্রখ্যাত গবেষক অধ্যাপক ড. খোন্দকার সিরাজুল হকের এমন মুমূর্ষু অবস্থা বর্ণনা করেন তাঁর বড় ছেলে খোন্দকার জাহাঙ্গীর সিরাজ।
গবেষণায় সামগ্রিক অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ ২০১৩ সালে ‘বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার ২০১২’ লাভ করেন সিরাজুল হক। এ ছাড়া ২০১২ সালে বাংলা একাডেমি তাঁকে গবেষণা-সাহিত্যে সামগ্রিক অবদানের জন্য ‘সা’দত আলী আখন্দ সাহিত্য পুরস্কার ২০১১’ প্রদান করে।
পারিবারিক সূত্রে জানা যায়, গত ২৬ ডিসেম্বর বাংলা একাডেমির বার্ষিক সাধারণ সভায় অংশগ্রহণ করতে সিরাজুল হক ঢাকায় আসেন। ২৭ ডিসেম্বর বিকেলে সব্যসাচী লেখক সৈয়দ শামসুল হকের এক অনুষ্ঠান শেষে নিউ ইস্কাটনে এক স্বজনের বাসায় যান। সেখানেই তিনি রাত সাড়ে ৮টার দিকে মস্তিষ্কের রক্তক্ষরণজনিত অসুখে (স্ট্রোক) আক্রান্ত হন। পরের দিন মহাখালীর মেট্রোপলিটন হাসপাতালে জরুরি ভিত্তিতে দুপুর আড়াইটার দিকে তাঁর মস্তিষ্কে অস্ত্রোপচার করা হয়।
কিন্তু ৭২ ঘণ্টার মধ্যে তাঁর জ্ঞান না ফেরায় গত ১২ জানুয়ারি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ) স্থানান্তর করা হয়। তার পর থেকে এখনো সিরাজুল হক সেখানে অচেতন অবস্থায় আছেন।
জাহাঙ্গীর সিরাজ বলেন, ‘বাবাকে এখনো ভেন্টিলেটর দেওয়া হচ্ছে। শরীরের বাম পাশটাও প্যারালাইজড হয়ে গেছে। চিকিৎসকদের মতে, বাবা পূর্ণ সুস্থ কখনোই হবেন না। ঠিকমতো ওষুধ আর যত্ন নিতে পারলে সচেতনতার মাত্রা ১১-১২ হতে পারে। তবে তার জন্যও সময় লাগবে কমপক্ষে ছয় মাস থেকে এক বছর। সময় আরো বেশিও লাগতে পারে। আর সচেতনতার লেভেল বেড়ে ১১-১২ হলে বাবা হয়তো দেখতে পারবে, চিনতে পারবে। তবে আগের মতো স্বাভাবিকভাবে কাজকর্ম করতে পারবে না।’
জাহাঙ্গীর সিরাজ আরো বলেন, ‘স্ট্রোক করার পর থেকে এখন পর্যন্ত প্রায় খরচ হয়েছে আট লাখ টাকা। প্রতিদিন খরচ হচ্ছে প্রায় সাত হাজার টাকা করে। জীবনে অর্থবিত্তের প্রতি মোহ না থাকায় পৈতৃক ভিটায় বাড়ি ছাড়া সম্পত্তি বলতে তেমন কিছু নেই বাবার। ২০০৬ সালে অবসরে যাওয়ার পর থেকে চলেছেন পেনশনের টাকায়। বিভিন্ন বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে ক্লাস নেওয়ার সুযোগ এলেও তিনি তা আদর্শিক কারণে করাননি।’
চিকিৎসার খরচ চলছে কীভাবে জানতে চাইলে একমাত্র উপার্জনক্ষম বড় ছেলে জাহাঙ্গীর সিরাজ বলেন, ‘আত্মীয়-স্বজন, বন্ধু-বান্ধবদের কাছ থেকে ধারদেনা করে এ পর্যন্ত চিকিৎসা চলছে। এখন সেই জায়গাগুলোও সংকুচিত হয়ে আসছে। এরপর কী যে হবে আমি ভাবতে পারছি না।’
রাজশাহী থেকে সিরাজুল হকের ভক্তরা প্রায় ৫০ হাজারের মতো টাকা পাঠিয়েছেন। সরকার কিংবা রাষ্ট্রীয় কোনো সংগঠন থেকে তাঁরা কোনো সহযোগিতা পাননি। তবে সরকারের কাছ থেকে সাহায্যের জন্য প্রধানমন্ত্রী বরাবর একটি চিঠি দিয়েছেন বলে জানান জাহাঙ্গীর সিরাজ।
জাহাঙ্গীর সিরাজ বলেন, ‘ভাবতে অবাক লাগে, বাংলা একাডেমি থেকে বাবাকে কেউ দেখতে আসেননি! প্রথমে তারা খোঁজখবর নিলেও এখন তাও নেয় না। অথচ যে বাংলা একাডেমির সঙ্গে বাবার এত সম্পর্ক! সাহিত্য চর্চা করতে গিয়ে ঠিকমতো ঘর-সংসারের দিকে ফিরে তাকাননি। অথচ তাঁর সার্কেলের কেউ কোনো খোঁজখবর পর্যন্ত রাখছেন না।’
খোন্দকার সিরাজুল হকের কুমারপাড়ার বাসায় গিয়ে স্পষ্ট হয়ে ওঠে বাড়ির সবার অসহায়ত্ব। কারো মুখে যেন কোনো হাসি নেই। বিষণ্ণ মনেই বাবার বাড়িতে ঘুরতে আসা সিরাজুল হকের একমাত্র মেয়ে সাদিয়া খোন্দকার বলেন, ‘আমরা কিছুই বুঝতে পারছি না। বাবাকে কে দেখবে, টাকা কোথা থেকে আসবে?’
সাদিয়া খোন্দকারের কথা শেষ হতে না হতেই সিরাজুল হকের বোন সুলতানা রাজিয়া বলে ওঠেন, ‘সরকার যদি আমাদের সাহায্য করত, তাহলে বড় উপকার হতো।’
বাংলা বিভাগের সভাপতি ড. অমৃতলাল বালা বলেন, ‘খোন্দকার সিরাজুল হক দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ মানুষ। গবেষক, লেখক হিসেবে সারা দেশে তাঁর খ্যাতি রয়েছে। তাঁকে রাষ্ট্রের অবশ্যই সাহায্য করা উচিত। প্রধানমন্ত্রীর স্বামীর সঙ্গে সিরাজুল স্যার একই স্কুলে পড়াশোনা করেছেন। প্রধানমন্ত্রী তো দেখি কতজনকেই চিকিৎসার জন্য সাহায্য-সহযোগিতার করেন। আমাদের বিশ্বাস সিরাজুল হক স্যারের চিকিৎসার জন্যও তিনি সাহায্য করবেন।’
পারিবারিক সূত্রে জানা যায়, ১৯৪১ সালের ১ মার্চ জন্মগ্রহণ করেন অধ্যাপক ড. খোন্দকার সিরাজুল হক। ছাত্রজীবনে বরাবরই রেখে চলেছেন কৃতিত্বের স্বাক্ষর। ১৯৫৬ সালে প্রবেশিকা পরীক্ষায় বিজ্ঞান বিভাগ থেকে পূর্ব পাকিস্তানের মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ডে (ওই সময়ের একমাত্র শিক্ষা বোর্ড) প্রথম স্থান অধিকার করেন। এর ফলে কলম্বো পরিকল্পনার অধীনে বিনা খরচে ইংল্যান্ডে পড়াশোনার সুযোগ হয় তাঁর। কিন্তু সিরাজুল হক তা গ্রহণ করেননি। ১৯৬০ সালে উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষায় প্রথম শ্রেণিতে উত্তীর্ণ হলেও বোর্ডে অবস্থান না থাকায় তিনি বিজ্ঞান নিয়ে পড়াশোনা ছেড়ে দেন। ভর্তি হন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগে। এই বিভাগ থেকে তিনি প্রথম শ্রেণিতে উত্তীর্ণ হন, যা সে সময় খুব স্বল্পসংখ্যক শিক্ষার্থীর ভাগ্যেই জুটত।
সিরাজুল হক কর্মজীবন শুরু করেন ১৯৬৫ সালে মাইকেল মধুসূদন কলেজে অধ্যাপনার মধ্য দিয়ে। পরের বছর অর্থাৎ ১৯৬৬ সালে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগে শিক্ষক হিসেবে যোগ দেন। ২০০৬ সালে তিনি অবসর গ্রহণ করেন।
লেখক হিসেবেও সিরাজুল হকের রয়েছে বেশ সুনাম। তিনি একে একে রচনা করেছেন ‘মো. এয়াকুব আলী চৌধুরী’ (জীবনীগ্রন্থ, ১৯৭০), ‘কাজী আব্দুল ওদুদ (জীবনীগ্রন্থ, ১৯৮৭), ‘ডাক্তার লুৎফর রহমান’ (জীবনীগ্রন্থ, ১৯৯৬), কাজী আব্দুল ওদুদ রচনাবলী (৪র্থ, ৫ম ও ৬ষ্ঠ খণ্ড), ‘দীনবন্ধু মিত্রের নীলদর্পণ (সম্পাদনা গ্রন্থ, ১৯৭৫) এবং পত্রপত্রিকায় অসংখ্য প্রবন্ধ ও গবেষণামূলক নিবন্ধ প্রকাশিত হয়েছে।
গবেষক হিসেবেও রয়েছে তাঁর বেশ খ্যাতি। খোন্দকার সিরাজুল হক ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের খ্যাতিমান অধ্যাপক মোহাম্মদ মনিরুজ্জামানের অধীনে পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেন। পরে ১৯৮৪ সালে বাংলা একাডেমি থেকে ‘মুসলিম সাহিত্য সমাজ, সমাজ চিত্র ও সাহিত্যকর্ম’ নামে গ্রন্থাকারে তা প্রকাশিত হয়। এ গ্রন্থের মুখবন্ধ লিখেছেন অধ্যাপক আনিসুজ্জামান।

রাবি সংবাদদাতা