দারিদ্র্যকে জয় করে এসএসসিতে জিপিএ-৫, অর্থাভাবে থমকে তিন মেধাবীর স্বপ্ন
দারিদ্র্য, পিতৃহীনতা কিংবা মাইলের পর মাইল দুর্গম পথ হেঁটে যাওয়ার কোনো প্রতিকূলতাই দমাতে পারেনি তাদের। চরম অনটন ও সীমাহীন কষ্টকে পেছনে ফেলে এবারের এসএসসি পরীক্ষায় অদম্য মেধার স্বাক্ষর রেখেছে যশোরের কেশবপুর ও মনিরামপুরের তিন শিক্ষার্থী- অভিজিৎ রায়, তানিয়া নাসরিন ও সুমি খাতুন। যশোর শিক্ষা বোর্ডের অধীনে বিজ্ঞান বিভাগ থেকে জিপিএ-৫ পেলেও অর্থাভাবে তাদের উচ্চশিক্ষা ও চিকিৎসক হওয়ার স্বপ্ন এখন অনিশ্চয়তার মুখে।
কেশবপুরের গড়ভাঙ্গা মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী অভিজিৎ রায় অর্জন করেছে গোল্ডেন জিপিএ-৫। সপ্তম শ্রেণিতে পড়ার সময় ক্যানসারে আক্রান্ত হয়ে তার বাবা অশোক রায় মারা যান। এরপর মা স্বপ্না রায় নানা কষ্টের মধ্যেও ছেলের পড়াশোনা চালিয়ে যান। অভিজিৎ জানায়, তার বাবার স্বপ্ন ছিল তাকে চিকিৎসক বানানোর। শিক্ষকদের সহযোগিতায় এতদূর আসতে পেরেছে সে। এখন পড়াশোনা চালিয়ে যেতে সহায়তা প্রয়োজন।
অভিজিতের মা স্বপ্না রায় বলেন, অভাবের সংসারে কখনও অনাহারে, কখনও অর্ধাহারে থেকেও ছেলে পড়াশোনা থেকে পিছপা হয়নি। কিন্তু এখন তাকে ভালো কলেজে পড়ানোর মতো সামর্থ্য আমার নেই। তার বাবার স্বপ্ন পূরণ করতে মানুষের সহযোগিতা প্রয়োজন।
কেশবপুরের গড়ভাঙ্গা মাধ্যমিক বালিকা বিদ্যালয় থেকে বিজ্ঞান বিভাগে জিপিএ-৫ পেয়েছে ভ্যানচালক আবুল হোসেনের মেয়ে তানিয়া নাসরিন। প্রায় ছয় মাস জলাবদ্ধ থাকা ব্যাসডাঙ্গা গ্রাম থেকে বর্ষাকালে পানি ডিঙিয়ে তিন কিলোমিটার হেঁটে স্কুলে যেত সে। অভাবের সংসারে ঠিকমতো খাবার না পেলেও পড়াশোনা চালিয়ে গেছে তানিয়া। তার স্বপ্ন চিকিৎসক হওয়া। তবে বাবার পক্ষে ভালো কলেজে পড়ানোর সামর্থ্য নেই।
তানিয়ার মা ফরিদা বেগম বলেন, মেয়েটার মুখে ঠিকমতো খাবার দিতে পারিনি। তারপরও পড়াশোনা চালিয়ে গেছে। একটি দিনের জন্যও স্কুলে যাওয়া বন্ধ করেনি। এখন কীভাবে মেয়েকে পড়াব, তা জানি না।
গড়ভাঙ্গা মাধ্যমিক বালিকা বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক সুপ্রভাত কুমার বসু বলেন, তানিয়া আমাদের প্রতিষ্ঠানের গর্ব। স্কুল থেকে সাধ্যমতো তাকে সহায়তা দেওয়া হয়েছে। কিন্তু তার পরিবার আর্থিকভাবে অসচ্ছল। এ কারণে আমরাও তার উচ্চশিক্ষা নিয়ে চিন্তিত। সমাজের দানশীল ও বিত্তবানরা এগিয়ে এলে এই অদম্য মেধাবী একদিন ডাক্তার হয়ে মানুষের স্বাস্থ্য সেবায় এগিয়ে আসতে পারবে।
মনিরামপুর উপজেলার বাঙালিপুর গ্রামের দিনমজুর আব্দুস সাত্তারের মেয়ে সুমি খাতুনও বিজ্ঞান বিভাগ থেকে জিপিএ-৫ পেয়েছে। যাতায়াতের সাইকেল বা ভাড়ার টাকা না থাকায় প্রতিদিন ১০ কিলোমিটার যাওয়া ও ১০ কিলোমিটার আসা- মোট ২০ কিলোমিটার পথ পায়ে হেঁটে স্কুলে যেত সে। নানা প্রতিকূলতার মধ্যেও পড়াশোনা ছাড়েনি সুমি। এখন কলেজে ভর্তি ও পড়াশোনার খরচ কীভাবে চলবে, তা নিয়ে দুশ্চিন্তায় তার পরিবার।
কেশবপুর উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা শেখ ফিরোজ আহমেদ বলেন, চরম অনটন ও পিতৃহীনতার মতো কঠিন বাস্তবতা পেছনে ফেলে অভিজিৎ ও তানিয়ার সাফল্য অদম্য মেধার প্রমাণ। অর্থের অভাবে কোনো মেধাবী শিক্ষার্থীর পড়াশোনা যেন থেমে না যায়, সে বিষয়ে তারা সচেতন। সরকারি উপবৃত্তি ও প্রাতিষ্ঠানিক সহায়তার ব্যবস্থা করা হবে। পাশাপাশি সমাজের বিত্তবানদেরও তাদের পাশে দাঁড়ানোর আহ্বান জানান তিনি।
কেশবপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ভারপ্রাপ্ত) কাজী মো. মেশকাতুল ইসলাম বলেন, প্রতিকূলতা জয় করা এসব অদম্য মেধাবী শিক্ষার্থীকে আন্তরিক শুভকামনা জানাই। অর্থাভাবে তাদের মেধার প্রদীপ নিভে যেতে দেওয়া হবে না। উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে অভিজিৎ, তানিয়াসহ অসচ্ছল শিক্ষার্থীদের উচ্চমাধ্যমিকে ভর্তি ও পড়াশোনা চালিয়ে নিতে প্রয়োজনীয় আর্থিক ও আনুষঙ্গিক সহায়তা দেওয়া হবে। পাশাপাশি সমাজের দানশীল ব্যক্তিরাও তাদের চিকিৎসক হওয়ার স্বপ্ন পূরণে এগিয়ে আসবেন বলে আশা করছি।

ইনামুল হাসান, যশোর (মনিরামপুর-কেশবপুর)