অটোরিকশার স্টিয়ারিং ধরে এক লাখ গাছ লাগানোর মিশনে শান্ত
সকালে ঘুম থেকে উঠেই অটোরিকশা নিয়ে রাস্তায় বের হন ২৬ বছর বয়সী নাজমুল হাসান শান্ত। দিনভর যাত্রী পরিবহণ করে যে আয় হয়, তা দিয়েই যশোর শহরের নাজির শংকরপুর এলাকায় ভাড়া বাসায় চলে স্ত্রী, সন্তান ও বয়োবৃদ্ধ মা-বাবার সংসার। অভাবের ঘানি টানা এই সাধারণ জীবনের পেছনেই লুকিয়ে রয়েছে এক অসাধারণ উদ্যোগ। নিজের আয়ের একাংশ জমিয়ে গত দুই বছরে তিনি যশোরের বিভিন্ন স্থানে রোপণ করেছেন প্রায় দেড় হাজার বৃক্ষ। তার লক্ষ্য এক লাখ বৃক্ষ রোপণ করে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি সবুজ বাংলাদেশ রেখে যাওয়া।
কেশবপুর উপজেলার রামচন্দ্রপুর গ্রামের বাসিন্দা শান্তর পড়াশোনা বন্ধ হয়েছিল অভাবের কারণে। পরিবারের দায়িত্ব কাঁধে নিয়ে নামেন অটোরিকশা চালানোর কাজে। তবে জীবিকার তাগিদের মধ্যেও পরিবেশের ভারসাম্যহীনতা, তীব্র দাবদাহ ও নির্বিচারে গাছ কাটা তাকে গভীরভাবে ব্যথিত করে। ২০২৪ সালে কোনো সরকারি বা বেসরকারি সাহায্য ছাড়াই সম্পূর্ণ নিজ অর্থায়নে তিনি শুরু করেন বৃক্ষরোপণ।
শান্তর অটোরিকশার পেছনে সবসময়ই শোভা পায় নানা প্রজাতির গাছের চারা, আর ভেতরে থাকে কোদাল ও শাবল (লোহার দণ্ড)। অটোরিকশা চালানোর ফাঁকে রাস্তার পাশে খালি জায়গা চোখে পড়লেই নেমে পড়েন গাছ লাগাতে। শুধু চারা রোপণ করেই তার দায়িত্ব শেষ হয় না; সুযোগ পেলেই আগের লাগানো গাছগুলোর পরিচর্যা করেন এবং মরে যাওয়া গাছের জায়গায় নতুন চারা রোপণ করেন।
শান্ত তার এই ভালোবাসা সারা দেশে ছড়িয়ে দিতে চালু করেছেন ‘Bd Tree Man’ নামের একটি ফেসবুক পেজ, যেখানে বর্তমানে ফলোয়ার সংখ্যা পাঁচ লক্ষাধিক। নিয়মিত গাছ লাগানো ও পরিচর্যার ভিডিও দেখে ইতোমধ্যে দেশের বিভিন্ন প্রান্তের অন্তত ৫০ কনটেন্ট ক্রিয়েটর উদ্বুদ্ধ হয়ে বৃক্ষরোপণ শুরু করেছেন। অনেক শুভানুধ্যায়ী তার উদ্যোগে সাড়াও দিচ্ছেন।
শান্ত বলেন, ‘আজ একটি গাছ লাগানো মানে আগামী প্রজন্মের জন্য নিরাপদ নিঃশ্বাস নিশ্চিত করা। অটোরিকশার আয় দিয়ে সংসার চালিয়ে চারা কেনা কঠিন, তবু এটাকে আমি খরচ নয়, ভবিষ্যতের বিনিয়োগ মনে করি।‘’
বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তন ও তাপমাত্রা বৃদ্ধির এই সময়ে একজন সাধারণ অটোরিকশা চালকের এমন দায়িত্ববোধ দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। স্থানীয়দের মতে, যেখানে সীমিত আয়ের একজন মানুষ নিজের সাধ্যমতো পরিবেশ রক্ষায় লড়ছেন, সেখানে বিত্তবান ও করপোরেট খাতের ভূমিকা আরও বড় হওয়া উচিত।
নাজমুল হাসান শান্ত প্রমাণ করেছেন পৃথিবী বদলাতে বড় অঙ্কের অর্থের চেয়ে বড় একটি মনের প্রয়োজন বেশি। অটোরিকশার স্টিয়ারিং হাতে তিনি শুধু যাত্রীই বহন করছেন না, বয়ে চলেছেন আগামীর এক সবুজের স্বপ্ন।

ইনামুল হাসান, যশোর (মনিরামপুর-কেশবপুর)