ফুটপাতে নতুন নোটের রমরমা ব্যবসা
ঈদকে সামনে রেখে দেশজুড়ে নতুন নোটের চাহিদা দিনদিন বেড়েই চলছে। নতুন টাকার গন্ধে যেন অন্যরকম ভালোবাসা লুকিয়ে থাকে। ঈদের সকালে সব বয়সীদের হাতে যখন নতুন নোট তুলে দেওয়া হয়, তখন তাদের চোখের আনন্দটাই হয়ে ওঠে সবচেয়ে বড় উপহার।
ঈদ মানেই ভালোবাসা, ভাগাভাগি ও খুশির ছোঁয়া—আর সেই খুশির ছোট্ট একটা অংশ জুড়ে থাকে এই কচকচে নোটের হাসিতে। যদিও নতুন নোট বাংলাদেশ ব্যাংক বাজারে সরবরাহ না করায় এবার ঈদকে সামনে রেখে সারাদেশে তৈরি হয়েছে এক অন্যরকম পরিস্থিতি। বাজারে নতুন নোটের চাহিদা থাকলেও ব্যাংকে মিলছে না নতুন নোট। অথচ বাংলাদেশ ব্যাংকের সামনে ঈদের এই খুশির আবেগকে পুঁজি করে একটি চক্র দাপটের সঙ্গে খোলাবাজারে নতুন নোটের রমরমা ব্যবসা গড়ে তুলেছে। সেখানে চড়া দামে বেচা হচ্ছে কচকচে নোট। আইনকে পাশ কাটিয়ে প্রকাশ্যে বেচাকেনা করছে নতুন নোট। কীভাবে, কাদের মাধ্যমে এই নোট খোলাবাজারে এলো—এমন প্রশ্ন গ্রাহকদের।
কীভাবে কচকচে নোট এখানে আসছে, কারা বিক্রি করছেন এসব প্রসঙ্গে মতিঝিলে একাধিক টাকা ব্যবসায়ী বলেন, স্যাররা আমাদের দিয়ে যায়, কমিশনে বিক্রি করি। এছাড়া বিভিন্ন মাধ্যমে অতিরিক্ত দাম দিয়ে নতুন নোট সংগ্রহ করছি। সামনে টাকা আরও বেশি দামে কিনতে হবে জানিয়ে তারা বলেন, বাজারের নতুন নোটের চাহিদা অনেক। আনামাত্র বিক্রি হয়ে যাচ্ছে। চাহিদা বাড়লে সামনে ১০, ২০ ও ৫০ টাকার নোট আরও বেশি দামে কিনতে হবে ক্রেতাকে।
দেখা গেছে, বড় নোটের চেয়ে ছোট নোট পেতে গুনতে হচ্ছে বেশি দাম। যেমন- পাঁচ টাকার একটি নতুন নোট পেতে গ্রাহকে গুনতে হচ্ছে সাত টাকা। ১০ টাকার একটি নতুন নোট পেতে গ্রাহকে গুনতে হচ্ছে ১৪ টাকা। ২০ টাকার একটি নতুন নোট পেতে গ্রাহকে গুনতে হচ্ছে ২৫ টাকা। অবশ্য মতিঝিলে থেকে গুলিস্তানে নতুন নোট পেতে গ্রাহককে একটু বেশি দাম গুনতে হচ্ছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, প্রতিবছরে ঈদে কেন্দ্রীয় ব্যাংক নতুন নোট বিনিময় করে গ্রাহকদের মাঝে। অবশ্য গত ঈদে দেশের সব বাণিজ্যিক ব্যাংকের মাধ্যমে নতুন নোট বিনিময় করা হয়েছিল। এবারের ঈদুল ফিতর উপলক্ষে বাজারে নতুন নোট ছাড়ার প্রচলিত সিদ্ধান্ত থেকে সরে এসেছে। ফলে গ্রাহকরা ব্যাংক থেকে নতুন নোট সংগ্রহ করতে পারছেন না। এতে নতুন নোট প্রত্যাশি গ্রাহক নিরাশ হয়েই ব্যাংক ছেড়েছেন।
সরেজমিনে দেখা যায়, মতিঝিলে বাংলাদেশ ব্যাংকের সামনে দাপটের সঙ্গে খোলাবাজারে বেচাকেনা হচ্ছে নতুন নোট। সেখানে পাঁচ টাকার নতুন নোটের একটি বান্ডিল (এক বান্ডিলে ১০০টি নোট থাকে) ক্রেতাকে গুনতে হচ্ছে ৬৫০ টাকা থেকে ৭০০ টাকা। ১০ টাকার নতুন নোটের একটি বান্ডিল বেচা হচ্ছে এক হাজার ৩৫০ টাকা থেকে এক হাজার ৪০০ টাকা। ২০ টাকার নতুন নোটের একটি বান্ডিল বেচা হচ্ছে দুই হাজার ৪০০ থেকে দুই হাজার ৫০০ টাকা। ৫০ টাকার নতুন ১০০টি নোট পেতে ক্রেতাকে গুনতে হচ্ছে পাঁচ হাজার ৫০০ টাকা। ১০০ টাকার নতুন ১০০টি নোট পেতে ক্রেতাকে গুনতে হচ্ছে ১০ হাজার ৬০০ টাকা থেকে ১০ হাজার ৮০০ টাকা। তবে বড় নোটের চাহিদা বাজারে কম থাকায় ২০০, ৫০০ ও এক হাজার টাকার নতুন নোটের বান্ডিল প্রতি অতিরিক্ত গুনতে হচ্ছে ৭০০ টাকা থেকে দেড় হাজার টাকা।
টাকার বেশি দামে কেনাবেচা আইন অনুযায়ী দণ্ডনীয় অপরাধ। আমাদের দেশে টাকা ইস্যু করে বাংলাদেশ ব্যাংক। এই টাকা বাজারে নির্ধারিত মূল্যে ছাড়ার জন্য বিভিন্ন বাণিজ্যিক ব্যাংকে সরবরাহ করে। ব্যাংক থেকে নির্ধারিত মূল্যের বেশি দামে টাকা বেচাকেনা আইনগতভাবে নিষিদ্ধ। বাংলাদেশের মুদ্রা আইন এবং বাংলাদেশ ব্যাংক কর্তৃক প্রদত্ত নিয়মাবলীর আওতায় টাকা সংগ্রহের ক্ষেত্রে যেকোনো অনৈতিক বা অবৈধ লেনদেন শাস্তিযোগ্য অপরাধ হিসেবে গণ্য হয়। এই অপরাধের জন্য অর্থদণ্ড বা কারাদণ্ড হতে পার। খোলাবাজারে টাকা বেচাকেনা প্রসঙ্গে বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান বলেন, টাকার বেশি দামে কেনাবেচা আইন অনুযায়ী দণ্ডনীয় অপরাধ।
সোনালী, অগ্রণীসহ সাত বাণিজ্যিক ব্যাংকের কর্মকর্তারা বলেন, প্রায় সব ব্যাংক ৫০০ ও ১০০০ টাকার নোট লেনদেন করে থাকে। হিসেবের সুবিধায় ২০০, ১০০, ৫০, ২০, ১০ ও পাঁচ টাকার নোট লেনদেন থেকে বিরত থাকে। তবে ঈদের জন্য গ্রাহকদের চাহিদা মেটাতে অনেক কিছুই করতে হয় আমাদের। এটাও সত্যি যে, এবারে ঈদকে কেন্দ্র করে কেন্দ্রীয় ব্যাংক নতুন নোট দেয়নি। এরপরও আমাদের কাছে যেসব নতুন নোট ছিল তা আমরা গ্রাহকদের দিয়েছি। তবে সেটা ছিল চাহিদার তুলনায় খুবই কম।
মতিঝিল থেকে ১০ হাজার টাকা দিয়ে তিনটি বাল্ডিলের নতুন নোট কিনলেন বেসরকারি চাকুরীজীবি নাইম আলম। তিনি বলেন, আমি সোনালী ব্যাংকের গ্রাহক। গতকাল সোমবার বেলা ১২টায় গিয়েছি কিন্তু ব্যাংকে নতুন নোট নেই। ব্যাংক কর্মকর্তা বলেন, নতুন নোট নেই। কেন্দ্রীয় ব্যাংক এবারে নতুন নোট দেয়নি। ব্যাংকে না পেয়ে এসেছি। এখানে এসে দেখি, বাংলাদেশ ব্যাংকের সামনের খোলাবাজারে নতুন নোটের জমজমাট ব্যবসা। নতুন নোট পেলে সবাই খুশি জানিয়ে তিনি বলেন, সেই চিন্তা করেই অতিরিক্ত দামে দিয়ে নতুন নোট কেনা। এক হাজার ১০০ টাকা বেশি দিয়ে ১০ টাকার নোটের তিনটি বান্ডিল কিনতে হয়েছে। ২০ টাকার নোটের দুইটি বান্ডিল কিনতে হয়েছে ৮০০ টাকা বেশি দিয়ে। এতো দাম দিয়ে নতুন নোট কিনবো, এমন দিন আসবে চিন্তা করিনি।
কথা হয় নতুন নোট কিনতে আসা আরেফিন আম্বারের সঙ্গে। তিনি অগ্রণী ব্যাংকের গ্রাহক। ব্যাংকে নতুন নোট না পেয়ে আক্ষেপ নিয়ে তিনি বলেন, শিশুদের ঈদ আনন্দ কয়েকগুণ বাড়িয়ে কচকচে নোট। সেই জন্য নতুন নোট কিনতে মতিঝিলে আসা। এখানে এসে দেখছি নতুন নোটের দাম খুবই অতিরিক্ত। এতো বেশি দাম চাচ্ছে, কিনতে সাহস মিলছে না। কিন্তু কিনতে হবে, কারণ বাচ্চারা নতুন টাকার নোট পেলে খুশি হয়। প্রায় আধ ঘণ্টা ঘুরছি। নোটের বান্ডিল ভেঙ্গে টাকা বিক্রি করছে না। কিনতে হলে পুরো বান্ডিল নিতে হচ্ছে।
টাকা কিনতে আসা আরেক ক্রেতা জসিম উদ্দিনের সঙ্গে কথা হয় মতিঝিলে। তিনি বলেন, গুলিস্তান ঘুরে এসেছি। অতিরিক্ত দাম। টাকার গায়ে যেন আগুন লেগেছে। এক হাজার টাকা বেশি দিয়ে ৫০ টাকার নোটের দুইটি বান্ডিল কিনতে হয়েছে। ২০ টাকার নতুন নোটের একটি বান্ডিল কিনতে হয়েছে ৪০০ টাকা টাকা বেশি দিয়ে।
এতো দামে কেন নতুন নোট বিক্রি করছেন এমন প্রশ্নে মতিঝিলের ও গুলিস্তানের একাধিক টাকা ব্যবসায়ী বলেন, বাজারের নতুন নোটের কদর অনেক বেশি। এজন্য দামও বেশি। বিভিন্ন হাত হয়ে ব্যাংক থেকে তাদের কাছে নতুন টাকার নোট আসে জানিয়ে তারা বলেন, অনেক বেশি অর্থ দিয়ে স্যারদের কাছ থেকে নতুন নোট কিনতে হয়েছে। ঈদের কারনে প্রতি বান্ডিলে বেশি অর্থ গুনতে হয়েছে। চাহিদা বেশি থাকায় ছোট বান্ডিলের বেশি দাম গুনতে হয়েছে। নোটের বাজার ভাল তাই সামান্য লাভেই প্রতি বান্ডিলে বেচাকেনা হচ্ছে।

মোহাম্মদ আনিসুজ্জামান