ডাকসুতে ৯টা ক্যামেরা, একদল মারছে আরেকদল ফুটেজ নিছে
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (ডাকসু) ভিপির ওপর হামলার প্রতিবাদে মানববন্ধন করেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিএনপি-জামায়াত সমর্থিত সাদা দলের শিক্ষকরা। আজ মঙ্গলবার দুপুর সাড়ে ১২টায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কলা ভবনের সামনে অপরাজেয় বাংলার পাদদেশে মানবন্ধন করেন তাঁরা।
সাদা দলের আহ্বায়ক অধ্যাপক ড. ওবায়দুল ইসলাম বলেন, ‘ডাকসুর নির্বাচিত ভিপির ওপর হামলা মানে গোটা জাতির ওপর হামলা, পুরো ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ওপর হামলা।’
এ হামলার নিন্দা জানিয়ে দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি করে অধ্যাপক ড. ওবায়দুল ইসলাম বলেন, ‘ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ঐতিহ্যকে নষ্ট করেছে এই মুক্তিযুদ্ধ মঞ্চ। এই হামলার পর আমরা শিক্ষক হিসেবে লজ্জিত। শুধু এই ঘটনা নয়, আজ ঢাবির বিভিন্ন হলেও সন্ত্রাসী হামলা চলে। মতের ভিন্নতা হলেই মার দেওয়া হয়। ভিপি তাদের মতের সমর্থন করে না বলে তাঁকে মারা হয়েছে।’
ঢাবির এই শিক্ষক আরো বলেন, ‘কয়েকদিন আগে আবরার ফাহাদকে টানা পাঁচ ঘণ্টা নির্যাতনের মাধ্যমে মেরে ফেলা হয়েছে। এদের বিচার না হলে অন্যায় করার সুযোগ বেড়ে যায়।’
‘বিশ্ববিদ্যালয়গুলো সন্ত্রাসীদের অভয়ারণ্যে পরিণত হয়েছে’ উল্লেখ করে দ্রুত অপরাধীদের বিচারের আওতায় আনার এবং নুরসহ সবার চিকিৎসার খরচ বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনকে বহন করার দাবি জানান অধ্যাপক ড. ওবায়দুল ইসলাম।
রোকেয়া হলের সাবেক প্রাধ্যক্ষ অধ্যাপক ড. লায়লা নূর ইসলাম সন্ত্রাসীদের চিহ্নিত করে বিচারের আওতায় আনার দাবি জানিয়ে বলেন, ‘ডাকসু সমগ্র জাতির গৌরবের জায়গা। সে জায়গায় সন্ত্রাসী হামলা মেনে নেওয়া যায় না। ঢাবির ওপর আঘাত এলে জাতির ওপর আসে। এটা মুক্তবুদ্ধি চর্চার জায়গা। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের সতর্কতামূলক ব্যবস্থা নেওয়া উচিত ছিল। কিন্তু প্রশাসন ব্যর্থ হয়েছে।’
সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের নৃবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক রাশেদ মাহমুদ বলেন, ‘আমি প্রতিবাদ জানাচ্ছি না এই বিচারহীনতার দেশে। আমাদের কণ্ঠস্বর কেড়ে নেওয়া হয়েছে। একটার পর একটা ঘটনা ঘটিয়ে পূর্ব ঘটনা মুছে দেওয়ার চেষ্টা করছে ক্ষমতাসীন দল। ওয়াদা করতেছি, অদূর ভবিষ্যতে যে দলই ক্ষমতায় আসুক না কেন, দল-মত না দেখে আমরা প্রতিবাদ করব।’
বিজনেস স্টাডিজের অ্যাকাউন্টটিং অ্যান্ড ইনফরমেশন বিভাগের অধ্যাপক আলাউদ্দিন সব শিক্ষকের অনুপস্থিতিতে অসন্তোষ প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, ‘আজকে সাদা দল কেন? সব শিক্ষকের দাঁড়ানোর কথা ছিল। পর পর নয়বার আক্রমণ হওয়ার পরও আমরা শিক্ষকরা নিরাপত্তা দিতে পারিনি। এই হামলাযজ্ঞে প্রশাসনের সংশ্লিষ্টতা রয়েছে। তাদেরও বিচারের আওতায় আনতে হবে।’
শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের শিক্ষক অধ্যাপক আলাউদ্দিন হোসেন সম্রাট বলেন, ‘নয়টা ক্যামেরা ছিল ডাকসু ভবনে। একদল নুরদের মারে, আরেকদল নিয়ে যায় সিসিটিভির হার্ডডিস্ক। মুক্তিযুদ্ধ মঞ্চ দিনের পর দিন এ রকম ঘটনা ঘটিয়েছে। তবুও তাদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। ডাকসুতে হামলা হবে, আমরা ঘরে বসে থাকব তা হবে না।’
সাদা দলের আহ্বায়ক অধ্যাপক ড. এ বি এম ওবায়দুল ইসলামের সভাপতিত্বে অর্ধশতাধিক শিক্ষক এতে অংশ নেন। মানববন্ধনে অন্যদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন সাদা দলের যুগ্ম আহ্বায়ক অধ্যাপক ড. মো. লুৎফর রহমান, ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড টেকনোলজি অনুষদের ডিন অধ্যাপক ড. মো. হাসানুজ্জামান, তরুণ উদ্ভিদবিজ্ঞানী অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আলমোজাদ্দেদী আলফেছানী, অধ্যাপক ড. মো. আবদুর রশীদ, অধ্যাপক মো. শহীদুল ইসলাম, অ্যাকাউন্টিং অ্যান্ড ইনফরমেশন সিস্টেমস বিভাগের শিক্ষক মো. আল আমিন প্রমুখ।
গত রোববার দুপুরে লাইট বন্ধ করে রড, লাঠিসোটা নিয়ে ডাকসু ভবনের ভিতরে ছাত্রলীগ ও মুক্তিযুদ্ধ মঞ্চের নেতাকর্মীরা এই হামলা চালায়। এতে ভিপি নুরসহ তাঁর সংগঠন সাধারণ ছাত্র অধিকার সংরক্ষণ পরিষদের অন্তত ২০ জনের মতো আহত হন। তাদের মধ্যে বেশ কয়েকজন গুরুতর অবস্থায় ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন আছেন।
প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্যমতে, মুক্তিযুদ্ধ মঞ্চের কেন্দ্রীয় কমিটির সভাপতি আমিনুল ইসলাম বুলবুল ও সাধারণ সম্পাদক আল মামুনের নেতৃত্বে প্রায় ২০ থেকে ২৫ জন এবং ছাত্রলীগের ঢাবি শাখার সভাপতি সনজিত চন্দ্র দাস ও সাধারণ সম্পাদক সাদ্দাম হোসাইনের সমর্থক শতাধিক নেতাকর্মী রড, লাঠিসহ দেশীয় অস্ত্র নিয়ে দুপুরে এই হামলা চালায়।
এই ঘটনায় মুক্তিযুদ্ধ মঞ্চে আট নেতার নাম উল্লেখ পুলিশ বাদী হয়ে একটি মামলা করেছে। এরই মধ্যে পুলিশ এ ঘটনায় মুক্তিযুদ্ধ মঞ্চের কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক আল মামুন, দপ্তর সম্পাদক মেহেদি হাসান শান্ত ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখা মুক্তিযুদ্ধ মঞ্চের সাধারণ সম্পাদক ইয়াছির আরাফাত তূর্যকে সেই মামলায় গ্রেপ্তার দেখিয়ে তিন দিনের রিমান্ডে পেয়েছে পুলিশ।

বিশ্ববিদ্যালয় সংবাদদাতা