‘ভর্তা দিয়ে মন মাতিয়ে দেব’
‘এই যে মামা এই দিকে, ভর্তা আছে, হরেক পদের ভর্তা, ভর্তা দিয়ে মন মাতিয়ে দেব, এরকম ভর্তা আর কোথাও পাবেন না, চলে আসুন’ দুপুর হতে না হতেই এমন হাঁকডাকে সরব হয়ে উঠে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের (জাবি) বটতলা। হরেক রকম ভর্তার পসরা সাজিয়ে বসে দোকানিরা।
‘ভর্তা’ শুনলে জিভে জল আসবেই। কত পদের যে ভর্তা আর সঙ্গে সুস্বাদু খাবার। কত যে বাহারি নাম! সেই স্বাদ নিতে নানা জায়গা থেকে ভোজনপ্রেমীরা ভিড় জমান দেশের একমাত্র এই আবাসিক বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে।
এই বটতলার নামকরণ কবে বা কীভাবে হয়েছে তা জানা না গেলেও লোকমুখে শোনা যায়, আগে এখানে বড় বট গাছ ছিল। সেখান থেকেই এই বটতলার নামকরণ। প্রথমে চা-নাস্তার জন্য দুই-তিনটি দোকান থাকলেও বর্তমানে প্রায় অর্ধশত খাবার হোটেল আছে এখানে। ডাইনিং ও ক্যান্টিনের সঙ্গে খাবারের জন্য শিক্ষার্থীদের পছন্দের তালিকায় এই বটতলা। এখানের স্বল্পমূল্যের খাবার জাবিকে অন্যান্য পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের থেকে ব্যতিক্রম পরিচয় দিয়েছে।
ছুটির দিনগুলোতে ক্যাম্পাসের বটতলা মুখরিত থাকে ভোজনপ্রেমী দর্শনার্থীদের ভিড়ে। সবার আকর্ষণ বাহারি রকমের ভর্তার দিকে। জানা-অজানা এসব বাহারি ভর্তার সাজে দোকানগুলো তখন প্রস্তুত। বেলা ১১টা থেকে জমে উঠা ভর্তার বাজার চলে বিকেল ৫টা পর্যন্ত।
নানা ধরনের ভর্তার মধ্যে রয়েছে চ্যাপা শুঁটকি, লইট্টা শুঁটকি, মলা শুঁটকি, কাচকি শুঁটকি, চিংড়ি শুঁটকি, টাকি শুঁটকি, বাইন মাছ শুঁটকি, রসুন-শুঁটকি, লোনা ইলিশ, বাটা মাছ, টাকি মাছ, চিতল মাছ, ইলিশ মাছ, রুই মাছ, বোয়াল মাছ, বাইলা মাছ, বেলে মাছ, চিকেন, দেশি চিকেন, কালোজিরা, ধনিয়া, রসুন, পটল, বেগুন, টমেটো, মরিচ, বাদাম, আলু, মরিচ-পেঁয়াজ, ডিম-আলু, শাক, ডিম, বরবটি, শিম ও কলা ভর্তা। মাছ ও মুরগি ভর্তা ১০ টাকা। বাকী সব ভর্তাই ৫ টাকা। ভাত প্রতি প্লেট মাত্র ছয় টাকা।
ভর্তার পাশাপাশি রয়েছে মুখরোচক সব খাবারের আয়োজন। মাংসের মধ্যে রয়েছে লটপটি (৩০ টাকা), মুরগির ঝাল ফ্রাই/মুরগি রান্না ব্রয়লার (৪০ টাকা), মুরগির রোস্ট/ গরুর বট (৫০ টাকা), কোয়েল/ গরুর মাথা (৬০ টাকা), দেশি মুরগি/ গরুর কলিজা / গরুর মাংস (৭০ টাকা), টার্কি মুরগি/খাসির মাংস/ হাঁস (৮০ টাকা), কবুতর (১০০ টাকা) ইত্যাদি।
নদী ও সামুদ্রিক মাছের পসরা সাজানো দোকানে পাওয়া যাবে- পাঙ্গাস মাছ/চিংড়ি (৩০ টাকা), কই/সরপুটি/তেলাপিয়া (৩৫ টাকা), রুই মাছ রান্না/রুই মাছ ভাজি/কাতলা/মৃগেল/মাগুর/শিং/টেংরা/কাচকি/মলা মাছ/বাইলা মাছ/শোল মাছ/টাকি মাছ/বাইন মাছ/বাটা মাছ/কাতলা মাছ (৪০ টাকা), বেলে মাছ/চিতল মাছ/বোয়াল/পাবদা (৫০ টাকা), ইলিশ/সরিষা ইলিশ/কোরাল মাছ/গলদা চিংড়ি (৬০ টাকা) ইত্যাদি।
শাক-সবজির মধ্যে রয়েছে লালশাক/পুঁইশাক/পালংশাক/মূলাশাক/লাউশাক/কুমড়ারশাক (১০ টাকা), লাউচিংড়ি/শাক চিংড়ি (৩৫ টাকা), মুড়িঘণ্ট/লতি/ডাটা (৩৫ টাকা) ইত্যাদি।
এছাড়া ডালের বড়া ( ৫ টাকা), বেগুনভাজি/আলুভাজি/বাঁধাকপিভাজি/শিম-আলু/ সিকেন বড়া/ করলা ভাজি/ ফুলকপি-আলু ভাজি/ মিষ্টি কমড়া (১০ টাকা), মাছের ডিম (৩৫ টাকা) ইত্যাদি।
খিচুড়ি (প্রতি প্লেট-২০ টাকা), তেহেরি মুরগি (৫০ টাকা), তেহেরি গরু/মোরগ পোলাও/বিরিয়ারি (৫০ টাকা)।
খাবারের শেষে বাঙালির মিষ্টি-দই বা পান না হলে তো খাবারই অপূর্ণ থেকে যায়। এসবেরও কমতি নেই এখানে।
মিষ্টির মধ্যে পাওয়া যায়-ড্রাই সন্দেশ/কাটালি ভোগ/রস কদম/টফি/নারকেলের নাড়ু (১০ টাকা), ইলিশ পেটি সন্দেশ/পেরা সন্দেশ/পাতা ষড়ফি/কাঁচা সন্দেশ/পেয়ারা সন্দেশ (২০ টাকা), বগুরার দই (৩০ টাকা)।
তরুণ-তরুণীদের জন্য রয়েছে হরেক রকমের পান। নরমাল পান (১০ টাকা), শাহী পান (২০ টাকা), রঙ্গিলা পান (৩০ টাকা), কাঁচাগোল্লা (৪০ টাকা), ফায়ার ঢাকাইয়া/বৌ পান/হাসি-খুশি পান (৫০ টাকা), ছাচি পান (৬০ টাকা), পরান যায় জ্বলিয়া/ দিলখোশ (৮০ টাকা), ফায়ার বোম্বে/মনের মাঝে তুমি/লাভলাইন (১০০ টাকা) ইত্যাদি।
দিনের আয়োজন শেষে সন্ধ্যায় খাবারের নতুন মেন্যুতে সাজে বটতলা। সেখানে খাবারের পাশাপাশি পাওয়া যায় মুরগির গ্রিল, নানরুটি, সিঙাড়া, পুরি, পিঁয়াজু, আলুর চপ, বেগুনি ও জিলাপি । এছাড়া বসে বিভিন্ন পিঠার আসর।
এখানে দেখা মিলবে রঙিন শাড়ির দোকানের। তরুণীদের ভিড়ে ব্যস্ততায় দিন পার হয় ভ্রাম্যমাণ এই ভ্যান দোকানিদের। প্রিয় মানুষটিকে পছন্দের শাড়ি উপহার দিতে অনেকেই নিজের পরিবারকে নিয়ে ছুটে আসেন বটতলায়।
প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের এই ক্যাম্পাস ঘুরে দেখার জন্য বাহনের মধ্যেও আছে বৈচিত্র। আছে রিকশা-ভ্যান। ভ্যানে প্রায় ছয়জন একত্রে বসা যায়। তাই পরিবার ও বন্ধুদের নিয়ে অনেকেই এই যানবাহনে উপভোগ করেন ক্যাম্পাসের সৌন্দর্য।
জাবির ‘বটতলা’ শিক্ষার্থীদের আরেক মিলন মেলা। প্রতিদিন সকাল ৮টা থেকে রাত ১১টা পর্যন্ত শিক্ষাথী ও দর্শনার্থীদের পদচারণায় মুখরিত থাকে এই বটতলা। সন্ধ্যার পরে গল্প-আড্ডায় মেতে উঠে শিক্ষার্থীরা। এটিই বটতলার প্রাণ। শুধু শিক্ষার্থীরাই না, বাহিরের দর্শনার্থীরা অন্তত একবারের জন্য হলেও এখানে খেয়ে যান। তা না হলে এ ক্যাম্পাসে ঘুরতে আসাটা যেন তাদের অপূর্ণ থেকে যাবে। জাহাঙ্গীরনগরে ঘুরতে এসেছে অথচ বটতলায় খাননি এমন লোক হয়ত খুঁজে পাওয়া দুস্কর। শহরের ব্যস্ততার ফাঁকে তাই আপনিও চলে আসুন এই ভর্তা ও খাবারের রাজ্য জাবির বটতলায়।
বলা প্রয়োজন এই দোকানগুলো হল প্রশাসন তদারকি ও নিয়ন্ত্রণ করেন। এছাড়া ‘কনজ্যুমার ইয়্যুথ’ নামের সংগঠনের ব্যানারে শিক্ষার্থীরা খাবারের মান, পরিবেশ ও মূল্য নির্ধারণে নিয়মিত কাজ করে থাকেন।
যেভাবে আসবেন:
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় রাজধানী থেকে ৩২ কিলোমিটার দূরে ঢাকা-আরিচা মহাসড়কের পশ্চিমে অবস্থিত। ঢাকার প্রায় সব জায়গা থেকেই এখানে আসার বাস সার্ভিস রয়েছে। মিরপুর-১০ থেকে (ইতিহাস ও রাজধানী) ৩৫ টাকা, মতিঝিল থেকে (ওয়েলকাম) ৫০ টাকা, মালিবাগ থেকে (লাব্বাইক) ৫০ টাকা, গুলশান থেকে (অগ্রদূত) ৫০ টাকা, আব্দুল্লাহপুর থেকে নবীনগর হয়ে ক্যাম্পাস আসারও বাস সার্ভিস রয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয় গেইট থেকে রিকশা অথবা ভ্যানে বটতলায় চলে আসবেন। রিকশা ভাড়া ১০ টাকা ও ভ্যানে জনপ্রতি পাঁচ টাকা।

জাবি সংবাদদাতা