রাবির চারুকলায় ‘ভয়াবহ’ সেশনজট
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের (রাবি) চারুকলা অনুষদে সেশনজটের কবলে পড়েছেন শিক্ষার্থীরা। রুটিন অনুযায়ী ক্লাস নিতে শিক্ষকদের গাফিলতি, শ্রেণিকক্ষ ও শিক্ষক সংকট, খাতা মূল্যায়নে অনীহাসহ নানা কারণে ‘ভয়াবহ’ এই সেশনজট তৈরি হয়েছে।
শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, চারুকলা অনুষদে চার বছরের স্নাতক ও এক বছরের স্নাতকোত্তর মিলিয়ে উচ্চশিক্ষা শেষ করতে পাঁচ বছরের জায়গায় সাত থেকে আট বছর সময় লাগছে। এ ছাড়া পরীক্ষা শেষে ফল প্রকাশ করতে অনেক সময় দুই বছরও অপেক্ষা করতে হচ্ছে।
জানা গেছে, ২০১৬ সালে চারুকলা বিভাগকে অনুষদে রূপান্তর করা হয়। ওই অনুষদে এখন তিনটি বিভাগ রয়েছে। বিভাগগুলা হলো মৃৎশিল্প ও ভাস্কর্য বিভাগ, গ্রাফিকস ডিজাইন, কারুশিল্প ও শিল্পকলার ইতিহাস বিভাগ এবং চিত্রকলা, প্রাচ্যকলা ও ছাপচিত্র বিভাগ।
জানা গেছে, তিনটি বিভাগের কার্যক্রম একটি কক্ষ থেকেই পরিচালিত হচ্ছে। এতে এক বিভাগের কাগজপত্রের মধ্যে অন্য বিভাগের কাগজপত্র গুলিয়ে যায়।
চারুকলা অনুষদের একাধিক শিক্ষার্থীর অভিযোগ, চারুকলা অনুষদের শিক্ষার্থীদের সবচেয়ে বেশি সেশনজটে ভুগতে হচ্ছে। এক সেশনে ভর্তি হয়ে অন্য বিভাগের শিক্ষার্থীরা পড়ালেখা শেষ করে কর্মজীবনে প্রবেশ করেছেন। কিন্তু চারুকলার শিক্ষার্থীদের ক্যাম্পাসে পড়ে থাকতে হচ্ছে। শিক্ষকদের ভয়ে এসব বিষয়ে প্রকাশ্যে মুখ খুলতে পারছেন না শিক্ষার্থীরা।
তবে অনুষদের শিক্ষকরা বলছেন, নতুন বিভাগ চালুর পর শ্রেণিকক্ষ সংকট প্রকট হয়ে উঠেছে। একই সঙ্গে নতুন শিক্ষক নিয়োগ না হওয়ায় শিক্ষক সংকটও সেশনজটের অন্যতম কারণ। প্রশাসন এসব বিষয় সমাধানে এগিয়ে না এলে সংকট দূর হবে না।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ২০১১-১২ শিক্ষাবর্ষে শিক্ষার্থীদের অনার্স শেষ হওয়ার কথা ছিল ২০১৫ সালে। অথচ নির্ধারিত শিক্ষাবর্ষের চেয়ে প্রায় দুই বছর পার হলেও এখনো তাঁদের পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়নি। চলতি বছর পরীক্ষা নেওয়ার কথা থাকলেও তা নিয়ে সংশয়ের সৃষ্টি হয়েছে। ২০১৩-১৪ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থীদের চলতি বছর স্নাতক শেষ হওয়ার কথা থাকলেও সবেমাত্র তাঁরা তৃতীয় বর্ষের পরীক্ষা শেষ করতে পেরেছেন। একই সঙ্গে প্রতিটি বর্ষে একাধিক করে ব্যাচ রয়েছে। যা বোঝাতে শিক্ষার্থীদের নিউ চতুর্থ বর্ষ ও ওল্ড চতুর্থ বর্ষ হিসেবে পরিচয় দিতে হয়।
অপরদিকে, পরীক্ষা গ্রহণ করলেও দীর্ঘদিনেও ফল প্রকাশও হয় না। ২০০৮-০৯ শিক্ষাবর্ষের স্নাতকোত্তর পরীক্ষা শেষ হয়েছে ২০১৪ সালে। কিন্তু তিন বছর পেরিয়ে গেলেও এখনো ফল প্রকাশ হয়নি। একইভাবে ২০০৯-১০ শিক্ষাবর্ষের স্নাতক পরীক্ষা শেষ হয়েছে ২০১৫ সালে। কিন্তু দুই বছর পার হলেও এখনো ফল পাননি শিক্ষার্থীরা।
বিশ্ববিদ্যালয়ের মৃৎশিল্প ও ভাস্কর্য বিভাগের সহকারী অধ্যাপক কনক কুমার পাঠক বলেন, ‘সেশনজট থাকায় যে শিক্ষকরা নিয়মিত ক্লাস নিতে ইচ্ছুক, তাঁদেরও সমস্যায় পড়তে হচ্ছে। নতুন বিভাগ খোলা হলেও সেভাবে শিক্ষক নিয়োগ হয়নি। ফলে শিক্ষক সংকটও রয়েছে। অবকাঠামো সংকটসহ নানামুখী সংকটের কারণে এ সমস্যা কাটিয়ে ওঠা যাচ্ছে না।’
বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদের ডিন অধ্যাপক মো. মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, ‘এখানে শ্রেণিকক্ষ, শিক্ষক, কর্মকর্তা-কর্মচারীসহ নানামুখী সমস্যা প্রকট। সমস্যা সমাধানে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের সহযোগিতা প্রয়োজন। আমরা কয়েক দফায় প্রশাসনকে এসব সমস্যা সমাধানে লিখিত আবেদন দিয়েছি। কিন্তু তেমন কোনো সাড়া পাইনি। নতুন প্রশাসনকে লিখিতভাবে আবার জানানো হবে। আশা করি, বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন বিষয়টি সুনজরে দেখবেন। কারণ প্রশাসনিকভাবে সমস্যা সমাধানে ব্যবস্থা গ্রহণ না করলে সেশনজট আরো বাড়বে।’
এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক মো. আবদুস সোবহান বলেন, ‘আমি গত দুই মাস আগে দায়িত্ব নিয়েছি। দায়িত্ব নেওয়ার পর দীর্ঘদিন জমে থাকা কাজগুলো গুরুত্ব বিবেচনা করে পর্যায়ক্রমে সম্পন্নের চেষ্টা করছি। চারুকলা অনুষদের সমস্যা বিষয়ে এখনো কিছু জানি না। অনুষদের পক্ষ থেকেও জানানো হয়নি। বিষয়টি খোঁজ নিয়ে সমাধানে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

রাবি সংবাদদাতা