মুক্তিযুদ্ধ মঞ্চে ‘ফাটল’, একে অন্যকে দোষারোপ
মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক সংগঠনগুলোর প্ল্যাটফর্ম ‘মুক্তিযুদ্ধ মঞ্চ’। সরকারি চাকরিতে কোটা বাতিলকে কেন্দ্র করেই গড়ে ওঠে সংগঠনটি। তাদের লক্ষ্য, মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় ঐকমত্য গঠন এবং মুক্তিযোদ্ধা পরিবারের অধিকার আদায়। কিন্তু সংগঠনবহির্ভূত কর্মকাণ্ডের অভিযোগ আসায় মঞ্চে এখন ফাটল ধরেছে। যে ফাটল এখন দৃশ্যমান।
জানা গেছে, সংগঠনবহির্ভূত কর্মকাণ্ডের অভিযোগে গত ১০ অক্টোবর মুক্তিযুদ্ধ মঞ্চের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় (ঢাবি) শাখার সভাপতি আমিনুল ইসলাম বুলবুল ও সাধারণ সম্পাদক আল মামুনকে অব্যাহতি দেন মঞ্চের কেন্দ্রীয় মুখপাত্র ও ঢাবির সমাজবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. আ ক ম জামাল উদ্দিন। আর অব্যাহতি পাওয়ার পরেই নতুন কমিটি গঠন করেন বুলবুল ও মামুন। নতুন কমিটিতে প্রধান উপদেষ্টা করা হয় অধ্যাপক জামাল উদ্দিনকে।
গণমাধ্যমে পাঠানো এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে অধ্যাপক জামাল উদ্দিন বলেন, ‘গত ৬ অক্টোবর আবরার হত্যার ঘটনাকে কেন্দ্র করে দেশ যখন উত্তাল, প্রধানমন্ত্রী থেকে শুরু করে সবাই যখন এটা নিয়ে ব্যস্ত, তখন আমিনুল ইসলাম বুলবুল ও আল মামুন ক্যাসিনোতে জড়িত থাকার দায়ে যুবলীগের চেয়ারম্যান ওমর ফারুকের কুশপুত্তলিকা দাহ করার কর্মসূচি গ্রহণ করেন। আমি তাঁদের নিষেধ করি। কিন্তু তাঁরা আমার কথা শোনেননি। ১০ অক্টোবর তাঁরা কুশপুত্তলিকা দাহ করেন। এ জন্য ওই দিন সংগঠন থেকে তাঁদের বহিষ্কার করা হয়।’
এদিকে গতকাল রোববার অধ্যাপক জামাল উদ্দিন স্বাক্ষরিত সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে ঢাবি শাখার কমিটি ঘোষণা করা হয়। এতে সভাপতি হিসেবে মো. খোকন মিয়া ও সাধারণ সম্পাদক হিসেবে শরীফুল হাসান শুভকে দায়িত্ব দেওয়া হয়। এর আগে ওই দায়িত্বে ছিলেন আমিনুল ইসলাম বুলবুল ও আল মামুন।
কিন্তু আহ্বায়ক কমিটি গঠনের তিন মাসের মধ্যে মঞ্চের মুখপাত্র জামাল উদ্দিন কোনো কমিটি দিতে পারেননি—এমন অভিযোগে গত ১০ অক্টোবর নতুন করে একটি কেন্দ্রীয় কমিটি গঠন করা হয়। এতে আমিনুল ইসলাম বুলবুলকে সভাপতি ও আল মামুনকে সাধারণ সম্পাদক করা হয়। যাতে ৩০ জনকে সদস্য হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়।
গণমাধ্যমে পাঠানো ওই বিজ্ঞপ্তিতে দেখা যায়, কমিটির ৩০ জন সদস্যই স্বাক্ষর করেছেন। এ কমিটিতে প্রধান উপদেষ্টা করা হয় অধ্যাপক জামাল উদ্দিনকে।
এ বিষয়ে আমিনুল ইসলাম বুলবুল এনটিভি অনলাইনকে বলেন, ‘যখন জামাল উদ্দিনকে আহ্বায়ক করে মুক্তিযুদ্ধ মঞ্চের কমিটি গঠন করা হয়, তখন তাঁর মেয়াদ ছিল তিন মাস। তাঁকে বলা হয়েছিল, এ সময়ের মধ্যে নতুন কমিটি দিতে। কিন্তু এক বছরের বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও কোনো কমিটি দিতে পারেননি।’
এদিকে ‘মুক্তিযুদ্ধ মঞ্চ’ কোনো রেজিস্টার্ড সংগঠন নয়, তাই এর নির্দিষ্ট মেয়াদ থাকবে না বলে মনে করেন অধ্যাপক জামাল উদ্দিন। তিনি এনটিভি অনলাইনকে বলেন, ‘এই মঞ্চ গঠন হয়েছিল মুক্তিযোদ্ধাদের বিভিন্ন সংগঠনের নেতাদের সম্মিলিত পরামর্শে। তখন সবাই আমাকে মুখপাত্র ঘোষণা দেন। এটা কোনো রেজিস্টার্ড সংগঠন না। এটা শুধু একটি আন্দোলনের প্ল্যাটফর্ম। এর নির্দিষ্ট মেয়াদ থাকে না। কিন্তু ওরা (বুলবুল ও মামুন) সব বানাচ্ছে। যা ইচ্ছা তাই করছে। এ জন্য সরকারকে আহ্বান জানাব, তাঁদের বিরুদ্ধে যেন ব্যবস্থা নেয়।’
জামাল উদ্দিন আরো বলেন, ‘তাঁরা যে কমিটি দিয়েছে, তাতে আমাকে উপদেষ্টা করা হয়েছে। কিন্তু তাঁদের কাছে শুনে দেখবেন যে, আমাকে জানিয়েছিল কি না। আমি মঞ্চের মুখপাত্র, অথচ আমাকে বাদ দিয়ে তাঁরা কমিটি দিয়েছে।’
‘মুক্তিযুদ্ধ মঞ্চ’ কোনো রেজিস্টার্ড সংগঠন না বলে দাবি করলেও তার একটি গঠনতন্ত্র আছে বলে জানান মঞ্চের আরেক অংশের কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক আল মামুন। তিনি এনটিভি অনলাইনকে বলেন, ‘আমাদের একটা গঠনতন্ত্র আছে। সেখানে মঞ্চের কমিটি কবে ও কীভাবে হবে, তার সব দেওয়া আছে। এ ছাড়া মঞ্চের নিয়মিত সভা করার কথা। কিন্তু জামাল উদ্দিন সভা করতে পারছেন না। তিনি যেসব শাখায় কমিটি দেন, সেখানে নিজের ইচ্ছা অনুযায়ী কমিটি দেন। যা নিয়মবহির্ভূত।’
এদিকে বুলবুল-মামুন কমিটি মুক্তিযুদ্ধ মঞ্চের প্যাডে ঢাবি, ঢাকা, খুলনা, রাজশাহী মহানগর, ঢাকা কলেজ, বিভিন্ন জেলা শাখা ও ভারত শাখাসহ বিভিন্ন দেশের কমিটি দেওয়া হয়েছে।
এসব কমিটির ব্যাপারে মঞ্চের মুখপাত্র জামাল উদ্দিন বলেন, ‘তারা যা ইচ্ছা তাই করছে। তারা এর আগে বামদের উপর হামলা করেছে। আবার আজ (রোববার) ছাত্রদলের নেতাকর্মীদের উপর হামলা করেছে। তারা তো ক্যাম্পাসে জোয়ার-ভাটা দেখেননি। এ জন্য যা ইচ্ছা তাই করে যাচ্ছে।’
জামাল উদ্দিন আরো বলেন, ‘তারা নিজেদের লাইম লাইটে আনার জন্য যা ইচ্ছা তাই করছে। এ জন্য তারা যেসব কাজ করছে, তার দায়ভার আমরা নেব না। সরকার ও বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন যেন তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়।’
‘আমি মুক্তিযোদ্ধাদের নিয়ে, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা এবং এর লক্ষ্যে সবাইকে নিয়ে ঐক্য গঠনের চেষ্টা করছি,’ যোগ করেন জামাল উদ্দিন।

বিশ্ববিদ্যালয় সংবাদদাতা