জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়
অগ্রযাত্রার ৪৫ বছর
আজ ১২ জানুয়ারি, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ৪৫তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী দিবস। ২০০১ সাল থেকে এ দিনটিকে কর্তৃপক্ষ ‘জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় দিবস’ হিসেবে পালন করছে। তৎকালীন উপাচার্য খ্যাতিমান অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক আবদুল বায়েস ‘বিশ্ববিদ্যালয় দিবস’ পালনের প্রচলন করেন। এখন দেশের অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়েও প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী পালন করা হয়। অধ্যাপক আবদুল বায়েস এ ক্ষেত্রে পথিকৃৎ। তবে এর আগে আরেক খ্যাতিমান উপাচার্য অধ্যাপক ড. আমিরুল ইসলাম চৌধুরী ১৯৯৬ সালের ১২ জানুয়ারি এ বিশ্ববিদ্যালয়ের ২৫ বছর পূর্তি উৎসব পালন করেন।
বিশ্ববিদ্যালয় দিবস একটি পুনর্মিলনী উৎসবও বটে। পুনর্মিলনীর ইংরেজি প্রতিশব্দ Reunion। ইংরেজি অভিধানে পুনর্মিলনী বলতে Union after separation, an assembly of friends, old students-কে বোঝানো হয়েছে। এই Reunion বলতে স্কুল, কলেজ বা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন ছাত্রদের যে মিলনমেলা বোঝায়, তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। বিশ্ববিদ্যালয়ে অ্যালামনাই অ্যাসোসিয়েশন থাকে। বিশ্ববিদ্যালয় থেকে গ্র্যাজুয়েট ডিগ্রিপ্রাপ্তরা এই অ্যালামনাই অ্যাসোসিয়েশনের সদস্যপদ লাভ করেন। সদস্যপদ লাভের পর তাঁদের অ্যালামনাস বলা হয়। অ্যালামনাসদের আগমনে পুনর্মিলনী উৎসব পূর্ণতা লাভ করে।
১২ জানুয়ারি ‘জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় দিবস’ উপলক্ষে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ চার দিনব্যাপী অনুষ্ঠানমালার আয়োজন করেছে। ১২ জানুয়ারি সকাল ১০টায় বিজনেস স্টাডিজ অনুষদ চত্বরে জাতীয় পতাকা এবং বিশ্ববিদ্যালয় পতাকা উত্তোলনের মাধ্যমে বিশ্ববিদ্যালয় দিবসের কর্মসূচির উদ্বোধন করা হয়। ১৩ জানুয়ারি বিকেল ৩টায় সেলিম আল দীন মুক্তমঞ্চে পুতুলনাচ এবং বিকেল ৫টায় সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হবে। ১৪ জানুয়ারি বিকেল ৩টায় পিঠামেলা এবং বিকেল ৫টায় নাটক মঞ্চায়ন করা হবে। ১৫ জানুয়ারি অ্যালামনাই ডে মিলনমেলা অনুষ্ঠিত হবে। দিনব্যাপী এই মিলনমেলায় সকাল ৯টায় বিজনেস স্টাডিজ অনুষদ চত্বর থেকে আনন্দ শোভাযাত্রা বের হবে। এর পর সেলিম আল দীন মুক্তমঞ্চে স্মৃতিচারণ, প্রথম ব্যাচে ভর্তি করা শিক্ষার্থীদের সংবর্ধনা, ফানুস ওড়ানো, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান পরিবেশনা ও র্যাফেল ড্র অনুষ্ঠিত হবে।
অ্যালামনাস দিবসে প্রাক্তন শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও অন্যান্য অতিথিকে স্বাগত ও বরণ করার জন্য বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস শোভিত হয়ে প্রতীক্ষা করছে। বিশ্ববিদ্যালয় দিবস উপলক্ষে এবার চার দিনব্যাপী অনুষ্ঠানমালার আয়োজন করা হলেও ২০১১ সালে তৎকালীন উপাচার্য অধ্যাপক ড. শরীফ এনামুল কবির বিশ্ববিদ্যালয় দিবসের চার দশক পূর্তিতে চার দিনের অনুষ্ঠানমালার আয়োজন করেছিলেন। অধ্যাপক ড. শরীফ এনামুল কবির বিশ্ববিদ্যালয়ে নবগঠিত অ্যালামনাই অ্যাসোসিয়েশনের আহ্বায়ক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। তিনি এ বিশ্ববিদ্যালয়ের তৃতীয় ব্যাচের রসায়ন বিভাগের ছাত্র ছিলেন। বিশ্ববিদ্যালয় দিবসের এবারের অনুষ্ঠানে প্রথমবারের মতো ‘অ্যালামনাই ডে মিলনমেলা’ যুক্ত হওয়ায় বিশ্ববিদ্যালয় দিবসের উৎসবে বহুমাত্রা যোগ হয়েছে।
বিশ্ববিদ্যালয় দিবসের এ নিবন্ধে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠার প্রেক্ষাপট খানিকটা তুলে ধরা প্রয়োজন। বলা প্রয়োজন, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের বয়স স্বাধীন বাংলাদেশের সমান। ইংরেজ শাসনামলেই পূর্ব বাংলায় একটি উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান স্থাপনের দাবি ক্রমে জোরালো হয়ে ওঠে। ১৯১১ সালের ডিসেম্বরে বঙ্গভঙ্গের সিদ্ধান্ত বাতিল ঘোষিত হওয়ার পর অখণ্ড ভারতের প্রধান প্রশাসক লর্ড হার্ডিঞ্জ ঢাকা সফরে আসেন। এ সময় নওয়াব স্যার সলিমুল্লাহসহ আরো অনেকে পূর্ব বাংলার মানুষের জন্য একটা উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান স্থাপনের দাবি জানান। ইংরেজ সরকার উপর্যুপরি দাবির পরিপ্রেক্ষিতে ১৯২১ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করে। ১৯৪৭ সালের ১৪ আগস্ট পাকিস্তান ও ১৫ আগস্ট ভারত স্বাধীনতা লাভ করে। তখন পূর্ব বাংলার নাম হয় পূর্ব পাকিস্তান।
১৯২১ থেকে ১৯৬৬ সাল পর্যন্ত সময়ের মধ্যে ঢাকা, রাজশাহী, কৃষি, প্রকৌশল ও চট্টগ্রাম বিশ্বিবিদ্যালয় স্থাপিত হলেও পূর্ব পাকিস্তানের উচ্চশিক্ষার চাহিদা পূরণ করা সম্ভব হচ্ছিল না। তাই পরিকল্পনা অনুযায়ী ঢাকার কাছাকাছি বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের জন্য আনুষ্ঠানিকভাবে ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করা হয় ঢাকা থেকে ৪০ কিলোমিটার দূরে গাজীপুর জেলার সালনায়। কিন্তু নানা কারণে শেষ পর্যন্ত ১৯৬৭ সালে ঢাকা থেকে প্রায় ৩০ কিলোমিটার দূরে সাভার এলাকায় বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য নতুন স্থান নির্বাচন করা হয়। সাভারের ওপর দিয়ে এশিয়ান হাইওয়ে। এই মহাসড়কের পশ্চিম পাশে নির্ধারণ করা হয় নতুন বিশ্ববিদ্যালয় গড়ার স্থান। এর পাশে রয়েছে ডেইরি ফার্ম, বাংলাদেশ প্রাণিসম্পদ গবেষণা প্রতিষ্ঠান, সাভার সেনানিবাস ও জাতীয় স্মৃতিসৌধ। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রকল্প প্রধান হিসেবে ড. সুরত আলী খানকে নিয়োগ করা হয়।
১৯৭০ সালের ২০ আগস্ট পূর্ব পাকিস্তান সরকার এক অর্ডিন্যান্সের মাধ্যমে এ নতুন বিশ্ববিদ্যালয়ের নাম রাখে ‘জাহাঙ্গীরনগর মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয়’। ১৯৭০ সালের সেপ্টেম্বরে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম উপাচার্য হিসেবে যোগদান করেন বিশিষ্ট রসায়নবিদ অধ্যাপক ড. মফিজউদ্দিন আহমদ। ১৯৭১ সালের ১২ জানুয়ারি পূর্ব পাকিস্তানের গভর্নর ও বিশ্ববিদ্যালয়ের চ্যান্সেলর রিয়ার অ্যাডমিরাল এস এম আহসান আনুষ্ঠানিকভাবে ‘জাহাঙ্গীরনগর মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয়’-এর উদ্বোধন করেন। তবে এর আগেই ৪ জানুয়ারি অর্থনীতি, ভূগোল, গণিত ও পরিসংখ্যান বিভাগে ক্লাস শুরু হয়। প্রথম ব্যাচে ছাত্রছাত্রীর সংখ্যা ছিল ১৫০ জন। স্বাধীন বাংলাদেশের জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনে ১৯৭৩ সালে বিশ্ববিদ্যালয় অ্যাক্ট পাস করা হয়। এই অ্যাক্টে বিশ্ববিদ্যালয়ের নাম রাখা হয় ‘জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়’।
ইতিহাসের এই পথপরিক্রমায় জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় আজ দেশের শীর্ষস্থানীয় বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। চারটি বিভাগ ও ১৫০ জন ছাত্রছাত্রী নিয়ে যে বিশ্ববিদ্যালয়ের যাত্রা শুরু হয়েছিল; প্রতিষ্ঠার ৪৫ বছরে সেই বিশ্ববিদ্যালয় আজ মহীরুহ ধারণ করেছে। ৩৩টি বিভাগ ও দুটি ইনস্টিটিউটে ১৫ হাজারের বেশি ছাত্রছাত্রী এখন লেখাপড়া করছে। ছাত্রহলের সংখ্যা আটটি ও ছাত্রীহল আটটি। বর্তমানে শিক্ষকের সংখ্যা ৬৬৪ জন, অফিসার ২৮৭ জন, তৃতীয় শ্রেণির কর্মচারী ৭০২ জন এবং চতুর্থ শ্রেণীর কর্মচারীর সংখ্যা ৭৩৬ জন। ২০১৪ সালের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত এই বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ২৪ হাজার ১৮৬ জন স্নাতক (সম্মান) ও ১৯ হাজার ৮৯৬ জন স্নাতকোত্তর, ২৭৭ জন এমফিল গবেষক ও ৫৪৫ জন পিএইচডি গবেষক তাঁদের গবেষণা সম্পন্ন করে ডিগ্রি অর্জন করেছেন। গত এক বছরে ডিগ্রি সম্পন্নকারী শিক্ষার্থীর সংখ্যা আরো বেড়েছে। প্রথম সমাবর্তনে নিবন্ধনকৃত গ্র্যাজুয়েটের সংখ্যা ছিল চার হাজার ৪৮৪ জন, দ্বিতীয় সমাবর্তনে পাঁচ হাজার ১২ জন, তৃতীয় সমাবর্তনে চার হাজার ৩৮৩ জন, চতুর্থ সমাবর্তনে তিন হাজার ৮৭৪ জন, ২২ জন এমফিল ও পিএইচডি ৫৩ জন, পঞ্চম সমাবর্তনে প্রায় নয় হাজার গ্র্যাজুয়েট, এমফিল ও পিএইচডি ডিগ্রি অর্জনকারী অংশ নেন।
প্রতিষ্ঠার এই ৪৫ বছরে বিশ্ববিদ্যালয়ের অগ্রযাত্রায় গৌরবোজ্জ্বল অনেক কীর্তি সাধিত হয়েছে। বাংলাদেশের সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মধ্যে ‘প্রথম নারী উপাচার্য’ হয়ে তিনি এ কীর্তি রচনা করেছেন; গড়েছেন ইতিহাস। গত এক বছরে এ বিশ্ববিদ্যালয়ের বেশ কয়েকজন সম্মানিত শিক্ষক দেশে-বিদেশে শিক্ষা ও গবেষণায় অনন্য সাফল্য করে বিশ্বব্যাপী স্বীকৃত ও সম্মানজনক অ্যাওয়ার্ড লাভ করেছেন। শিক্ষার্থীদের মধ্যে কয়েকজন আন্তর্জাতিক খ্যাতনামা প্রতিষ্ঠানে চাকরি পাওয়ার মধ্য দিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের সুনাম বৃদ্ধি করেছেন।
৪৫ বছরের পথপরিক্রমায় জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় তার অভীষ্ট লক্ষ্যে এগিয়ে যাচ্ছে। সামগ্রিকভাবে বিশ্ববিদ্যালয় একটি ইতিবাচক পরিবর্তনের পথে অগ্রসরমান। শিক্ষা, গবেষণা ও ভৌত অবকাঠামোগত উন্নয়ন সমান্তরালভাবে এগিয়ে চলছে। বিভাগগুলোতে নিয়মিত ক্লাস ও পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হচ্ছে। এর ফলে সেশনজটকবলিত বিভাগগুলো এখন সেশনজটমুক্ত হওয়ার পথে। ছাত্রছাত্রীদের জন্য নতুন কয়েকটি আবাসিক হল নির্মাণসহ ভৌত অবকাঠামো, একাডেমিক ও প্রশাসনিক উন্নয়নের নানা ধাপ এগিয়ে চলছে।
লেখক : অ্যালামনাস, ২২তম ব্যাচ, সরকার ও রাজনীতি বিভাগ, সেশন ১৯৯২-৯৩।

আহমেদ সুমন