আন্দোলন প্রত্যাহার, ব্যবস্থা নেবে ছাত্রলীগ
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিকের পদত্যাগের দাবি থেকে সরে এসেছে ছাত্রলীগ। তারা আন্দোলন কর্মসূচি প্রত্যাহার করেছে।
সেই সঙ্গে উপাচার্যের গাড়িতে হামলাকারীদের বিরুদ্ধে তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়ার কথা জানিয়েছেন ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় কমিটির সাধারণ সম্পাদক এস এম জাকির হোসেন। আজ শুক্রবার রাত সোয়া ৯টার দিকে উপাচার্যের বাসভবনের সামনে সাংবাদিকদের এ কথা জানান তিনি।
এর আগে আজ রাত সোয়া ৮টার দিকে ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় কমিটির সভাপতি সাইফুর রহমান সোহাগ, সাধারণ সম্পাদক এস এম জাকির হোসেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রলীগের সভাপতি আবিদ আল হাসান ও সাধারণ সম্পাদক মোতাহার হোসেন প্রিন্স উপাচার্যের বাসভবনের ভেতরে ঢুকেন। প্রায় এক ঘণ্টা পর রাত সোয়া ৯টার দিকে ছাত্রলীগের ওই চার নেতা বের হয়ে আসেন।
ছাত্রলীগের সভাপতি সাইফুর রহমান সোহাগ বলেন, ‘আমাদের প্রথম দাবি ছিল রেজিস্ট্রারের অপসারণ। এটি পূরণ হয়ে গেছে। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের কাছে আমাদের দ্বিতীয় দাবি ছিল স্মরণিকা প্রকাশের সঙ্গে রেজিস্ট্রারসহ যারা জড়িত ছিল, একটা তদন্ত কমিটি গঠন করে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন আমাদের সেই বিষয়ে আশ্বাস দিয়েছে। তাই আমরা আন্দোলন প্রত্যাহার করে নিলাম।’
অন্যদিকে সাধারণ সম্পাদক এস এম জাকির বলেন, ‘আমাদের আন্দোলন ছিল রেজিস্ট্রারের বিরুদ্ধে, উপাচার্যের বিরুদ্ধে না। আমাদের দাবি পূরণ হয়ে গেছে। তাই আমরা আন্দোলন প্রত্যাহার করলাম।’
উপাচার্যের গাড়িতে হামলাকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে কি না জানতে চাইলে এস এম জাকির হোসেন বলেন, ‘উপাচার্যের গাড়িতে হামলার ঘটনার সঙ্গে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা জড়িত নন। এ ব্যাপারে তদন্ত কমিটি গঠন করে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
এর আগে উপাচার্যকে পদত্যাগের জন্য রাত ৮টা পর্যন্ত সময় বেধে দেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের সভাপতি আবিদ আল হাসান ও সাধারণ সম্পাদক মোতাহার হোসেন প্রিন্সসহ অন্য নেতাকর্মীরা।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় দিবস উপলক্ষে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ আজ একটি স্মরণিকা প্রকাশ করে। এই স্মরণিকার প্রকাশনার দায়িত্বপালনকারী ভারপ্রাপ্ত রেজিস্ট্রার ও বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার ৯৫ বছর উদযাপন কমিটির সদস্যসচিব সৈয়দ রেজাউর রহমান ‘স্মৃতি অম্লান’ শিরোনামে একটি নিবন্ধ লেখেন। এতে তিনি মুক্তিযোদ্ধা জিয়াউর রহমান হলের পরিচিতি তুলে ধরতে গিয়ে লেখেন, ‘জিয়াউর রহমান বাংলাদেশের প্রথম রাষ্ট্রপতি, সাবেক সেনাপ্রধান ও একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা।’
সেই সঙ্গে স্মরণিকার ১৩ নম্বর পৃষ্ঠায় জগন্নাথ হলের বর্ণনা দিতে গিয়ে লেখা হয়, বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যালঘু তথা হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান সম্প্রদায় এবং উপজাতি ছাত্রদের জন্য এই হল প্রতিষ্ঠিত হয়।
দুপুরে টিএসসিতে বিশ্ববিদ্যালয় দিবসের আলোচনা সভা চলাকালে ভারপ্রাপ্ত রেজিস্ট্রার রেজাউর রহমানের লেখাটি ছাত্রলীগের কয়েকজন নেতার দৃষ্টিতে আসে। এ নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী, ছাত্রলীগ নেতা ও শিক্ষকরা প্রতিবাদ জানান। উপাচার্য তাৎক্ষণিক ওই স্মরণিকা বাজেয়াপ্ত ও স্মরণিকা কমিটি বাতিল ঘোষণা করেন। একই সঙ্গে এ বিষয়ে তদন্ত কমিটি গঠনের কথা জানান।
সভা শেষে দুপুর ১২টা থেকে পৌনে ১টা পর্যন্ত ছাত্রলীগের কয়েকজন নেতাকর্মী ভারপ্রাপ্ত রেজিস্ট্রার রেজাউর রহমানকে তাঁর কার্যালয়ে তালাবন্দি করে রাখেন। প্রতিবাদে তাঁরা স্মরণিকায় আগুন ধরিয়ে দেন। এরপর বিশ্ববিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রক্টর আমজাদ আলী ঘটনাস্থলে গিয়ে রেজাউর রহমানকে তালামুক্ত করে বের করে নিয়ে যান।
ওই নিবন্ধের প্রতিবাদে আজ জুমার নামাজের পর ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় কমিটি ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কমিটির বিক্ষুব্ধ নেতাকর্মীরা মধুর ক্যান্টিন থেকে বিক্ষোভ মিছিল বের করেন। তাঁরা উপাচার্যের বাসভবনের সামনে গিয়ে তাঁর বিরুদ্ধে নানা ধরনের স্লোগান দিতে থাকেন এবং তাঁর পদত্যাগ দাবি করেন। দুপুর আড়াইটার দিকে উপাচার্য আরেফিন সিদ্দিক গাড়িতে করে তাঁর বাসভবনের সামনে এলে বিক্ষুব্ধ নেতাকর্মীরা হামলা চালিয়ে গাড়ি ভাঙচুর করেন। একপর্যায়ে তাঁরা উপাচার্যের গাড়িতে কিল-ঘুষি দেন এবং জুতা দিয়ে আঘাত করেন। এ সময় উপাচার্যের নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা পুলিশের এক উপপরিদর্শক (এসআই) রক্ষার চেষ্টা করলে ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা তাঁকে মারধর করে আহত করেন। উপাচার্য গাড়ির মধ্যে বসে থাকায় তিনি আহত হননি। ছাত্রলীগের কয়েকজন নেতাকর্মী উপাচার্যের দিকে জুতা ছুড়ে মারেন। তবে তা গায়ে লাগেনি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাংবাদিক ও ছাত্রলীগের কয়েকজন নেতা উপাচার্যকে ঘেরাও করে বিক্ষুব্ধ নেতাকর্মীদের হাত থেকে রক্ষা করে তাঁকে বাসভবনের ভেতরে ঢুকতে সহযোগিতা করেন।
ছাত্রলীগের বিক্ষোভের মুখে বিকেলে সৈয়দ রেজাউর রহমানকে বিশ্ববিদ্যালয়ের সব কার্যক্রম থেকে অব্যাহতি দেওয়ার ঘোষণা দেয় বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। এরপর বিকেল সাড়ে ৪টার দিকে উপাচার্যের (ভিসি) বাসভবন ঘেরাও কর্মসূচি প্রত্যাহারের ঘোষণা দেন ছাত্রলীগের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সভাপতি আবিদ আল হাসান। উপাচার্যের বাসভবনের সামনে এক সংক্ষিপ্ত সমাবেশে তিনি এই ঘোষণা দেন।
আবিদ আল হাসানের ঘোষণার পর ছাত্রলীগের অনেক নেতাকর্মী চলে যান। কিন্তু কিছুক্ষণ পর আবিদ আল হাসান ও ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় কমিটির সহসভাপতি আনোয়ার হোসেন আনু কর্মী-সমর্থক নিয়ে এসে উপাচার্যের বাসভবনের ফটকে তালা ঝুলিয়ে দেন। তিনি আজ রাত ৮টার মধ্যে উপাচার্যকে পদত্যাগের সময় বেঁধে দেন। তাঁর নেতৃত্বে ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা বাসভবনের সামনে মিছিল করছেন এবং উপাচার্যের বিরুদ্ধে নানা ধরনের স্লোগান দিচ্ছেন।
বিকেলে উপাচার্যের বাসভবনের সামনে এক সংক্ষিপ্ত সমাবেশে ছাত্রলীগের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সভাপতি আবিদ আল হাসান বলেন, স্মরণিকা প্রকাশের সঙ্গে জড়িতদের চিহ্নিত করে আজীবনের জন্য অব্যাহতি দিতে হবে। রেজিস্ট্রারকে ক্যাম্পাসে অবাঞ্ছিত ঘোষণা করতে হবে। ১৭ জুলাইয়ের মধ্যে অপরাধীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নিলে পরবর্তীতে লাগাতার আন্দোলনের কর্মসূচি দেবে ছাত্রলীগ। এই দাবিতে ঘেরাও কর্মসূচি প্রত্যাহার করা হলো।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক মোতাহার হোসেন প্রিন্স সাংবাদিকদের বলেন, ‘এই ভিসি স্যারের অবশ্যই প্রত্যক্ষ ইন্ধন ছিল। এবং বাংলাদেশের স্বাধীনতার মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস বিকৃতি করার বড় ষড়যন্ত্র পালন করেছেন এই ভিসি, বর্তমান দায়িত্বে থেকে। আজকে রাত ৮টার ভেতর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি যদি পদত্যাগ না করেন, অনির্দিষ্টকালের ধর্মঘট ডাকব আগামী দিন সকাল ১১টা থেকে।’
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক মোতাহার হোসেন প্রিন্স বলেন, ‘স্মরণিকায় জিয়াউর রহমানকে বাংলাদেশের প্রথম রাষ্ট্রপতি হিসেবে উল্লেখ করায় বিক্ষুব্ধ কর্মীরা উপাচার্যের ওপর হামলার চেষ্টা করে। কিন্তু আমরা তাঁকে ঘটনাস্থল থেকে উদ্ধার করে তাঁর বাসভবনে প্রবেশে সহযোগিতা করি।’

ঢাবি সংবাদদাতা