‘এহন কেউ ভিক্ষা দিবার চায় না’
আনোয়ারা বেগম নামের এক বৃদ্ধা রাজধানীর কারওয়ান বাজার এলাকার একটি মেসে রান্নার কাজ করতেন। কিন্তু করোনাভাইরাসের (কোভিড-১৯) কারণে তিনি সেই কাজ হারিয়েছেন। এখন পেটের দায়ে নেমেছেন ভিক্ষা করতে। কিন্তু কেউ ভিক্ষা দিতে চান না দাবি করে তিনি বলেন, ‘কারো কাছে ট্যাকা নেই,এহন কেউ ভিক্ষা দিবার চায় না।’
আজ শুক্রবার দুপুরে আনোয়ারা বেগম বৃষ্টির মধ্যেও রাস্তায় দাঁড়িয়ে ভিক্ষা করছিলেন। গাড়িতে বসা মানুষদের কাছে তিনি ভিক্ষা চাচ্ছিলেন। কিন্তু কেউ তাঁর ডাকে সাড়া দিয়ে ভিক্ষা দিচ্ছিলেন না। সকাল ১০টা থেকে দুপুর ২টা পর্যন্ত রাস্তায় দাঁড়ালেও কেউ তাঁকে একটি টাকাও দেননি।
দুপুর ২টার দিকে আনোয়ারা বেগমের সঙ্গে এই প্রতিবেদকের কথা হয় কারওয়ান বাজারের বিএসইসি ভবনের নিচের রাস্তার ফুটপাতে। সে সময় তিনি বলেন, ‘এহন ভিক্ষার কথা কইলে কেউ শোনে না। সবাই কয় ট্যাকা নাই। এহন কেউ ভিক্ষা দিবার চায় না। কত লোকের কাছে দুইটা ট্যাকা চাইলাম,কেউ দিল না। শুক্কুরবার রাইতে ভাত খাইছি। সকালে একটা পাউরুটি চেয়ে খাইছি। এহন ক্ষিদায় আর পারছি না। হাত-পা কাঁপতাছে।’
কথা বলতে বলতে আবেগআপ্লুত হয়ে যান আনোয়ারা বেগম। ১৯৭১ সালের পর থেকে তিনি তাঁর স্বামীর সঙ্গে ঢাকায় থাকা শুরু করেন। দুই ছেলে ও এক মেয়ে ছিল তাঁর। কিন্তু ১৯৮৮ সালের বন্যার পরপরই তাঁর স্বামী ও দুই সন্তান সড়ক দুর্ঘটনায় একই সময়ে মারা যান। ঠিক সেদিনই তাঁর বড় ছেলে রানা এসএসসি পাস করেছিলেন। রেজাল্ট নিয়ে বাসায় ফেরার পথে ওই দুর্ঘটনা ঘটে। তারপর থেকে তিনি এক মেয়েকে নিয়ে জীবনযাপন করেন। কিন্তু মেয়ের বিয়ের পর থেকে তিনি একাই জীবন কাটাচ্ছেন। থাকেন কারওয়ান বাজারের বিভিন্ন ফুটপাতে। কাঁদতে কাঁদতে আনোয়ারা বলছিলেন, ‘আমার কপাল মন্দ। স্বামী-সন্তান কাজ হারিয়ে এহন আমি রাস্তায়। আমার দেখার কেউ নাই।’
শুধু আনোয়ারা বেগম নয়,গত পাঁচদিনে রাজধানীর বিভিন্ন স্থানে অন্তত ২০জন ভিক্ষুকের সঙ্গে কথা হয় এই প্রতিবেদকের। ২০ জনের ভেতরে ১৮ জন ভিক্ষুক বলেছেন, আগের মতো ভিক্ষা না পাওয়ার কথা। এদের ভেতরে রফিকুল নামের এক ভিক্ষুক বলছিলেন, ‘এখন ভিক্ষা চাইলে সবাই দূরে সরে যেতে বলেন। কাছাকাছি গেলে কেমন করে কথা বলে। বকাবকি করে। মানুষ এখন ভিক্ষা দিতে চায় না।’
রাজধানীর রাসেল স্কয়ারে দাঁড়িয়ে শহিদুল নামের এক ভিক্ষুক বলছিলেন, ‘আমার মেয়ে নাসিমা ক্লাস এইটে পড়ে। কিন্তু এখন প্রাইভেট পড়া বন্ধ করে দিয়েছি। টাকা দিতে পারছি না। এখন আর কেউ ভিক্ষা দিতে চায় না। চাইলে কেমন করে তাকায়।’
গতকাল শুক্রবার দুপুর ১২টার সময় বাংলা মোটরের মোড়ে কথা হয় ছবিরা খাতুন নামের এক ভিক্ষুকের সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘সকাল থেকে ১০ টাকা দিছে। কাল (গতকাল) ২৯ টাকা ভিক্ষা পাইছিলাম। আজকাল আর কেউ গাড়ি কাচ খুলতে চায় না ছিনতাইকারীর ভয়ে। এই মোড়ে মাঝে মাঝেই গাড়ি থেকে মোবাইল-চেইন ছিনতাই হয়।’

মাসুদ রায়হান পলাশ