যেভাবে গ্রেপ্তার ঢাবি ছাত্রীর ‘ধর্ষক’
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ধর্ষণের ঘটনায় ‘সিরিয়াল র্যাপিস্ট’ মজনুকে আজ বুধবার ভোরে গ্রেপ্তার করেছে র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র্যাব)। তাঁকে গ্রেপ্তারের পর আজ বুধবার দুপুরে রাজধানীর কাওরানবাজারের মিডিয়া সেন্টারে সংবাদ সম্মেলনে র্যাবের মিডিয়া উইংয়ের পরিচালক সারোয়ার বিন কাশেম সংবাদ সম্মেলন করে ঘটনার বিস্তারিত জানান গণমাধ্যমকে।
সারোয়ার বিন কাশেম বলেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী গত ৫ জানুয়ারি কুর্মিটোলা বাসস্ট্যান্ডে নামেন তাঁর বান্ধবীর বাসায় যাওয়ার উদ্দেশে। এবং তিনি পথ ভুল করে সেখানে নামেন। পরবর্তী সময় তিনি যখন নির্জন পথ দিয়ে যাচ্ছিলেন, মজনু তাঁকে ফলো করতে করতে আসে। এরপর শিক্ষার্থীকে গলায় চাপ দিয়ে ঝাপটে ধরে একটি ঝোঁপের আড়ালে নিয়ে যায়। পরে ধর্ষণ করে।’
এ সময় ছাত্রীর মোবাইল ফোন, ব্যাগ ও পাওয়ার ব্যাংক নিয়ে কেটে পড়ে ধর্ষক। পরে ওই ছাত্রীকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ওয়ান স্টপ ক্রাইসিস সেন্টারে ভর্তি করা হয়। তাঁর শারীরিক অবস্থার উন্নতি হচ্ছে বলে জানিয়েছে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। এ ঘটনায় ক্যান্টনমেন্ট থানায় অজ্ঞাত পরিচয় ব্যক্তিকে আসামি করে মামলা দায়ের করা হয়।
ঘটনাটি একবারে ক্লু-লেস, কোনো তথ্য ছিল না উল্লেখ করে র্যাবের কর্মকর্তা বলেন, ‘কিছু ঘটনার সূত্র ধরে আমরা কাজ শুরু করি। প্রথমে গতকাল মঙ্গলবার খাইরুল নামের এক ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করতে সক্ষম হই। তাঁকে আমরা জিজ্ঞাসাবাদ করি। পরে তাঁর কাছ থেকে আমরা মোবাইল ফোনসেটটি উদ্ধার করি।’
‘খায়রুল একজন রিকশাচালক। তিনি জানান, অরুণা নামে তাঁর পরিচিত এক নারী তাঁকে ডিসপ্লে ঠিক করার জন্য মোবাইল ফোনটি দিয়েছেন। অরুণা একজন যৌনকর্মী। সেই সূত্রে অরুণাকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য নিয়ে আসে র্যাব।’
‘জিজ্ঞাসাবাদে অরুণা জানান, মজনু তাঁর কাছে ডিসপ্লে ভাঙা একটি মোবাইল বিক্রি করে। সেটি খায়রুলকে মেরামত করার জন্য দিয়েছিলেন। এরপর ভিকটিম ও অরুণার কাছ থেকে মজনুর চেহারার বর্ণনা নেওয়া হয়। দুজনের বর্ণনা মিলে গেলে আমরা নিশ্চিত হই সেই ব্যক্তিই ধর্ষক’, যোগ করেন সারোয়ার বিন কাসেম।
র্যাব কর্মকর্তা বলেন, ‘ধর্ষণের সময় মজনু ভিকটিমকে ঘুষি, চড় ও গলাটিপে ধরেছিল। ভিকটিম এই ঘটনায় পুরোপুরি বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছিলেন এবং কয়েকবার চেতনা হারান। ভিকটিমের যখন চেতনা ফিরে আসে তখন তিনি মজনুর কাছ থেকে নিজেকে ছাড়িয়ে নিয়ে, রাস্তার অপরপ্রান্তে বাড়ি যাওয়ার চেষ্টা করেন এবং সক্ষম হন।’
মজনু এরপর মোবাইল, ব্যাগ ও পাওয়ার ব্যাংক নিয়ে চলে যায় টুপিচোলায় অরুণা নামের এক যৌনকর্মীর কাছে। সে মোবাইল ফোনটি দেড় হাজার টাকা দাম হাঁকায়। পরে অরুণার কাছে ৫০০ টাকায় মোবাইল ফোনটি বিক্রি করে। এর মধ্যে অরুণা তাকে নগদ ৪০০ টাকা দেন। বাকি ১০০ টাকা পরে দিবেন বলে জানান।
সেখান থেকে মজনু বিমানবন্দর স্টেশনে চলে যায়। তারপর রাতেই ট্রেনে করে চলে যায় নরসিংদী। সেখানে রাত্রীযাপন করে সোমবার সে ঢাকায় ফিরে আসে।
অরুণা আর খাইরুলের বক্তব্যের সূত্র ধরে র্যাব মজনুকে ধরার জন্য মাঠে নামে, তদন্ত শুরু হয়। গতকাল মঙ্গলবার সারা দিন মজনু বনানী রেলস্টেশনে ছিল। কড়া নজরদারিতে রেখে আজ ভোর ৪টা ৫০ মিনিটে তাকে শ্যাওড়া রেলক্রসিং এলাকার বস্তি থেকে গ্রেপ্তার করা হয় বলে জানান র্যাবের মিডিয়া পরিচালক।
মজনুর পরিচয় দিতে গিয়ে র্যাব জানায়, তার বাড়ি নোয়াখালীর হাতিয়ায়। অনেক আগেই সে বাড়ি ছাড়ে। ঢাকায় সে রাস্তাতেই থাকত, মূলত মাদকাসক্ত। ১২ বছর আগে ট্রেন থেকে পড়ে গিয়ে তার দাঁত ভেঙে যায়।
মজনু নিরক্ষর ও দিনমজুর। এর পাশাপাশি ছিনতাই, রাহাজানি ও অন্যান্য চুরির মতো কাজ করত। মজনুকে একজন ‘সিরিয়াল রেপিস্ট’ অ্যাখ্যা দিয়ে র্যাব জানায়, বিভিন্ন সময় প্রতিবন্ধী ও ভিক্ষুক নারীদেরও সে ধর্ষণ করেছে।
র্যাবের ভাষ্যমতে, মজনু ১০ বছর আগে ঢাকায় আসে। সে বিবাহিত ছিল। একসময় তার স্ত্রী মারা যান। মূলত এর পরই সে বিভিন্ন ধরনের অপকর্মে জড়িয়ে পড়ে। তার বাবা নেই, মা জীবিত রয়েছেন। বাড়ির সঙ্গে কোনো যোগাযোগ নেই।

নিজস্ব প্রতিবেদক