চেয়ারম্যান এত ক্ষমতা কোথায় পেলেন : হাইকোর্ট
‘চেয়ারম্যান সাহেব এত ক্ষমতা কোথায় পেলেন? নিজে এই মারপিট করার এখতিয়ার কোথায় পেলেন? চেয়ারম্যান কি এতই ক্ষমতাধর যে আইন হাতে তুলে নেবেন?’
আজ বুধবার বিচারপতি গোবিন্দ চন্দ্র ঠাকুর ও বিচারপতি এ কে এম সাহিদুল হকের হাইকোর্ট বেঞ্চ লক্ষ্মীপুরের কমলনগর উপজেলার চর মার্টিন ইউনিয়নের চেয়ারম্যান ইউসুফ আলীর উদ্দেশে এসব কথা বলেন। এ সময় কমলনগর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) অকুল কুমার বিশ্বাস উপস্থিত ছিলেন।
চেয়ারম্যানের উদ্দেশে আদালত বলেন, ‘বিষয়টি সহজে ছাড়া হবে না। চেয়ারম্যান হয়ে ফতোয়ার নামে শাস্তি দিয়ে ফৌজদারি অপরাধ করেছেন, তা আমরা সহজে মেনে নিতে পারছি না। এ জন্য তাঁকে পুনরায় আদালতে আসতে হবে।’ চেয়ারম্যান ও ওসিকে আগামী ৯ মার্চ আবারও আদালতে হাজির হওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়।
একই সঙ্গে ১৪ ফেব্রুয়ারি থেকে ২০ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত চেয়ারম্যান দাপ্তরিক দায়িত্ব পালন করেছেন কি না, সে বিষয়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাকে প্রতিবেদন দিতে বলা হয়। পাশাপাশি লক্ষ্মীপুরের বিচারিক আদালত থেকে ওই চেয়ারম্যানের নেওয়া জামিনের নথিও তলব করা হয়েছে।
গত ২০ ফেব্রুয়ারি লক্ষ্মীপুরের বিচারিক হাকিম আদালত থেকে নেওয়া জামিন আবেদনে ১৪ ফেব্রুয়ারি হাইকোর্টের দেওয়া রুলের বিষয়টি উল্লেখ করা হয়েছিল কি না সে বিষয়ে সংশ্লিষ্টদের প্রতিবেদন দিতেও বলা হয়।
আদালতে এ বিষয়ে শুনানিতে অংশ নেন আইনজীবী এস এম রেজাউল করিম। চেয়ারম্যানের পক্ষে শুনানি করেন আবদুর রব চৌধুরী ও ওসির পক্ষে শুনানি করেন মোহাম্মদ ইব্রাহিম খলিল সোহেল। আদালতে ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল এ এস এম নাজমুল হকও উপস্থিত ছিলেন।
গত ১৪ ফেব্রুয়ারি লক্ষ্মীপুর জেলার কমলনগর উপজেলার চর মার্টিন ইউনিয়নের গ্রাম্য সালিসে ফতোয়ার নামে বিচারবহির্ভূত শাস্তি দেওয়ার ঘটনায় স্বতঃপ্রণোদিত রুল দেন হাইকোর্ট। গত বছর ৩১ ডিসেম্বর ফতোয়ার ঘটনা ঘটে।
অনলাইন সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত এ-সংক্রান্ত একটি প্রতিবেদন আইনি সেবাদানকারী বেসরকারি সংস্থা ব্লাস্টের আইন উপদেষ্টা ও পরিচালক এস এম রেজাউল করিম আদালতের নজরে আনেন। এরই পরিপ্রেক্ষিতে হাইকোর্ট স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে এ রুল জারি করেন। ফতোয়ার নামে গ্রাম্য সালিসে নারী ও পুরুষকে বিচারবহির্ভূত শাস্তি দেওয়া কেন অবৈধ ও আইনগত কর্তৃত্ববহির্ভূত ঘোষণা করা হবে না, তা জানতে চাওয়া হয় রুলে।
পাশাপাশি শাস্তি প্রদানকারী ওই চেয়ারম্যানের বিরুদ্ধে কেন আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে না এবং লক্ষ্মীপুর থানার ওসির বিরুদ্ধে দায়িত্বে অবহেলার কারণে কেন আইনগত পদক্ষেপ নেওয়া হবে না, রুলে তাও জানতে চাওয়া হয়।
স্বরাষ্ট্রসচিব, লক্ষ্মীপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা এবং চর মার্টিন ইউনিয়নের চেয়ারম্যানসহ আটজনকে চার সপ্তাহের মধ্যে রুলের জবাব দিতে বলা হয়েছিল।
ফতোয়ার নামে বিচারবহির্ভূত সহিংসতার শিকার নারী ও পুরুষের যথাযথ নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে লক্ষ্মীপুরের পুলিশ সুপারকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল।
পাশাপাশি ওই দিন আদালত ঘটনার সঙ্গে জড়িত চেয়ারম্যান ইউসুফ আলী ও লক্ষ্মীপুর থানার ওসি অকুল কুমার বিশ্বাসকে আদালতে উপস্থিত হয়ে ব্যাখ্যা দেওয়ারও নির্দেশ দিয়েছিলেন।
সেই নির্দেশ অনুযায়ী আজ আদালতে হাজির হয়ে দুজনই ভুল স্বীকার করে নিঃশর্ত ক্ষমা প্রার্থনার পাশাপাশি আইনজীবীর মাধ্যমে ব্যক্তিগত হাজিরা থেকেও অব্যাহতি চান।
এ সময় আদালত আইনজীবীর কাছে জানতে চান, কবে, কোন আদালত থেকে চেয়ারম্যন জামিন নিয়েছেন এবং জামিন আবেদনে রুলের বিষয়টি উল্লেখ করা হয়েছিল কি না।
আইনজীবী রেজাউল করিম বলেন, ‘আজকে চর মার্টিন ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ও কমলনগর থানার ওসি ভুল স্বীকার করে ক্ষমা প্রার্থনা করেছিলেন। আদালত বলেছেন, এটিকে হালকাভাবে নেওয়ার সুযোগ নেই। এখানে ফৌজদারি অপরাধ হয়েছে। সুতরাং এ দুজনের ব্যক্তিগত হাজিরা থেকে অব্যাহতি চেয়ে করা আবেদন গ্রহণ করেননি।’

নিজস্ব প্রতিবেদক