‘আগে এই এলাকা থেকে মাছ যেত, এখন মানুষ যায়’
বদলে যাচ্ছে পৃথিবীর জলবায়ু। পৃথিবীর তাপমাত্রা ক্রমেই বেড়ে যাওয়ায় বাংলাদেশের উপকূলীয় এলাকা স্থায়ীভাবে তলিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা করছেন বিশেষজ্ঞরা। ২০০৯ সালে আইলার আঘাতে লণ্ডভণ্ড হয়ে যায় দেশের পুরো উপকূলভাগ। সে ক্ষতি কাটিয়ে ওঠা তো দূরের কথা, যত দিন যাচ্ছে ততই স্পষ্ট হচ্ছে জলবায়ুর বিরূপ প্রভাব।
জলবায়ুর প্রভাবে মানুষের জীবন যে কতটা বিপন্ন হতে পারে তা বোঝা যায় দেশের দক্ষিণাঞ্চলের উপকূলীয় এলাকায় গেলে। কৃষিজমিতে লবণাক্ততা, মিঠাপানির অভাব, প্রচণ্ড খরা আর যখন তখন নেমে আসে অবিরাম ধারায় বর্ষা। এমনই বৈরী আবহাওয়ার সঙ্গে নিত্য বসবাস এই এলাকার লাখো মানুষের। ধনী দেশগুলোর বিলিয়ন টন কার্বন ডাই-অক্সাইড নির্গমনের ফল বইতে হচ্ছে বাংলাদেশসহ আশপাশের এলাকার উপকূলীয় অধিবাসীদের। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শিল্পায়নের গতির সঙ্গে বায়ুমণ্ডল দখল করে নিচ্ছে কার্বন ডাই-অক্সাইড। এতে ক্রমেই উত্তপ্ত হয়ে উঠছে পৃথিবী।
বিপর্যস্ত জলবায়ুর ক্ষত বয়ে বেড়াচ্ছে উপকূলীয় এলাকার বাসিন্দারা। ভঙ্গুর অবকাঠামো আবার কৃষিজমিতেও ফসল নেই। বিরান হয়ে যাচ্ছে মাইলের পর মাইল ফসলি জমি। কর্ম নেই, ফলে বসতভিটা ছাড়ছেন স্থানীয়রা।
এ বিষয়ে স্থানীয় সমাজকর্মী আবদুর রহমান আকাশ এনটিভিকে বলেন, ‘আগে এই অঞ্চল থেকে মাছ যেত বাংলাদেশের বিভিন্ন জায়গায়। এখন এই অঞ্চল থেকে মানুষ যায় বিভিন্ন জায়গায় কাজের সন্ধানে। কেউ ভাটায় যায়। আপনারা মাঝে মাঝে দেখেছেন ভাটায় যাওয়ার পর পায়ে শিকল দিয়ে বেঁধে রেখেছে। কাজ না শেষ করে আসতে দেবে না। এখন মানুষ ভাটায় যায়। এখান থেকে অন্য জায়গায় চলে গেছে। অনেক মানুষ ডাইভার্ট হয়ে গেছে এই অঞ্চল থেকে।’
বাংলাদেশের মানচিত্রে উপকূলীয় অংশের ছবি দেখিয়ে নদী বিশেষজ্ঞ আইনুন নিশাত বলেন, একটা লাইন যদি টানি যশোর, গোপালগঞ্জ থেকে চাঁদপুর হয়ে ফেনী। তাহলে এই অংশটা সমুদ্রের অংশ হবে। কিন্তু এখানে আমাদের উপকূলীয় বাঁধ থাকার কারণে ... এই পুরো জায়গাটায় কিন্তু আমাদের পাঁচ মিটার উঁচু বাঁধ আছে। অর্থাৎ এলাকাটা লবণাক্ত হবে, সমুদ্রটা ঢুকে যাবে, কিন্তু আমরা ডুবব না- কারণ আমার বাঁধ আছে। কিন্তু ভয় বেশি হচ্ছে জলোচ্ছ্বাস থেকে। সাত মিটার, আট মিটার উঁচু জলোচ্ছ্বাস আসছে।’
উপকূলের যে বাসিন্দারা এখনো রয়ে গেছে, তারাও ভুগছে নানামুখী সমস্যায়। এদের একজন শ্যামনগরের গাবুরা গ্রামের কৃষক আবুল হোসেন মোল্লা বলেন, ‘আমার বাড়ি বহু ফলগাছ ছিল। খুব নামকরা আমগাছ, বিভিন্ন রকম গাছপালা ছিল। আইলায় সব তো শেষ হয়ে গেল। শেষ হয়ি যাওয়ার পরে তো এই কয় বছর ধরে চেষ্টা করতিছি তা হয় না। চারা এনে লাগাই, আবার মরে যায়।’
এমন অবস্থায় মার খাচ্ছে সরকারি-বেসরকারি নানা প্রচেষ্টা। সাতক্ষীরার শ্যামনগর থানা নির্বাহী কর্মকর্তা আবু সায়েদ মো. মনজুর আলম জানান, দাতাদের সহায়তায় বিভিন্ন কর্মসূচি চালু আছে সেখানে। তিনি বলেন, ‘আইলার পরে দুর্যোগের পরে কিছু মানুষ তাদের কর্মসৃজন যে বিষয়গুলো সেগুলো তারা হারিয়ে ফেলেছে এবং তারা কিন্তু এখান থেকে মাইগ্রেশনে যাচ্ছে এবং আমরা দেখেছি যে অনেক পুরুষ বিশেষ করে পুরুষরা, তারা বাইরে ইটের ভাটাতে কাজ করতে যায়, রিকশা চালাতে যায়। তো এটা নিয়ে সরকার চিন্তিত। ’
বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, আইলা যা ক্ষতি করে গেছে তা পূরণ হওয়ার নয়, এখন ওই এলাকার মানুষদের পুনর্বাসনসহ অন্যান্য কর্মসূচি নিয়ে এগোতে হবে।
কৃষি অর্থনীতি বিশেষজ্ঞ ড. আসাদুজ্জামান বলেন, ‘যাঁরা এই ছয়-সাত বছর সেখান থেকে জনগণের প্রতিনিধি বলে নিজেদের দাবি করে পার্লামেন্টে এসেছেন, তাঁরা কী করেছেন? কাজটা তো তাঁদের। তাঁরা যে পার্টিরই হোক না কেন, সরকারের কাছে দাবি করেননি কেন যে এইখানে কিছু করা হোক। আমি যাদের প্রতিনিধি হিসেবে এসেছি তারা মারা যাচ্ছে। লিটারেলি তারা মারা যাচ্ছে। সে ক্ষেত্রে তাদের দায়িত্ব ছিল সবচেয়ে বেশি। আঙুল তুলব তাঁদের দিকে, যাঁরা সেখানকার এমপি ও জনপ্রতিনিধি।’
ছয় বছরেও আইলার ক্ষতচিহ্ণ মুছে যায়নি ক্ষতিগ্রস্ত গ্রামগুলো থেকে। প্রকৃতির এই বিপর্যয় কাটিয়ে উঠতে এলাকাবাসীর নিরন্তর চেষ্টা বারবার ব্যর্থ হচ্ছে। যতই দিন যাবে, আইলার বিরূপ প্রতিক্রিয়া আরো স্পষ্ট হবে বলে আশঙ্কা করছে এলাকাবাসী।

দিদার চৌধুরী