এবার নিজামীর ‘সিরিয়াল’
মানবতাবিরোধী অপরাধে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাউদ্দিন কাদের (সাকা) চৌধুরীর আপিলের নিষ্পত্তি করে মৃত্যুদণ্ড বহাল রাখেন সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ। আপিল বিভাগের এটি ছিল পঞ্চম রায়। ট্রাইব্যুনালে মৃত্যুদণ্ডাদেশ পাওয়া ব্যক্তিদের মধ্যে এবার ক্রমানুপাতে আপিল বিভাগে নিষ্পত্তির অপেক্ষায় রয়েছে জামায়াতের আমির মতিউর রহমান নিজামী। সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরীর রায়ের পর আপিল বিভাগে তাঁর মামলাটি শুনানির ক্রম অনুসারে (সিরিয়াল) প্রথমে রয়েছে। তবে এ জন্য আপিল বিভাগের কার্যতালিকায় আসা পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে।
মতিউর রহমান নিজামী ছাড়াও আপিল বিভাগে পর্যায়ক্রমে যাঁদের মামলা নিষ্পত্তির অপেক্ষায় রয়েছে, তাঁরা হলেন—ব্রাহ্মণবাড়িয়ার জামায়াতের সাবেক রুকন মোবারক হোসেন, জাতীয় পার্টির সাবেক মন্ত্রী সৈয়দ মোহাম্মদ কায়সার, জামায়াত নেতা মীর কাসেম আলী, জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল এ টি এম আজহারুল ইসলাম ও জামায়াতের নায়েবে আমির মাওলানা আবদুস সোবহান। ট্রাইব্যুনালের রায়ের পর আসামিদের আপিল অনুযায়ী পর্যায়ক্রমে এ তালিকা রয়েছে। তবে আপিল বিভাগ ইচ্ছা করলে যেকোনো আসামির মামলা আগে শুনানি করতে পারেন।
এ বিষয়ে অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম এনটিভি অনলাইনকে বলেন, ‘ট্রাইব্যুনালে দণ্ডপ্রাপ্তদের মধ্যে যাঁরা আপিল করেছেন, তাঁদের মধ্যে মতিউর রহমান নিজামী এখন সিরিয়ালে রয়েছেন। আদালতের কার্যতালিকায় আসার পর এ মামলার শুনানি শুরু হবে।’ তিনি বলেন, ‘তবে আদালত ইচ্ছা করলে অন্য আসামিদের শুনানিও আগে করতে পারবেন।’
মতিউর রহমান নিজামীর মামলা : জামায়াতে ইসলামীর আমির মতিউর রহমান নিজামীর বিরুদ্ধে মোট ১৬টি অভিযোগ দাখিল করে রাষ্ট্রপক্ষ। এর মধ্যে আটটি প্রমাণিত হয়। ২০১৪ সালের ২৯ অক্টোবর চারটি অপরাধে তাঁকে মৃত্যুদণ্ড ও চারটিতে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১। বাকি আটটি অভিযোগ থেকে তাঁকে খালাস দেওয়া হয়।
পরে এ রায়ের বিরুদ্ধে ২০১৪ সালের নভেম্বরের শেষের দিকে সুপ্রিম কোর্টে আপিল দায়ের করেন নিজামী।
এর আগে ২০১০ সালের ২৯ জুন ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাতের মামলায় নিজামীকে গ্রেপ্তার করা হয়। একই বছরের ২ আগস্ট মানবতাবিরোধী অপরাধে তাঁকে গ্রেপ্তার দেখানো হয়। ২০১২ সালের ১১ ডিসেম্বর তাঁর বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের ১৬টি অভিযোগ আনা হয়।
মোবারক হোসেন : ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আওয়ামী লীগের বহিষ্কৃত নেতা ও জামায়াতের সাবেক রুকন মোবারক হোসেনকে ২০১৪ সালের ২৪ নভেম্বর মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়।
একাত্তরে মোবারক ও তাঁর সহযোগীদের হাতে নিহত আবদুল খালেকের মেয়ে খোদেজা বেগম ২০০৯ সালের ৩ মে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার বিচারিক হাকিম আদালতে একটি মামলা করেন। ওই বছরের ১৩ মে মোবারক হাইকোর্ট থেকে ছয় মাসের আগাম জামিন নেন। এর পর কয়েক দফা জামিনের মেয়াদ বাড়ানো হয়।
২০১২ সালের ৬ জুন মোবারকের বিরুদ্ধে যুদ্ধাপরাধের মামলাটি ট্রাইব্যুনালে আসে। ওই বছরের ১৬ জুলাই থেকে ২০১৩ সালের ২২ জানুয়ারি পর্যন্ত তাঁর বিরুদ্ধে তদন্ত চালায় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের তদন্ত সংস্থা। ২০১৩ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারি মোবারকের বিরুদ্ধে ট্রাইব্যুনালে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দাখিল করা হয় এবং ১২ মার্চ অভিযোগ আমলে নিয়ে জামিন বাতিল করে তাঁকে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন ট্রাইব্যুনাল।
এর পর ২০১৩ সালের ২৩ এপ্রিল যুদ্ধাপরাধের পাঁচ ঘটনায় অভিযোগ গঠনের মধ্য দিয়ে মোবারকের বিচার শুরু হয়। ২০ মে মোবারক হোসেনের বিরুদ্ধে প্রসিকিউশনের সাক্ষীদের সাক্ষ্যগ্রহণ শুরু হয়। প্রসিকিউশনের মোট ১২ সাক্ষী এ মামলায় সাক্ষ্য দেন। পরে ২০১৪ সালের ২৪ নভেম্বর তাঁকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়। ওই বছরের ডিসেম্বরে তিনি আপিল দায়ের করেন, যা শুনানির জন্য অপেক্ষমাণ রয়েছে।
সৈয়দ মোহাম্মদ কায়সার : জাতীয় পার্টির সাবেক প্রতিমন্ত্রী সাবেক এমপি সৈয়দ মোহাম্মদ কায়সারকে ২০১৪ সালের ২৩ ডিসেম্বর মৃত্যুদণ্ড দেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল।
এর আগে ২০১৩ সালের ১৫ মে কায়সারের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেন ট্রাইব্যুনাল। ওই রাতেই গ্রেপ্তার করা হয় মুসলিম লীগের এই সাবেক নেতাকে। এর পর তাঁকে রাজধানীর অ্যাপোলো হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। ২১ মে পুলিশ কায়সারকে হাসপাতাল থেকে ট্রাইব্যুনালে হাজির করলে বিচারক তাঁকে কারাগারে পাঠান।
প্রসিকিউশনের তদন্ত কর্মকর্তা মনোয়ারা বেগম ২০১২ সালের ২৮ মার্চ থেকে গত বছরের ২১ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত কায়সারের বিরুদ্ধে অভিযোগের তদন্ত চলে। এর পর ১০ নভেম্বর ট্রাইব্যুনালে কায়সারের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দাখিল করে প্রসিকিউশন, যেখানে যুদ্ধাপরাধের ১৮টি অভিযোগ আনা হয়। এর মধ্যে ১৬টি ঘটনায় অভিযোগ গঠনের মধ্য দিয়ে ২০১৪ সালের ২ ফেব্রুয়ারি সৈয়দ কায়সারের বিচার শুরু করেন ট্রাইব্যুনাল। যার মধ্যে গণহত্যার একটি, হত্যা, নির্যাতন, অগ্নিসংযোগ ও লুটপাটের ১৩টি এবং ধর্ষণের দুটি অভিযোগ রয়েছে।
দুই পক্ষের যুক্তিতর্ক উপস্থাপন শেষে ২০১৪ সালের ২০ আগস্ট মামলাটি রায়ের জন্য অপেক্ষমাণ (সিএভি) রাখেন ট্রাইব্যুনাল। এর পর ২০১৪ সালের ২৩ ডিসেম্বর তাঁকে পাঁচটি অভিযোগে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়। এ রায়ের বিরুদ্ধে তাঁর করা আপিল শুনানির অপেক্ষায় রয়েছে।
মীর কাসেম আলী : জামায়াতের কর্মপরিষদ সদস্য মীর কাসেম আলীকে ২০১৪ সালের ২ নভেম্বর মৃত্যুদণ্ড দেন আন্তর্জাতিক আপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২।
২০১৩ সালের ১৮ নভেম্বর মীর কাসেম আলীর বিরুদ্ধে রাষ্ট্রপক্ষের সূচনা বক্তব্য উপস্থাপনের মধ্য দিয়ে বিচার প্রক্রিয়া শুরু হয়। ১১ ডিসেম্বর মামলায় সাক্ষ্যগ্রহণ শুরু হয়। এ মামলায় রাষ্ট্রপক্ষে মোট ২৪ জন সাক্ষ্য দিয়েছেন। অন্যদিকে আসামিপক্ষে সাক্ষ্য দিয়েছেন মাত্র তিনজন। ৪ মে উভয় পক্ষের যুক্তিতর্ক উপস্থাপনের মধ্য দিয়ে মামলার বিচারিক কাজ শেষ হয়।
এর আগে ২০১৩ সালের ৬ মে মীর কাসেম আলীর বিরুদ্ধে হত্যা, গণহত্যা, নারী নির্যাতন, অগ্নিসংযোগ, লুণ্ঠনসহ মানবতাবিরোধী অপরাধের ১৪টি অভিযোগে তদন্ত চূড়ান্ত করে তদন্ত সংস্থা প্রসিকিউশনে জমা দেয়। ১৬ মে প্রসিকিউশন টিম ১৪টি অভিযোগে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ ট্রাইব্যুনালে দাখিল করেন। পরবর্তী সময়ে ২৬ মে তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগ আমলে নেন ট্রাইব্যুনাল।
একই বছরের ১৭ জুন মীর কাসেম আলীর বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেন ট্রাইব্যুনাল-১। ওই দিন বিকেলেই মতিঝিলের দৈনিক নয়া দিগন্ত কার্যালয় (দিগন্ত মিডিয়া করপোরেশন) থেকে তাঁকে গ্রেপ্তার করে ট্রাইব্যুনালে হাজির করা হয়। পরে ট্রাইব্যুনাল তাঁকে কারাগারে পাঠানোর আদেশ দেন।
ওই বছরের ৫ সেপ্টেম্বর মীর কাসেম আলীর বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করেন ট্রাইব্যুনাল-১। পরে ৩০ সেপ্টেম্বর মামলাটি ট্রাইব্যুনাল-২-এ স্থানান্তর করা হয়। মামলাটি আপিলের শুনানির অপেক্ষায় রয়েছে।
এ টি এম আজহারুল ইসলাম : জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল এ টি এম আজহারুল ইসলামকে ২০১৪ সালের ৩০ ডিসেম্বর মৃত্যুদণ্ড দেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল।
এর আগে ২০১২ সালের ১৫ এপ্রিল এ টি এম আজহারের যুদ্ধাপরাধের তদন্ত শুরু হয়। ওই বছর ২২ আগস্ট মগবাজারের বাসা থেকে তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়। তদন্ত শেষে প্রসিকিউশন ২০১৩ সালের ১৮ জুলাই আজহারের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দাখিল করেন।
একই বছরের ১২ নভেম্বর ছয়টি ঘটনায় অভিযোগ গঠনের মধ্য দিয়ে আজহারের বিচার শুরু করেন ট্রাইব্যুনাল। মামলাটির বিচার কার্যক্রম শেষে ২০১৪ সালের ১৮ সেপ্টেম্বর থেকে রায়ের জন্য অপেক্ষমাণ রাখা হয়। পরে ২০১৪ সালের ৩০ ডিসেম্বর তিনটি অভিযোগে তাঁকে মৃত্যুদণ্ডাদেশ ও দুটি অভিযোগে ৩০ বছর কারাদণ্ড দেওয়া হয়।
এ রায়ের বিরুদ্ধে ২০১৫ সালের জানুয়ারি মাসে আপিল করেন আজহারুল ইসলাম। এ মামলাও আপিলের শুনানির জন্য অপেক্ষমাণ রয়েছে।
আবদুস সোবহান : জামায়াতে ইসলামীর নায়েবে আমির মাওলানা আবদুস সোবহানকে ২০১৫ সালের ১৮ ফেব্রুয়ারি মৃত্যুদণ্ডাদেশ দেওয়া হয়।
২০১৩ সালের ১৯ সেপ্টেম্বর সুবহানের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ আমলে নেন ট্রাইব্যুনাল। ওই বছরের ৩১ ডিসেম্বর তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করা হয়। মামলায় ৩১ জনের সাক্ষ্যগ্রহণ করা হয়। এর আগে ২০১২ সালের ২০ সেপ্টেম্বর ট্রাইব্যুনালের আদেশে তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়। একই বছরের ২৩ সেপ্টেম্বর তাঁকে মানবতাবিরোধী অপরাধে আটক দেখানো হয়। তাঁর বিরুদ্ধে আনীত নয়টি অভিযোগের মধ্যে ছয়টি প্রমাণিত হয়। এর মধ্যে তিনটি অভিযোগে তাঁকে মৃত্যুদণ্ডাদেশ দেওয়া হয়। দুটি অভিযোগে আমৃত্যু কারাদণ্ড ও একটি অভিযোগে তাঁকে পাঁচ বছর কারাদণ্ড দেওয়া হয়।
রায়ের বিরুদ্ধে সুবহান ২০১৫ সালের মার্চে খালাস চেয়ে আপিল দায়ের করেন। এ আপিলটিও শুনানির অপেক্ষমাণ রয়েছে।

জাকের হোসেন