নূর হোসেনের রিমান্ড দাবিতে মানববন্ধন

নারায়ণগঞ্জের আলোচিত সাত খুনের প্রধান আসামি নূর হোসেনকে রিমান্ডে নিয়ে এ হত্যাকাণ্ডের আসল হোতাদের নাম বের করা এবং তাঁর ফাঁসির দাবি জানিয়েছেন নিহতদের স্বজনরা।
আজ রোববার দুপুরে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে সিদ্ধিরগঞ্জের মৌচাক এলাকায় এক মানববন্ধনে তাঁরা এই দাবি জানান।
ঘণ্টাব্যাপী এই মানববন্ধনে বক্তব্য দেন নিহত প্যানেল মেয়র নজরুল ইসলামের স্ত্রী সেলিনা ইসলাম বিউটি, ভাই আবদুস সালাম, নিহত তাজুলের বাবা আবুল খায়ের প্রমুখ।
নূর হোসেনকে দেশে ফিরিয়ে আনার জন্য প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে সেলিনা ইসলাম বিউটি বলেন, ‘আমরা চাই আসল রহস্য বেরিয়ে আসুক। নূর হোসেনকে যে কোনো উপায়ে রিমান্ডে নেওয়া হোক। কারণ ইসমাইল হত্যা মামলাতেও তাঁকে কিন্তু রিমান্ডে নেওয়া যায়। যদি প্রধানমন্ত্রী চান তাহলে অবশ্যই রিমান্ডে নিতে পারবেন। এই নারায়ণগঞ্জসহ সারা পৃথিবীর মানুষ এই হত্যার বিচারের দিকে তাকিয়ে আছে। আমরা সঠিক বিচার চাই। আমরা চাই, নূর হোসেনকে রিমান্ডে নিয়ে আসল হত্যাকারীদের নাম বের হয়ে আসুক।’
বিউটি বলেন, মামলায় আমি যে পাঁচজনের নাম দিয়েছিলাম অভিযোগপত্র থেকে তাদের নাম বাদ দেওয়া হয়েছে। তাদের ধরতে তাদের বাড়িতে কোনো পুলিশ আসেনি। এই মামলার শুরু থেকেই তাদের প্রতি সহানুভূতি দেখানো হচ্ছে। আলী আহমদকে ধরা গেলে ইয়াসিন, রাজু ও ইকবালকে কেনো ধরা গেল না। তারা তো দেশে ছিল। ওদের একজনকে অন্তত ধরে রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা উচিত ছিল। ওদের জিজ্ঞাসাবাদ না করে অভিযোগপত্র থেকে কীভাবে বাদ দেওয়া হয়। আজ ইয়াসিন আমাদের হুমকি দিয়েছে আমরা যেন আজ মানববন্ধন না করি। তাঁর বাড়িতে এখনো এক থেকে দেড়শ ক্যাডার রয়েছে।’
নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন জানিয়ে বিউটি আরো বলেন, ‘পুলিশের সাহায্য চেয়েছি। এতদিন সাহায্য পেয়েছি। নূর হোসেন আসার পর অন্তত কয়েকদিনের জন্য পুলিশ চেয়েছিলাম। কিন্তু এখন আর পুলিশ দেওয়া যাবে না বলে জানানো হয়েছে। কোনো সমস্যা হলে জানাতে বলেছে।’
নিহত নজরুল ইসলামের ভাই আবদুস সালাম বলেন, ‘এজাহারভুক্ত আসামিরা এলাকায় চাঁদাবাজি করবে বলেই আমার ভাইকে ওরা পরিকল্পনা করে মেরেছে। ওরা যদি ভালো হতো তাহলে আজ আমাদের শান্তিপূর্ণ মানববন্ধন করতে বাধা দিত না। কিন্তু অভিযোগপত্র থেকে নাম বাদ পড়ারা এক থেকে দেড়শ ক্যাডার পাঠিয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর কাছে আমাদের আবেদন অভিযোগপত্রে তাদের নাম অন্তর্ভুক্ত করা। তারা যদি অন্যায় না করে তাহলে আইনের মাধ্যমে তারা ছাড়া পেয়ে যাবে।’
নূর হোসেনের রিমান্ডের দাবি জানিয়ে আবদুস সালাম বলেন, ‘আর আমরা চাই নূর হোসেনকে রিমান্ডে আনলে রাঘব বোয়ালদের নাম বেরিয়ে আসবে। এর পেছনে কারা জড়িত আছে, কারা অর্থের জোগান দিয়েছে, কারা পরামর্শ দিয়েছে, কারা দেশ থেকে বাইরে যেতে সহযোগিতা করেছে সবার নাম বের হয়ে আসবে। যদি প্রধানমন্ত্রী মন থেকে চান নারায়ণগঞ্জে কোনো সন্ত্রাসী বাহিনী রাখবেন না, তাহলে শুধু নারায়ণগঞ্জ নয় পুরো বাংলাদেশ শান্তিতে থাকবে।’
নিহত তাজুল ইসলামের বাবা আবুল খায়ের বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রীও স্বজনহারা। তিনি স্বজনহারার বেদনা বোঝেন। বিচারটি সুষ্ঠু ও সুন্দর করার জন্য নূর হোসেনকে রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদের ব্যবস্থা যদি করে দেন তাহলে তাঁকে সারা দেশের মানুষ আরো ভালোবাসবে এবং সন্তুষ্ট থাকবে।’
নূর হোসেনের বাহিনীর কারণে নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন বলে জানিয়ে আবুল খায়ের বলেন, ‘দেশে আসার আগে থেকেই তার বাহিনী পরোক্ষভাবে হুমকি দিয়েছে। আমরা নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছি এ কারণে যে এখন যদি সুষ্ঠু বিচার না হয় তাহলে হয়তো আমাদের জীবনের হুমকি রয়েছে।’
নিহত স্বপনের ভাই রিপন বলেন, ‘সাত খুন মামলার অপরাধীদের যদি শাস্তি হয় তাহলে আমরা সুষ্ঠু বিচার পাব। তখন নিহতদের আত্মাও শান্তি পাবে। আর আমরা স্বজনহারারা নিজেদের সান্ত্বনা দিতে পারব। আমরা চাই, আইন একজন অপরাধীদের বিরুদ্ধে যেভাবে কাজ করে সেভাবেই তাদের বিরুদ্ধে কাজ করবে। ধারা সম্পর্কে তো আর আমাদের জানা নাই। আকাশে যত তাঁরা তার চেয়ে বেশি পুলিশের ধারা। এই ধারা অনুযায়ীই আমরা সুষ্ঠু বিচার চাই।’
উলফা নেতা অনুপ চেটিয়াকে ফেরত দেওয়ার একদিন পর গত বৃহস্পতিবার রাতে নূর হোসেনকে বাংলাদেশের কাছে হস্তান্তর করে ভারতের সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিএসএফ। বাংলাদেশে ফেরত আনার পর নূর হোসেনকে গত শুক্রবার ভোরে উত্তরায় র্যাব ১-এর কার্যালয়ে আনা হয়। সেখান থেকে কড়া নিরাপত্তার মধ্য দিয়ে তাঁকে নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লার গাবতলী এলাকার পুলিশ লাইনসে নেওয়া হয়। এরপর রিমান্ডে না দিয়ে সাত খুনের দুটি মামলাসহ মোট ১১টি মামলার পরোয়ানাভুক্ত এই আসামিকে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন নারায়ণগঞ্জ আদালত।
প্রসঙ্গত, ২০১৪ সালের ২৭ এপ্রিল ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ লিংক রোড থেকে অপহৃত হন নারায়ণগঞ্জের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী চন্দন সরকার, সিটি করপোরেশনের প্যানেল মেয়র নজরুল ইসলামসহ সাতজন। এরপর ৩০ এপ্রিল শীতলক্ষ্যা নদীতে ছয়জন ও পরের দিন আরো একজনের লাশ উদ্ধার করে পুলিশ।
সাতজনকে হত্যার ঘটনায় অভিযোগ ওঠে নূর হোসেনের বিরুদ্ধে। এ ঘটনার পর ৪ মে নজরুলের শ্বশুর অভিযোগ করেন, র্যাবকে টাকা দিয়ে এ হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটিয়েছেন শামীম ওসমানের ঘনিষ্ঠ নূর হোসেন।
এ ঘটনায় আইনজীবী চন্দন সরকারের জামাতা ডা. বিজয় কুমার অজ্ঞাত ব্যক্তিদের আসামি করে এবং নজরুল ইসলামের স্ত্রী সেলিনা ইসলাম বিউটি সিদ্ধিরগঞ্জ আওয়ামী লীগ নেতা নূর হোসেনকে প্রধান আসামি করে ফতুল্লা থানায় পৃথক দুটি মামলা করেন। ওই মামলায় র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়নের (র্যাব) সাবেক তিন কর্মকর্তা লেফটেন্যান্ট কর্নেল তারেক সাঈদ মোহাম্মদ, কমান্ডার এম এম রানা, মেজর আরিফসহ ১৮ র্যাব সদস্য এবং নূর হোসেনের সাত সহযোগী এখন কারাগারে। পলাতক আরো নয় আসামি।