প্রথম মহিলা সচিব আমার হাতে : প্রধানমন্ত্রী
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, তাঁর শাসনামলেই রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন পদে আসীন হয়েছেন নারীরা। তিনিই দেশে প্রথম নারী সচিব নিয়োগ দিয়েছেন।
আজ বুধবার রাজধানীর ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তনে বেগম রোকেয়ার জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে শেখ হাসিনা এ কথা বলেন।
প্রধানমন্ত্রী ১৯৯৬ সালের ক্ষমতায় থাকার সময়ের স্মৃতিচারণ করে বলেন, ‘দেখলাম, দেশে কোনো নারী সচিব নেই। তাদের গোনাই ধরা হতো না। প্রথম মহিলা সচিব আমার হাতে। প্রথম এসপি মহিলা, টিএনও হলো, মহিলা ওসি হলো। আমিই এসব নিয়োগ দিতে শুরু করলাম।’
‘আপনারা খেয়াল করে দেখুন, উচ্চ আদালতে কোনো মহিলা জজ ছিল না। প্রথম মহিলা জজ হাইকোর্ট ডিভিশনে, পরে অ্যাপিলেট ডিভিশনে। সেটাও আওয়ামী লীগেরই করা। বাংলাদেশ ব্যাংকের ডেপুটি গভর্নর পদে কোনো মহিলাকে দেওয়া যায়, সেটা কেউ ভাবতেই পারত না। সেখানেও আমরা পৌঁছে গেছি’, যোগ করেন প্রধানমন্ত্রী।
বাংলাদেশে নারীর ক্ষমতায়নের জন্য আওয়ামী লীগ সরকারের নেওয়া বিভিন্ন পদক্ষেপের কথা তুলে ধরে শেখ হাসিনা বলেন, ‘আমি চেয়েছিলাম তৃণমূল পর্যায় থেকে নেতৃত্ব গড়ে উঠুক। প্রথমেই সিদ্ধান্ত নিলাম, স্থানীয় সরকার নির্বাচনে মেয়েদের অংশগ্রহণ বাড়াতে হবে। সে জন্য মেয়েদের ৩০ শতাংশ কোটা সুনির্দিষ্ট করলাম। কিন্তু মেয়েরা দ্বারে দ্বারে গিয়ে ভোট চাইবে? এটা অনেকের কাছে গ্রহণযোগ্য ছিল না। অনেক বাধা এলো। অথচ ৪৫ হাজার মেয়ে সেই নির্বাচনে অংশ নিয়েছিল ১২ হাজার সিটের (আসন) জন্য। যারা বাধা দিয়েছিল, তারাই আবার কুপিবাতি বা পাটখড়িতে আগুন দিয়ে গ্রামে গ্রামে গিয়ে ওই মেয়েদের পক্ষে ভোট চাইলেন।’
শেখ হাসিনা বলেন, ‘একইভাবে আমরা মেয়েদের খেলাধুলার ব্যবস্থা করেছি। প্রথমবার যখন দেশে প্রমীলা ফুটবলের আয়োজনের চেষ্টা করা হয়, তখন অনেকের বাধার মুখে তা বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয়নি। তবে এখন সেসব বাধা কেটে গেছে।’
‘এখন আমাদের মেয়েরা ক্রিকেট খেলছে, ফুটবল খেলছে’, যোগ করেন প্রধানমন্ত্রী।
একইভাবে জাহাঙ্গীরনগর ও বাংলাদেশ প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে (বুয়েট) নারী উপাচার্য নিয়োগ করার কথা জানান শেখ হাসিনা। এ সময়ও অনেক বাধা এসেছে জানিয়ে তিনি বলেন, ‘এসব বিশ্ববিদ্যালয় মেয়েরা আরো ভালো চালাচ্ছে।’
বঙ্গবন্ধু সংরক্ষিত আসনের ব্যবস্থা করেন
নারী উন্নয়নে আওয়ামী লীগ সব সময়ই চেষ্টা করে আসছে জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘স্বাধীনতার পর বঙ্গবন্ধু পার্লামেন্টে রিজার্ভ সিটের (সংরক্ষিত আসন) ব্যবস্থা করেছিলেন। ’৭২-এর সংবিধানে মেয়েদের জন্য রিজার্ভ সিট ছিল। আওয়ামী লীগেও সরাসরি মেয়েদের নমিনেশন (মনোনয়ন) দেওয়া হতো।’
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘শুধু আমরা মেয়েদের যে বিভিন্ন জায়গায় অবস্থান নিশ্চিত করি নাই, সেই সঙ্গে ’৯৭/৯৮ সালের দিকে প্রথম নারী উন্নয়ন নীতিমালা প্রণয়ন করলাম। এর পর বিএনপি ক্ষমতায় এসে সেই নীতিমালায় কিছু পরিবর্তন আনল। পরে ২০১১ সালে আবার ক্ষমতায় এসে সেই নীতিমালায় কিছু গ্রহণযোগ্য পরিবর্তন এনে নতুন করে নীতিমালা করা হয়।’ এ সময় নারীদের জন্য মাতৃত্বকালীন ছুটির সময় বাড়ানো, সন্তানের পরিচয়ে মায়ের নামের ব্যবস্থা করাসহ নারী উন্নয়নে সরকারের নেওয়া বিভিন্ন পদক্ষেপের কথা তুলে ধরেন তিনি।
বেগম রোকেয়া সমাজের অচলায়তন ভেদ করে এগিয়ে এসেছিলেন জানিয়ে শেখ হাসিনা বলেন, তাঁর (রোকেয়া) প্রতিষ্ঠিত স্কুলের জন্য ছাত্রী সংগ্রহ করতে নানা বেগ পেতে হয়েছিল।
এ দেশের নারীসমাজ যেন প্রতিটি ক্ষেত্রে নিজ নিজ অবস্থান সৃষ্টি করার সুযোগ পায়, সে চেষ্টা করার সময়ও অনেক বাধা এসেছে বলে জানান প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, ‘বাধা যুগ যুগ ধরেই ছিল। কোনো জিনিসই সহজে অর্জন করা যায় না। রোকেয়া তাঁর লেখায় অনেক কিছু বলে গেছেন। যখন আমাদের চলার পথে বাধা পাই, তখন তাঁর লেখাগুলো প্রেরণা জোগায়। তিনি আমাদের পথ দেখিয়ে গেছেন।’
নারীদের জন্য ঋণসুবিধা
নারীদের জন্য এসএমই ফাউন্ডেশন থেকে কম সুদে ঋণের ব্যবস্থা, গ্রামের দরিদ্রদের জন্য বয়স্ক-ভাতা, বিধবা-ভাতা, স্বামী পরিত্যক্তা-ভাতা, মাতৃত্বকালীন-ভাতা, যে মা বুকের দুধ খাওয়ান তাঁর জন্য ভাতার ব্যবস্থা করার কথা জানান প্রধানমন্ত্রী। এ ছাড়া কর্মজীবী নারীদের জন্য হোস্টেল, গার্মেন্ট শ্রমিকদের জন্য হোস্টেল, মেয়েশিশুদের জন্য আলাদা ডায়াবেটিস হাসপাতাল, বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের জেন্ডার বাজেটিংয়ের ব্যবস্থা নেওয়ার কথাও জানান তিনি।
নারীর নিরাপত্তায় স্মার্টকার্ড
প্রধানমন্ত্রী জানান, বাংলাদেশের যেসব নারী বিদেশে যান, তাঁদের নিরাপত্তার জন্য স্মার্টকার্ড দেওয়া হয়, মোবাইল ফোন দেওয়া হয়; কোথায় কাজ করবে সব খোঁজখবর নেওয়া হয়। সব ধরনের প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। তাঁদের নিরাপত্তার বিষয়টি সবার আগে লক্ষ রাখা হয়।
নারীদের জন্য বিশেষ প্রশিক্ষণ
২৫টি ক্ষেত্রে সরকার পাইলট প্রকল্পের মাধ্যমে সারা দেশের নারীদের জন্য বিভিন্ন প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করছে বলে জানান শেখ হাসিনা। কোনো ভালো কাজ অনায়াসে হয় না—বেগম রোকেয়ার এ বক্তব্য উদ্ধৃত করে তিনি বলেন, নারীর জন্য নেওয়া সব কাজ করতে সরকারকেও নানা বাধাবিঘ্ন পার হতে হয়েছে। বাংলাদেশ আবার কোনো অন্ধকার যুগে প্রবেশ করুক, এটা তিনি চান না বলেও জানান প্রধানমন্ত্রী।
শুধু ইসলামেই নারীকে যথাযোগ্য মর্যাদা দেওয়া হয়েছে। সে জন্য কোনো অজুহাতে নারীদের কর্মক্ষেত্র থেকে দূরে রাখার কোনো সুযোগ নেই বলে মন্তব্য করেন প্রধানমন্ত্রী।
বক্তব্যের শুরুতে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, মুক্তিযুদ্ধে লাখো শহীদ ও যে নারীদের সম্ভ্রমের বিনিময়ে স্বাধীনতা এসেছে, তাঁদের স্মরণ করেন প্রধানমন্ত্রী। মুক্তিযুদ্ধের পর বীরাঙ্গনাদের বিয়ের কাবিননামায় বাবার নামের জায়গায় বঙ্গবন্ধুর নাম ব্যবহারের নির্দেশের কথা উল্লেখ করেন তিনি।
অনুষ্ঠানে তাঁতশিল্পের উন্নয়নে অবদান রাখায় ফ্যাশন ডিজাইনার বিবি রাসেল ও কবি তাইবুন নাহার রশীদকে (মরণোত্তর) বেগম রোকেয়া পদক দেওয়া হয়। অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকার জন্য সবাইকে ধন্যবাদ জানান প্রধানমন্ত্রী।

অনলাইন ডেস্ক