ফজলুর রহমান কি অ্যাডভোকেট, প্রশ্ন ট্রাইব্যুনালের
মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামি শেখ হাসিনার রায় নিয়ে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালকে ঘিরে বিএনপি নেতা ফজলুর রহমানের করা বিরূপ মন্তব্যের ঘটনায় তাকে তলব করেছেন আদালত। আগামী ৮ ডিসেম্বর অ্যাকাডেমিক সার্টিফিকেট ও বার কাউন্সিলের সনদসহ তাকে সশরীরে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে হাজির হয়ে এ বিষয়ে ব্যাখ্যা প্রদানের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
আদালত অবমাননার অভিযোগের শুনানি শেষে আজ রোববার (৩০ নভেম্বর) আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ এর চেয়ারম্যান বিচারপতি গোলাম মর্তুজা মজুমদারের নেতৃত্ব দুই সদস্যের বেঞ্চ এ আদেশ দেন।
শুনানিকালে আদালত বলেন, ফজলুর রহমান যে মন্তব্য করেছেন তা শুধুমাত্র আদালত অবমাননা নয়, এটি রাষ্ট্রদ্রোহিতার শামিল, কেননা বিচার ও আদালত রাষ্ট্রের অংশ, বিচার ও আদালতকে মানি না বলার অর্থ হলো রাষ্ট্রকে তিনি মানেন না, এটা বলে তিনি রাষ্ট্রদ্রোহিতার অপরাধ করেছেন।
রাষ্ট্রপক্ষে শুনানি করেন ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউটর গাজী মোনাওয়ার হুসাইন তামীম। দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে শুনানির শুরুতে গাজী মোনাওয়ার হুসাইন তামীম বলেন, অ্যাডভোকেট ফজলুর রহমান একটি টিভি চ্যানেলের টকশোতে বলেছেন, আমি এ ট্রাইব্যুনাল মানি না, বিচার মানি না। এ ছাড়া ট্রাইব্যুনালের গঠন প্রক্রিয়া নিয়েও কথা বলেছেন। এছাড়া তিনি বহুবার ট্রাইব্যুনাল নিয়ে আপত্তিকর মন্তব্য করেছেন।
এ সময় আদালত প্রসিকিউশনের কাছে জানতে চান, উনি কি অ্যাডভোকেট? জবাবে গাজী তামিম বলেন, মাইলর্ড উনি অ্যাডভোকেট। এ সময় কোর্ট বলেন, তার বারের সার্টিফিকেট আছে? জবাবে প্রসিকিউশন বলেন, সে হাইকোর্টের সিনিয়র আইনজীবী। এ সময় প্রসিকিউটর গাজী তামিম বলেন, বার কাউন্সিলের তথ্য অনুযায়ী ১৯৯২ সালে তার আইনজীবী হিসেবে সনদ হয়। তাহলে তার আইনপেশার মেয়াদ ৩৩ বছর হয়। অথচ তিনি টকশোতে বলে বেড়াচ্ছেন ৪০ বছর প্র্যাকটিস করেছেন। এ ছাড়া একজন আইনজীবী যদি আদালত সর্ম্পকে এ মন্তব্য করেন তাহলে সাধারণ মানুষের মধ্যে আদালত ও বিচারপ্রক্রিয়া নিয়ে বিরূপ ধারণা তৈরি হবে। এ সময় আদালত জানতে চান? উনি ফজলুর রহমান জীবনে কোর্টে এসেছেন কিনা? জবাবে প্রসিকউটর গাজী এমএইচ তামিম বলেন, আমরা দেখি উনি কোর্টে আসেন। তবে উনি আর্ন্তজাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের আইনে মাত্র ২৬টি ধারা রয়েছে, কোনোদিন মনে হয় এটি পড়েননি। কেননা উনি কিছুদিন আগে বলে বেড়ান রিট করে ট্রাইব্যুনাল বাতিল হয়ে যাবে। অথচ ১৯৭১ সালের ঘটনায় ১৯৭৩ সালে আইন করা হয়েছে। অথচ উনি বিচার মানি না, আইন মানি না, ট্রাইাব্যুনাল মানি না।
এ সময় ট্রাইব্যুনালের বিচারক বলেন, আদালতে কেউ আছেন উনার সঙ্গে কাজ করেছেন?
এ সময় ট্রাইব্যুনালে নিরবতা নেমে আসে। এ সময় বিচারক বলেন, উনি একজন নাগরিক হিসেবে আইনের সমালোচনা করতে পারেন, রায় কোনো ত্রুটি থাকলে সেটি বলতে পারেন। কিন্তু রায় মানি না, বিচার মানি না বলে তিনি শুধুমাত্র আদালত অবমাননা নয় রাষ্ট্রদ্রোহিতার অপরাধ করেছেন।
এ সময় আদালত আদেশে বলেন, তিনি এসব মন্তব্য করে আদালতের প্রতি অবজ্ঞা প্রদর্শন করে আদালত অবমাননা করেছেন। আগামী ৮ ডিসেম্বর সশরীরে হাজির হয়ে অ্যাকাডেমিক সার্টিফিকেট ও বার কাউন্সিলের সার্টিফিকেটসহ হাজির হওয়ার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। এর আগে গত বুধবার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে তার বিরুদ্ধে অভিযোগ করেন ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউটর গাজী মোনাওয়ার হুসাইন তামীম।
অভিযোগে প্রসিকিউটর গাজী তামীম বলেন, একটি বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেলের টক শোতে ফজলুর রহমান বলেছেন, তিনি এই ট্রাইব্যুনাল মানেন না। তার যুক্তি, এই ট্রাইব্যুনাল তৈরি হয়েছে ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের সময় সংঘটিত যুদ্ধাপরাধের বিচারের জন্য। এই ট্রাইব্যুনালে অন্য কোনো বিচার হতে পারে না। প্রসিকিউটর গাজী তামীম বলেন, এই ট্রাইব্যুনাল মানবতাবিরোধী অপরাধ, গণহত্যা, যুদ্ধাপরাধ, ক্রাইম অ্যাগেইনস্ট পিসের বিচার করতে পারেন। এখন মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার হচ্ছে। ফজলুর রহমানের মাথায় শুধু যুদ্ধাপরাধের বিচারের বিষয়টি আছে।
টক-শোর আরেকটি অংশ তুলে ধরে প্রসিকিউটর গাজী তামীম বলেন, ফজলুর রহমান বলেছেন, এই কোর্টের গঠনপ্রক্রিয়া বলে- এই কোর্টে বিচার হতে পারে না। এই কোর্টে যারা বিচার করছেন, আমার ধারণা এদের মধ্যে ভেতরে একটা কথা আছে।
টক-শোর এই দুটি অংশ তুলে ধরে প্রসিকিউটর গাজী তামীম বলেন, ফজলুর রহমান সুপ্রিম কোর্টের একজন জ্যেষ্ঠ আইনজীবী ও বিএনপির সংসদ সদস্য প্রার্থী হিসেবে এ ধরনের মন্তব্য করার পরিণতি জানেন। তারপরও ফজলুর রহমান বিভিন্ন রাজনৈতিক দল, ট্রাইব্যুনালের গঠনপ্রক্রিয়া, বিচার নিয়ে প্রতিনিয়ত বক্তব্য দিয়ে যাচ্ছেন। ট্রাইব্যুনালকে অবমূল্যায়ন করে বক্তব্য দিয়েছেন। এতে প্রতীয়মান হয়, তিনি ইচ্ছাকৃতভাবে আদালত অবমাননা করছেন।

নিজস্ব প্রতিবেদক