খালেদা জিয়ার জানাজায় শোকার্ত হৃদয়ে আলহাজ্ব মোসাদ্দেক আলী
দেশের মানুষকে কাঁদিয়ে আজ বুধবার চিরনিদ্রায় শায়িত হয়েছেন বাংলাদেশের রাজনীতির ধ্রুবতারা, তিনবারের প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া। তাঁকে শেষ বিদায় জানাতে কোটি মানুষের ঢল নামে মানিক মিয়া অ্যাভিনিউসহ পুরো রাজধানীজুড়ে। ঢাকা যেন পরিণত হয় ‘জানাজার নগরী’তে। দল-মত ও আবাল-বৃদ্ধ-বণিতা নির্বিশেষে সর্বস্তরের মানুষের শ্রদ্ধা ও ভালোবাসায় সিক্ত হন খালেদা জিয়া। শোক ও বেদনার্ত হৃদয়ে প্রিয় নেত্রীকে শ্রদ্ধা জানাতে সেই জানাজায় শামিল হন খালেদা জিয়ার দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক সহযোগী আলহাজ্ব মোহাম্মদ মোসাদ্দেক আলী। অশ্রুসজল নয়নে বিদায় জানান প্রিয় নেত্রীকে।
ফ্যাসিস্ট হাসিনা সরকারের নির্মম নির্যাতনে বিএনপির সর্বস্তরের নেতাকর্মী নিষ্পেষিত হয়েছিলেন। কেউ হয়েছেন মা-হারা, কেউ পরিবার হারা। হামলা-মামলা নির্যাতনে অনেক হয়েছেন দেশছাড়া। গত বছরের ৬ আগস্ট গণঅভ্যুত্থানে শেখ হাসিনা ভারতে পালিয়ে যাওয়ার পর অনেকের মতোই বহু মামলায় জর্জরিত আলহাজ্ব মোহাম্মদ মোসাদ্দেক আলী দেশে ফেরেন। এরপরই তিনি সার্বক্ষণিক প্রিয় নেত্রীর চিকিৎসার খোঁজখবর নিয়েছেন, পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ রেখেছেন। আজ শোকাহত তাঁর দীর্ঘদিনের সহকর্মী ও রাজনৈতিক সহযোদ্ধা আলহাজ্ব মোহাম্মদ মোসাদ্দেক আলী কোটি মানুষের সঙ্গে মানিক মিয়া অ্যাভিনিউতে নেত্রীকে শেষ শ্রদ্ধা জানান।
আলহাজ্ব মোহাম্মদ মোসাদ্দেক আলী ১৯৭৯ সালে জাতীয়তাবাদী আদর্শে উদ্বুদ্ধ হয়ে বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত হন। স্বৈরাচার এরশাদবিরোধী আন্দোলনের সময় তিনি খালেদা জিয়া ও নেতাকর্মীদের পাশে থেকে বিভিন্ন আন্দোলন-কর্মসূচিতে সক্রিয়ভাবে অংশ নিয়েছেন।
১৯৯১ থেকে ১৯৯৬ সাল পর্যন্ত প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার একান্ত সচিব ছিলেন মোহাম্মদ মোসাদ্দেক আলী। ১৯৯৬ থেকে ২০০১ সাল পর্যন্ত বিএনপি চেয়ারপারসনের রাজনৈতিক সচিব ছিলেন। ওই সময় খালেদা জিয়া জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় নেত্রী ছিলেন।
২০০১ সালে খালেদা জিয়া যখন প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ গ্রহণ করেন তখন মোসাদ্দেক আলী তাঁর রাজনৈতিক সচিব নিযুক্ত হন। ২০০৪ সালে ঢাকা-১০ আসনে উপনির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার জন্য পদত্যাগ করার আগ পর্যন্ত তিনি এই পদে ছিলেন। পরে তিনি বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টার দায়িত্ব পালেন করেন। এছাড়া বিএনপি কেন্দ্রীয় কমিটির ভাইস চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
১৯৯১ সালে খালেদা জিয়াকে প্রধানমন্ত্রী হওয়ার খবর প্রথম জানিয়েছিলেন মোসাদ্দেক আলী। এ প্রসঙ্গে খালেদা জিয়ার স্মৃতিচারণমূলক ‘নন্দিত নেত্রী খালেদা জিয়া’ গ্রন্থে সাংবাদিক আবদাল আহমেদ উল্লেখ করেছেন, ‘১৯ মার্চ, ১৯৯১। সন্ধ্যায় বেগম খালেদা জিয়া ড্রয়িং রুমে বসে কয়েকজন অতিথির সঙ্গে কথা বলছিলেন। এ লেখকও (আবদাল আহমেদ) সেখানে উপস্থিত ছিলেন। এমন সময় বিশেষ সহকারী মোসাদ্দেক আলী এসে তাঁকে জানালেন বিবিসি মন্ত্রিপরিষদ গঠনের খবর দিয়েছে। অস্থায়ী প্রেসিডেন্ট বিচারপতি সাহাবুদ্দীন আহমদ তাঁকে প্রধানমন্ত্রী করে ১১ জন কেবিনেট মন্ত্রী ও ২১ জন প্রতিমন্ত্রী নিয়ে মন্ত্রিপরিষদ করেছেন। তাঁর চেহারা উজ্জ্বল হয়ে উঠলো। ড্রয়িং রুম থেকে উঠে তিনি পাশের রুমে গেলেন মায়ের কাছে। পা ছুঁয়ে মাকে সালাম করলেন। মা বুকে জড়িয়ে ধরে দোয়া করলেন মেয়েকে। বড় ছেলে তারেক রহমান বাসার বাইরে ছিলেন। বাইরে থেকেই শুনেছেন মায়ের প্রধানমন্ত্রী হবার খবর। এরপর কাজ সংক্ষিপ্ত করে ছুটে এলেন বাসায়। মাকে সালাম করলেন। একগুচ্ছ রজনীগন্ধা ও গোলাপ দিয়ে অভিনন্দন জানালেন। নবনির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী বুকে জড়িয়ে ধরলেন ছেলেকে। আদর করলেন। এরপর দলীয় নেতা-কর্মী ও শুভাকাঙ্ক্ষীরা দলে দলে এসে ফুল দিয়ে অভিনন্দন জানালো নতুন প্রধানমন্ত্রীকে।’
খালেদা জিয়ার জীবনের এমন অনেক ঐতিহাসিক ঘটনার সাক্ষী মোসাদ্দেক আলী। আপসহীন নেত্রীর বিশ্বাস ও ভরসার এক অবিচল আস্থার ঠিকানা ছিলেন তিনি। তাই মমতাময়ী নেত্রীকে আজীবনের জন্য হারিয়ে শোকার্ত অশ্রুসজল হৃদয়ে লাখো মানুষের সঙ্গে জানাজায় দাঁড়িয়ে, তাঁর আত্মার মাগফেরাত কামনা করে আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করেছেন।

নিজস্ব প্রতিবেদক