দুর্নীতি নির্মূলে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া হবে : প্রধান বিচারপতি
নবনিযুক্ত প্রধান বিচারপতি জুবায়ের রহমান চৌধুরী বলেছেন, বিচার বিভাগের দুর্নীতি বন্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। পাশাপাশি মামলা জট কমাতে সবাইকে সহযোগিতা করতে হবে। আজ রোববার (৪ জানুয়ারি) সকালে সুপ্রিম কোর্টে আয়োজিত এক সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে তিনি এ কথা বলেন।
এ সময় বিগত আওয়ামী লীগের আমলে সুবিচারের নামে অবিচার করা হয়েছিল বলে অভিযোগ করেন ভারপ্রাপ্ত অ্যাটর্নি জেনারেল।
অনুষ্ঠানে আরও উপস্থিত ছিলেন সুপ্রিম কোর্ট বার অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মাহবুব উদ্দিন খোকন। তিনি বলেন, নিম্ন আদালতের জামিন বাণিজ্য বন্ধ করতে হবে। মিথ্যা চার্জশিট দেওয়া পুলিশ কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বানও জানান তিনি।
শুদ্ধি অভিযানের মাধ্যমে বিচার বিভাগের সব স্তর থেকে দুর্নীতি নির্মূল করতে প্রধান বিচারপতির প্রতি আহ্বান জানিয়ে ভারপ্রাপ্ত অ্যাটর্নি জেনারেল মোহাম্মদ আরশাদুর রউফ বলেন, বিচার বিভাগের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হলো দুর্নীতি; এই বিষবাষ্প বিচারকার্যের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সব কর্মকর্তা ও কর্মচারীকে আক্রান্ত করেছে। তাই জাতি প্রত্যাশা করে, বিচার বিভাগ সব ধরনের সিন্ডিকেট ও দুর্নীতিমুক্ত হোক।
ভারপ্রাপ্ত অ্যাটর্নি জেনারেল তাঁর বক্তব্যে অর্থনৈতিক দুর্নীতির পাশাপাশি বুদ্ধিবৃত্তিক দুর্নীতির ভয়াবহতা তুলে ধরেন। তিনি বলেন, ‘বুদ্ধিবৃত্তিক দুর্নীতি ডিনামাইটের চেয়েও ধ্বংসাত্মক, অ্যাটম বোমার চেয়েও ভয়াবহ এবং ক্যানসারের চেয়েও মরণঘাতী। সুতরাং শুদ্ধি অভিযানের মাধ্যমে বিচার বিভাগের সব স্তর থেকে দুর্নীতি নির্মূল করতে হবে।’ উচ্চ ও নিম্ন আদালতসহ বিচার বিভাগীয় সব কর্মকর্তাকে দুর্নীতির এই চ্যালেঞ্জ সম্পর্কে স্মরণ করিয়ে দেওয়া জরুরি বলে তিনি উল্লেখ করেন।
বিগত পনেরো বছরের প্রেক্ষাপট তুলে ধরে আরশাদুর রউফ বলেন, অতীতে বিচার বিভাগকে দলীয়করণ ও রাজনৈতিক দুর্বৃত্তায়নের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছিল। নির্যাতিত মানুষের পরিবর্তে অবিচারই প্রাধান্য পেয়েছিল। কিন্তু ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার সফল বিপ্লবের পর এক অপার সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচিত হয়েছে। তিনি আরও বলেন, ‘নতুন বাংলাদেশের প্রথম প্রতিশ্রুতিই হলো একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম বিচার ব্যবস্থা। স্বপ্নের বাংলাদেশ বিনির্মাণের পথে এটিই হবে প্রথম সিঁড়ি।’
আরশাদুর রউফ স্বাধীন সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় প্রতিষ্ঠার উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়ে বলেন, এর নিয়ন্ত্রণ ও অভিভাবকত্বের গুরুদায়িত্ব এখন প্রধান বিচারপতির কাঁধে। বিচারকদের মানসিকতা স্বাধীন করার পরিবেশ নিশ্চিত করাই এখন বড় কাজ।
মামলাজট প্রসঙ্গে ভারপ্রাপ্ত অ্যাটর্নি জেনারেল জানান, বর্তমানে আপিল বিভাগে ৩৯ হাজার ৪১৭টি ও হাইকোর্ট বিভাগে ছয় লাখ ৩৭ হাজার ৮৮২টি মামলা বিচারাধীন। এই বিশাল জট বিচারপ্রার্থী জনগণের মধ্যে হতাশা ও আস্থাহীনতা তৈরি করতে পারে। তাই দ্রুত মামলা নিষ্পত্তির ওপর জোর দিয়ে তিনি বলেন, ‘একই সঙ্গে জাস্টিস হারিড, জাস্টিস বারিড’– এই বিষয়ের প্রতিও সজাগ থাকতে হবে।’
বিচারক নিয়োগের ক্ষেত্রে একাডেমিক যোগ্যতার পাশাপাশি নৈতিক মান, সততা ও সাহসিকতাকে প্রাধান্য দেওয়ার অনুরোধ জানান অ্যাটর্নি জেনারেল। এক্ষেত্রে ‘সুপ্রিম কোর্ট বিচারক নিয়োগ অধ্যাদেশ, ২০২৫’-এর অধীন গঠিত ‘সুপ্রিম জুডিশিয়াল অ্যাপয়েন্টমেন্ট কাউন্সিল’ যুগান্তকারী ভূমিকা রাখবে বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।
বক্তব্যের শেষে পবিত্র কোরআনের সূরা মায়েদার আয়াত উদ্ধৃত করে অ্যাটর্নি জেনারেল বলেন, ‘যখন তুমি বিচার কর, তখন তাদের মধ্যে ন্যায়ের সঙ্গে ফায়সালা কর। নিশ্চয়ই আল্লাহ ন্যায়নিষ্ঠদের ভালোবাসেন।’
অ্যাটর্নি জেনারেল বিশ্বাস প্রকাশ করেন, প্রধান বিচারপতির নেতৃত্বে বিচার বিভাগ তার হারানো গৌরব ও মর্যাদা ফিরে পাবে, এটি আর কখনো স্বার্থান্বেষী মহলের কেন্দ্রে পরিণত হবে না।

নিজস্ব প্রতিবেদক