জিয়াউলের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দেবেন ইকবাল করিম ভূঁইয়া
আওয়ামী লীগের শাসনামলে শতাধিক গুম-খুনের মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় মেজর জেনারেল (অব.) জিয়াউল আহসানের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দেবেন সাবেক সেনাপ্রধান ইকবাল করিম ভূঁইয়া। আজ বৃহস্পতিবার (৮ জানুয়ারি) দুপুরে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ এর চেয়ারম্যান বিচারপতি মো. গোলাম মর্তূজা মজুমদারের নেতৃত্বাধীন দুই সদস্যের বিচারিক প্যানেল শুনানি শেষে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ গঠনের পর আগামী ১৪ জানুয়ারি দিন নির্ধারণ করেছেন ট্রাইব্যুনাল।
বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন চিফ প্রসিকিউটর মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম। এদিকে জিয়াউলের পক্ষে আজ শুনানি করেন জ্যেষ্ঠ আইনজীবী মুনসুরুল হক চৌধুরী ও তার বোন আইনজীবী নাজনীন নাহার।
শুনানি শেষে তদন্ত কর্মকর্তার কাছে দেওয়া ইকবাল করিম ভূঁইয়ার জবানবন্দির কিছু অংশ পড়ে শোনান চিফ প্রসিকিউটর। জবানবন্দিতে জিয়াউল আহসানের বিভিন্ন বীভৎসতা তুলে আনেন তিনি। আজ জিয়াউল আহসানকে অভিযোগ থেকে অব্যাহতি দিতে বক্তব্য তুলে ধরেন তার আইনজীবী মনসুরুল হক ও নাজনিন নাহার। তারা বলেন, প্রসিকিউশন আসামির বিরুদ্ধে যেসব অভিযোগ তুলে ধরেছেন, তাতে তার সম্পৃক্ত থাকা প্রমাণ করতে পারেনি। পরে তারা ট্রাইব্যুনালের কাছে জিয়াউলকে অভিযোগ থেকে অব্যাহতির আবেদন জানান।
এরপর বক্তব্যে চিফ প্রসিকিউটর তাজুল ইসলাম বলেন, প্রসিকিউশন আসামির বিরুদ্ধে ‘প্রাইমা ফেসি’ বা প্রাথমিকভাবে অভিযোগ প্রমাণ করতে সক্ষম হয়েছে। তিনি আসামির বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করে বিচার শুরুর আবেদন জানান। উভয় পক্ষের বক্তব্য শেষে আদালত এবিষয়ে আদেশের জন্য ১৪ জানুয়ারি দিন ধার্য করে।
এর আগে গত ৪ ডিসেম্বর জিয়াউলের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিকভাবে অভিযোগ গঠনে শুনানি করেন চিফ প্রসিকিউটর তাজুল ইসলাম। তিনি আসামির বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ তুলে ধরেন।
প্রথম অভিযোগ বলা হয়, ২০১১ সালের ১১ জুলাই রাত সাড়ে ১১টার দিকে র্যাব সদর দপ্তর থেকে অবৈধভাবে আটক সজলসহ তিনজন বন্দিকে নিয়ে জিয়াউল ও তার দল গাজীপুরের দিকে রওনা হন। ঢাকা বাইপাস সড়কে বিভিন্ন স্থানে গাড়ি থামিয়ে পর্যায়ক্রমে বন্দিদের চোখ ও হাত বাঁধা অবস্থায় গুলি করে হত্যা করেন জিয়াউল।
দ্বিতীয় অভিযোগ বলা হয়, বরগুনার পাথরঘাটার চরদুয়ানী এলাকা ও বলেশ্বর নদের মোহনা ছিল জিয়াউল আহসান পরিচালিত হত্যাকাণ্ডের অন্যতম ‘হটস্পট। গভীর রাতে ট্রলার বা নৌকায় করে নদীর মাঝখানে নিয়ে গিয়ে মাথা বা বুকে বালিশ চেপে গুলি করা হতো। পরে পেট কেটে সিমেন্টের ব্লক বেঁধে লাশ পানিতে ডুবিয়ে দেওয়া হতো। এই পদ্ধতিকে ‘গেস্টাপো’ বা ‘গলফ’ কোডনামে পরিচালনা করা হতো বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়। এভাবে সাবেক বিডিআর সদস্য নজরুল ইসলাম মল্লিক ও আলকাছ মল্লিকসহ কমপক্ষে ৫০ জনকে হত্যা করা হয়েছে বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়।
তৃতীয় অভিযোগে বলা হয়, তথাকথিত বনদস্যু দমনের নামে সুন্দরবনের বিভিন্ন এলাকায় হত্যা অভিযান পরিচালনা করা হতো। পূর্বে আটক ও গুম থাকা ব্যক্তিদের বনদস্যু হিসেবে সাজিয়ে গভীর রাতে নির্ধারিত স্থানে নিয়ে গিয়ে হত্যা করে ‘বন্দুকযুদ্ধ’ দেখানো হতো। এসব অভিযানে র্যাবের বাছাই করা সদস্যরা অংশ নিত এবং অনেক ক্ষেত্রে জিয়াউল আহসান নিজেই উপস্থিত থাকতেন। এরই ধারাবাহিকতায় ‘অপারেশন নিশানখালী’, ‘অপারেশন মরা ভোলা’ ও ‘অপারেশন কটকা’ নামে তিনটি অভিযানে অন্তত ৫০ জনকে হত্যা করা হয়েছে বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়।
এর মধ্যে সাবেক এই সেনা কর্মকর্তাকে নিয়ন্ত্রণে রাখতে মেজর জেনারেল মুজিবকে অনুরোধ করেন ইকবাল করিম। এরপর দেশজুড়ে প্রকাশ্যে বন্দুকযুদ্ধ কিছুটা থেমে যায়। কিন্তু আড়ালে ঠিকই এসব অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড করেছিলেন জিয়াউল।
এ ছাড়া র্যাবের এডিজি পদে আসীন হতেই অস্বাভাবিক হত্যাকাণ্ড বাড়িয়ে দেন তিনি। জিয়াউলের এসব কর্মকাণ্ড থামাতে তখন ব্রিগেডিয়ার জেনারেল জগলুলকে বোঝানোর জন্য বলা হয়। তখন ইকবাল করিমের উদ্দেশ্যে জগলুল বলেন, এমন একজন মানুষকে বোঝাতে বলেছেন; যার মাথা পাথর দিয়ে ঠাসা। তাকে বোঝানোর কোনো উপায় নেই।

নিজস্ব প্রতিবেদক