বিএনপি খারাপ হলে ৫ বছর সঙ্গে ছিল কেন, জামায়াত নিয়ে তারেক রহমান
বিএনপি রাজনৈতিক দল হিসেবে ‘খারাপ হলে’ বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী কেন পাঁচ বছর জোটসঙ্গী হিসেবে ছিল, সেই প্রশ্ন তুলেছেন দলটির চেয়ারম্যান তারেক রহমান।
আজ শুক্রবার (৩০ জানুয়ারি) রাতে রংপুরের কালেক্টরেট ঈদগাহ মাঠে নির্বাচনি সমাবেশে বিএনপি চেয়ারম্যান এমন প্রশ্ন তোলেন।
জামায়াতে ইসলামীকে উদ্দেশে তারেক রহমান বলেন, একটি দল আছে, যার বিএনপির বিরুদ্ধে গত কয়েক দিন ধরে মিথ্যা বলে যাচ্ছে; আজও বলেছে।
অষ্টম সংসদ নির্বাচনে জয়লাভের মাধ্যমে ২০০১ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত ক্ষমতায় ছিল বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকার। ওই জোট সরকারে বিএনপির প্রধান শরিক দল ছিল বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী।
ওই সরকারের কথা তুলে ধরে তারেক রহমান বলেন, তাদের দুজন আমাদের সঙ্গে ছিল; ২০০১ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত। আমার প্রশ্ন হলো, ভালো মানুষের সঙ্গেই তো ভালো মানুষ থাকে, নাকি? বিএনপি যদি খারাপ দলই হয়, তাহলে তারা পাঁচ বছর কেন সঙ্গে ছিল?
বিএনপি চেয়ারম্যান বলেন, হয় দলটির মাথা খারাপ হয়ে গেছে, নয়ত নিজেদের নেতৃত্ব সম্পর্কে তারা ভুল কথা বলছে।
সমাবেশে যোগ দেওয়ার আগে এদিন সন্ধ্যায় পীরগঞ্জে আবু সাঈদের কবর জিয়ারত করেন তারেক রহমান। এরপর আবু সাঈদের পরিবারের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে কালেক্টরেট ঈদগাহ মাঠের উদ্দেশে রওনা হন তিনি। পথে পথে নেতাকর্মীদের ভিড় ডিঙিয়ে সমাবেশস্থলে আসতে তার প্রায় পৌনে দুই ঘণ্টা লেগে যায়। তারেক রহমান মঞ্চে ওঠেন রাত সাড়ে ৮টায়। বক্তব্য শুরু করেন পৌনে ৯টার দিকে।
তারেক রহমান আরও বলেন, ১২ তারিখে আপনারা আপনাদের পরিকল্পনা (ধানের শীষে ভোট) সফল করতে যাবেন। একই সঙ্গে আরেকটি কাজ করতে হবে। যারা অধিকার ফেরানোর জন্য নিজের জীবনকে উৎসর্গ করেছে, চট্টগ্রামে ওয়াসিম নিজের জীবনকে উৎসর্গ করেছে, এমন হাজারো মানুষ যারা নিজের জীবনকে উৎসর্গ করেছে….তাদের আত্মত্যাগের মূল্যায়ন করতে হলে আমরা যে জুলাই সনদে স্বাক্ষর করেছি সেই জুলাই সনদকে আমাদের সন্মান করতে হবে।
বিএনপি চেয়ারম্যান বলেন, ‘সেজন্যই আপনাদের সকলকে অনুরোধ করব, ধানের শীষে যেমন সিলটা দেবেন তাড়াতাড়িতে, একই সঙ্গে আপনাকে দ্বিতীয় ব্যালট পেপার দেবে ‘হ্যাঁ’ এবং ‘না’। সেখানে হ্যাঁ’র পক্ষে দয়া করে আপনারা রায় দেবেন। মনে থাকবে তো।’
তারেক রহমান আরও বলেন, এই এলাকাসহ সারা বাংলাদেশে একটি বিরাট সমস্যা হচ্ছে পানি সমস্যা। বিশেষ করে এই এলাকাটি যেহেতু কৃষি প্রধান এলাকা, এখানেও সমস্যাটা রয়েছে। এই সমস্যাটি সমাধানের জন্য কাজে হাত দিয়েছিলেন শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান। ইনশাআল্লাহ ১২ তারিখে নির্বাচনের পরে ১৩ তারিখে বিএনপি ইনশাল্লাহ সরকার গঠন করলে এই এলাকার মানুষের জন্য তিস্তা ব্যারেজের মহাপরিকল্পনার কাজে যথাসম্ভব দ্রুত হাত দেব।
এ ছাড়া এই অঞ্চলে কৃষি শিল্প প্রতিষ্ঠায় উদ্যোক্তাদের বিশেষ সহায়তা প্রদান, ১০ হাজার টাকার পর্যন্ত কৃষি ঋণ সুদসহ ওকুফ, এনজিওদের কাছে ক্ষুদ্র ঋণ যারা নিয়েছে তাদের ঋন সরকার কর্তৃক পরিশোধের ব্যবস্থাসহ বিভিন্ন দাবি বাস্তবায়ন করা হলে বলে প্রতিশ্রুতি দেন তারেক রহমান।
প্রায় ২৫ মিনিটের বক্তব্যে বিএনপি চেয়ারম্যান বলেন, অনেক মানুষ বলেন, রংপুর গরিব অঞ্চল। কিন্তু আমি মনে করি, এই অঞ্চল সবচেয়ে সম্ভাবনাময়। কিন্তু সেই সম্ভাবনা বাস্তবায়ন করতে হলে দরকার সঠিক পরিকল্পনা, সঠিক ব্যক্তি, সঠিক নেতৃত্ব। তাহলেই এই বিভাগের আমরা পরিবর্তন করতে পারব। কিন্তু সেই আমুল পরিবর্তন করতে হলে সঠিক ব্যক্তি এবং সঠিক নেতৃত্ব দরকার।
বক্তব্যের শুরুতে তারেক রহমান বলেন, এই রংপুর হচ্ছে আবু সাঈদের পবিত্র রক্তে মিশানো মাটি। কাজেই যেই ত্যাগ আমরা জুলাই আন্দোলনে দেখেছি, সেই ত্যাগ কখনো বৃথা যেতে যেতে পারে না। আমাদেরকে যে কোন মূল্যে সেই ত্যাগের মূল্যায়ন করতে হবে। কিন্তু কিভাবে? আমরা আবু সাঈদের সেই জীবন উৎসর্গ, সেই ত্যাগকে আমরা মূল্যায়ন করব। আবু সাঈদসহ ১৪‘শ ব্যক্তি শহীদ হয়েছে, সেই মানুষগুলোর ত্যাগের মূল্যায়ন আমরা তখনই করতে পারবো যখন এই দেশের মানুষের রাজনৈতিক অধিকার এবং অর্থনৈতিক অধিকার প্রতিষ্ঠিত হবে।
এর আগে তারেক রহমানের আগমন উপলক্ষে দুপুর থেকে কালেক্টরেট ঈদগাহ মাঠে নেতাকর্মীর আসতে শুরু করেন। ছোট ছোট মিছিল নিয়ে আসা নেতাকর্মীদের হাতে দেখা যায় ধানের ছড়া ও প্রার্থীদের ছবি সংবলিত প্ল্যাকার্ড। বিকাল সাড়ে ৪টায় পবিত্র কোরআন তেলাওয়াতের মধ্য দিয়ে সমাবেশের কার্যক্রম শুরু হয়।
রংপুর জেলা আহ্বায়ক সাইফুল ইসলাম বলেন, গোটা রংপুর বিভাগের ৮ জেলার ৩৩ জন প্রার্থী তাদের কর্মী-সমর্থকদের নিয়ে সমাবেশে এসেছেন। আপনারা দেখছেন, পুরো ঈদগাহ মাঠ ও আশপাশের এলাকা জনসমুদ্রে রূপ নিয়েছে।
সমাবেশে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরসহ রংপুর বিভাগের বিভিন্ন আসনে ধানের প্রার্থীরা বক্তব্য দেন।
রংপুর অঞ্চলের ৩৩ আসনের প্রার্থীরা হলেন, দলের মহাসচিব ঠাকুরগাঁও-১ আসনের প্রার্থী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য দিনাজপুর-৬ আসনের প্রার্থী এজেডএম জাহিদ হোসেন ও সাংগঠনিক সম্পাদক লালমনিরহাট-৩ আসনের প্রার্থী আসাদুল হাবিব দুলু। রংপুর-১ আসনে মোকাররম হোসেন, রংপুর-২ আসনে মোহাম্মদ আলী সরকার, রংপুর-৩ আসনে সামসুজ্জামান সামু, রংপুর-৪ আসনে মোহাম্মদ এমদাদুল হক, রংপুর-৫ আসনে গোলাম রাব্বানী ও রংপুর-৬ আসনের সাইফুল ইসলামও সমাবেশে ছিলেন।
অন্যদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন—পঞ্চগড়-১ আসনের নওশাদ জমির, পঞ্চগড়-২ আসনের ফরহাদ হোসেন আজাদ, ঠাকুরগাঁও-২ আসনের আব্দুস ছালাম, ঠাকুরগাঁও-৩ আসনের মো. জাহিদুর রহমান, দিনাজপুর-১ আসনের মনজুরুল ইসলাম, দিনাজপুর-২ আসনের সাদিক রিয়াজ চৌধুরী পিনাক, দিনাজপুর-৩ আসনের সৈয়দ জাহাঙ্গীর আলম, দিনাজপুর-৪ আসনের আক্তারুজ্জামান মিয়া, দিনাজপুর-৫ আসনের একেএম কামরুজ্জামান, নীলফামারী-১ আসনের মঞ্জুরুল ইসলাম আফ্রিদি (জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম), নীলফামারী-২ আসনের মো. সৈয়দ আলী, নীলফামারী-৩ আসনের শাহরিন, নীলফামারী-৪ আসনের আব্দুল গফুর সরকার, লালমনিরহাট-১ আসনের হাসান রাজিব প্রধান, লালমনিরহাট-২ আসনের রোকন উদ্দিন বাবুল, কুড়িগ্রাম-১ আসনের সাইফুল রহমান রানা, কুড়িগ্রাম-২ আসনের সোহেল হোসাইন কায়কোবাদ, কুড়িগ্রাম-৩ আসনের তাজভীর উল ইসলাম, কুড়িগ্রাম-৪ আসনের আজিজুল ইসলাম, গাইবান্ধা-১ আসনের খন্দকার জিয়াউল ইসলাম মোহাম্মদ আলী, গাইবান্ধা-২ আসনের আনিসুজ্জামান খান বাবু, গাইবান্ধা-৩ আসনের সৈয়দ মঈনুল হাসান সাদিক, গাইবান্ধা-৪ আসনের মো. শামিম কায়সার লিঙ্কন ও গাইবান্ধা-৫ আসনের মো. ফারুক আলম সরকারও কর্মী-সমর্থক নিয়ে সমাবেশে যোগ দিয়েছেন।
সমাবেশে সভাপতিত্ব করেন রংপুর মহানগর বিএনপির আহ্বায়ক শামসুজ্জামান সামু। সঞ্চালনায় ছিলেন সদস্য সচিব মাহফুজ উন নবী ডন।

নিজস্ব প্রতিবেদক