মায়েদের প্রতি আমাদের বাড়তি দায়িত্ব আছে : জামায়াত আমির
বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান বলেছেন, এবারের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আপনাদের ভোটে যদি ইনসাফের বাংলাদেশ কায়েম হয়, তাহলে ১৩ তারিখ থেকে আপনাদের ওপর আর বেইনসাফি কায়েম হবে না ইনশাআল্লাহ। মায়েদের প্রতি আমাদের একটি বাড়তি দায়িত্ব আছে। গৃহে, চলাচলে ও কর্মস্থলে তাদের আমরা নিরাপত্তা দিব, তাদের মর্যাদা আমরা নিশ্চিত করব ইনশাআল্লাহ।
আজ মঙ্গলবার (৩ ফেব্রয়ারি) বিকেলে গাজীপুরে ১১ দলীয় জোটের জনসভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে এ কথা বলেন জামায়াত আমির।
জামায়াত আমির বলেন, গাজীপুর একটি গুরুত্বপূর্ণ শিল্প এলাকা হলেও এখানে শ্রমিকদের শৃঙ্খলা, নিরাপত্তা ও স্বাস্থ্যসেবার ঘাটতি রয়েছে। ইনসাফের বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠিত হলে গাজীপুর শিল্পাঞ্চলকে পরিকল্পিতভাবে আধুনিক শিল্প এলাকা হিসেবে গড়ে তোলা হবে ইনশাআল্লাহ।
জামায়াত আমির আরও বলেন, এই শিল্প এলাকাকে শিল্পের মতো করেই সাজানো হবে, শিল্পের সাজানো বাগানের মতোই করা হবে। শিল্প কারখানাগুলোতে নারী-পুরুষ শ্রমিকের বেতন সমান করে বৈষম্য দূর করা হবে। মায়েরা গর্ভবতী হওয়া থেকে শুরু করে সন্তান ভূমিষ্ঠ হওয়ার পর বুকের দুধ খাওয়া সময় পর্যন্ত দুই থেকে আড়াই বছর কর্মস্থলে আট ঘণ্টার স্থলে পাঁচ ঘণ্টা কাজ করবে। অবশিষ্ট তিন ঘণ্টা তারা সন্তানকে সময় দিবেন। এতে তাদের আয় রোজগার অবশ্যই কমবে না। ওইসময় তাদের কর্মস্থল থেকে পাঁচ ঘণ্টার এবং বাকি তিন ঘণ্টার বেতন দিবে সরকারের সমাজসেবা অধিদপ্তর। এটা সরকারকে দিতে হবে, তাদের নৈতিক দায়িত্ব। একটি সুস্থ মা ও একটি সুস্থ আগামী দিনের শিশু ও সুস্থ সমাজের জন্য। এ সম্মান মায়েদেরকে দিতে হবে। শিল্প কারখানাগুলোতে কত সংখ্যক মহিলা থাকলে ডে-কেয়ার সেন্টার থাকতে হবে, আমরা তা নির্ধারণ করে দিব। মায়েদের প্রতি আমাদের একটি বাড়তি দায়িত্ব আছে, গৃহে, চলাচলে ও কর্মস্থলে তাদের আমরা নিরাপত্তা দিব, তাদের মর্যাদা আমরা নিশ্চিত করব ইনশাআল্লাহ।
জামায়াতের আমির ডা. শফিকুর রহমান আরও বলেন, জামায়াতে ইসলামি ক্ষমতায় গেলে মনগড়া উন্নয়ন নয়, এমন উন্নয়ন হবে যার সুবিধাভোগী হবে আপামর জনগণ। আমরা কোনো জাত-পাত, ধর্ম-বর্ণের ভিত্তিতে বৈষম্য করব না। ইনসাফভিত্তিক রাষ্ট্র গড়াই আমাদের লক্ষ্য। তিনি বলেন, জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আমরা ক্ষমতায় গেলে গাজীপুরসহ দেশের উন্নয়ন করব। আপনারা হয়তো প্রশ্ন করতে পারেন দেশের উন্নয়নের জন্য এত টাকা পাবেন কোথায়। আমি বলছি দেশের উন্নয়নের জন্য যথেষ্ট টাকা আছে, তবে সেই টাকা আছে দেশের বাইরে। চোরগুলো দেশের টাকা লুণ্ঠন করে বাইরে পাচার করে দিয়েছে। যারা দেশের টাকা ও সম্পদ আত্মসাৎ করেছে, দেশের বাইরে পাচার করেছে। আমরা যদি সুযোগ পাই তাদের মুখের ভিতর হাত ঢুকিয়ে পেটের ভিতর থেকে সেগুলো বের করে আনব ইনশাআল্লাহ। সেই টাকা রাষ্ট্রীয় কোষাগারে জমা হবে। পরে সেগুলো যার যেমন পাওনা, যে এলাকার যেমন হক, যতটুকু পাওনা- সেই এলাকায় তাদের দেওয়া হবে। তবে আমরা মনগড়া পন্থায় কোনো উন্নয়ন করব না, নিজেদেও ভাগ্য বদলের কোনো উন্নয়ন করব না, ১৮ কোটি মানুষের ভাগ্য বদলের উন্নয়ন আমরা করব ইনশাআল্লাহ। এই উন্নয়নের অংশীদার হবেন আমাদের কৃষক, শ্রমিক, মেহনতি মানুষ, সব শ্রেণির মেহনতি মানুষ, সকল শ্রেণির পেশার মানুষ, এ উন্নয়নের কারিগর হবেন আমাদের যুব সমাজ।
জামায়াত আমির আরও বলেন, আমরা ইনসাফপূর্ণ একটি দেশ চাই। এবারের নির্বাচনে আমাদেও অঙ্গীকার দুর্নীতিমুক্ত দেশ গড়া। অপর একটি দলের নেতাও বলছেন তারাও দুর্নীতিমুক্ত করবেন। ভালো কথা, তবে ভালো কাজ আগে নিজের থেকে শুরু করতে হয়, সেটার প্রমাণ আগে দেন। আপনারা ৪৯ জন ঋণখেলাপিকে বগলের নিচে নিয়ে নির্বাচন করছেন, আগে তাদের বাতিল ঘোষণা করেন। যদি সাহসিকতার সঙ্গে এই কাজ করতে পারেন, তাহলে জনগণ আপনাদের কিছুটা হলেও বিশ্বাস করতে পারে। আর যদি ঋণখেলাপিদের বগলের নিচে রেখে বলেন আমরা দুর্নীতিমুক্ত দেশ গড়ব, তাহলে বিষয়টা এমন হবে- আপনারা যা বলেন তা করেন না, আর যা করেন তা বলেন না। আমরা তা চাই না, দেশবাসী সবাইকে জানে এবং চিনে।
ডা. শফিকুর রহমান আরও বলেন, আমরা জামায়াতে ইসলামীর বিজয় চাই না। আমি চাই দেশের ১৮ কোটি মানুষের বিজয়। ১৮ কোটি মানুষের বিজয় হলে এর অংশীদার হব আমরা সবাই। আমরা কোনো দলীয়, কোনো পারিবারিক এবং গোষ্ঠীগত সরকার এই দেশে আর দেখতে চাই না। এরা আমাদের ১২টা বাজিয়েছে, এরা বারবার দেশে ফ্যাসিবাদ উপহার দিয়েছে, এরা আমাদের ব্যাংক ডাকাতি করেছে, শেয়ার মার্কেট লুট করেছে, দুর্নীতির মহারাজ্যে পরিণত করেছে। ওই শাসন আর আমরা দেখতে চাই না। এখন চাই জনগণের শাসন। এখন চাই ঐক্যের শাসন। এখন চাই ঐক্যবদ্ধ বাংলাদেশ।
বিএনপির প্রতি ইঙ্গিত করে জামায়াত আমির বলেন, তারা ক্ষমতায় গেলে কী করবে এখনই তা মানুষকে জানিয়ে দিচ্ছে। তারা ক্ষমতায় গেলে একটি মানুষও নিরাপদে বাংলাদেশে থাকতে পারবে না, একজন ব্যবসায়ীও নিরাপদে ব্যবসা করতে পারবে না, একজন শ্রমিক নিরাপদে রাস্তায় চলাচল করতে পারবে না, কৃষক শান্তিতে মাঠে ফসল ফলাতে পারবে না। তারা সবার শান্তি তছনছ করে দিবে। এই অশান্তির বিপক্ষে আমাদের শান্তির আওয়াজ, দুর্নীতির বিরুদ্ধে আমাদের সততার আওয়াজ, বেকারত্বের বিরুদ্ধে আমাদের কাজের আওয়াজ, লুটপাটের বিরুদ্ধে আমাদের সম্পদের পাহাড়াদারি করার আওয়াজ।
এররপর জামায়াত আমির গাজীপুর-১ আসনে জোটের প্রার্থী শাহ আলম বকশি (দাঁড়িপাল্লা), গাজীপুর-২ আসনে অ্যাডভোকেট আলী নাসের খান (শাপলা কলি), গাজীপুর-৩ আসনে মাওলানা এহসানুল হক (রিকশা), গাজীপুর-৪ আসনে সালাউদ্দিন আইউবী (দাঁড়িপাল্লা), গাজীপুর-৫ আসনে খায়রুল হাসান (দাঁড়িপাল্লা) এবং নরসিংদী-২ আসনে এনসিপির প্রার্থী সারোয়ার তোষারকে (শাপলা কলি) জনতার সামনে পরিচয় করিয়ে দেন।
গাজীপুর মহানগর জামায়াতের আমির অধ্যাপক জামাল উদ্দীনের সভাপতিত্বে এবং সেক্রেটারি আ স ম ফারুকের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠিত সমাবেশে আরও বক্তব্য দেন বাংলাদেশ লেবার পার্টির চেয়ারম্যান মোস্তাফিজুর রহমান ইরান, ছাত্রশিবিরের কেন্দ্রীয় সভাপতি নুরুল ইসলাম সাদ্দাম, তামিরুল মিল্লাত কামিল মাদ্রাসার সাবেক অধ্যক্ষ মাওলানা যায়নুল আবেদীন, গাজীপুর জেলা জামায়াতের আমির ড. জাহাঙ্গীর আলম, কেন্দ্রীয় শুরা সদস্য খায়রুল হাসান, মো. হোসেন আলী, সালাউদ্দিন আইউবী, অ্যাডভোকেট শামসুল হক ভুইয়া, অধ্যক্ষ মুস্তাফিজুর রহমান প্রমুখ।

নাসির আহমেদ, গাজীপুর