আপসহীন দেশনেত্রীর অনুপস্থিতি আমাদেরকে ভারাক্রান্ত করছে : তারেক রহমান
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জনগণের নিরঙ্কুশ ম্যান্ডেট পাওয়ার পর প্রথমবারের মতো গণমাধ্যমের সঙ্গে কথা বলেছেন বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান।
আজ শনিবার (১৪ ফেব্রুয়ারি) বিকেলে রাজধানীর হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালে বলরুমে বিএনপি আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেন, আজকের এই আনন্দঘন পরিবেশে আপসহীন দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার অনুপস্থিতি আমাদেরকে ভারাক্রান্ত করেছে।
তারেক রহমান বলেন, প্রিয় বাংলাদেশি, প্রিয় দেশবাসী, আসসালামু আলাইকুম। দেশের স্বাধীনতা প্রিয়, গণতন্ত্র প্রিয় জনগণ আবারও বিএনপিকে বিজয়ী করেছে। আলহামদুলিল্লাহ। এ বিজয় বাংলাদেশের, এ বিজয় গণতন্ত্রের, এ বিজয় গণতন্ত্রকামী জনগণের। আজ থেকে আমরা সবাই স্বাধীন। আমি দেশের সকল জনগণকে জানাই আন্তরিক অভিনন্দন। সকল প্রতিদ্বন্দ্বিতা মোকাবিলা করে আমরা দেশের গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার পথ সুগম করেছি। ফ্যাসিবাদের রেখে যাওয়া ভঙ্গুর অর্থনীতি, অকার্যকর করে দেওয়া সাংবিধানিক ও বিধিবদ্ধ প্রতিষ্ঠান এবং দুর্বল আইন-শৃংখলা পরিস্থিতি— এমন একটি পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে আমরা যাত্রা শুরু করতে যাচ্ছি।
বিএনপি চেয়ারম্যান আরও বলেন, আপনাদের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণে এক দশকেরও বেশি সময় পর দেশে পুনরায় জনগণের সরাসরি ভোটে জনগণের কাছে জবাবদিহিমূলক সংসদ এবং সরকার প্রতিষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। আর কোনো অপশক্তি যাতে দেশে ফ্যাসিবাদ কায়েম করতে না পারে, দেশকে তাবেদার রাষ্ট্রে পরিণত করতে না পারে এজন্য আমরা সবাই ইনশাআল্লাহ ঐক্যবদ্ধ থাকব, থাকতে হবে। জামায়াতে ইসলামী, এনসিপি, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ, জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম, গণঅধিকার পরিষদসহ ৫১টি রাজনৈতিক দল এই নির্বাচনে অংশগ্রহণ করেছে। জাতীয় নির্বাচনে অংশগ্রহণকারী প্রতিটি রাজনৈতিক দলকে আন্তরিক অভিনন্দন জানাই। গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র এবং রাজনীতিতে রাজনৈতিক দলগুলো মূলত গণতন্ত্রের রক্ষাকবচ।
তারেক রহমান বলেন, সরকার ও বিরোধী দল দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করলে অবশ্যই দেশে গণতন্ত্র সুসংহত হবে বলে আমরা দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি। নির্বাচনে অংশগ্রহণকারী প্রতিটি গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতি আহ্বান জানাই দেশ গঠনে আপনাদের চিন্তা ভাবনা আমাদের কাছে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আমাদের পথ ও মত ভিন্ন থাকতে পারে কিন্তু দেশের স্বার্থে আমরা সবাই এক। আমি বিশ্বাস করি জাতীয় ঐক্য আমাদের শক্তি, বিভাজন আমাদের দুর্বলতা।
বিএনপি চেয়ারম্যান বলেন, জনমনে সৃষ্ট সকল সংশয় কাটিয়ে শেষ পর্যন্ত দেশে শান্তিপূর্ণভাবে একটি অবাধ, সুষ্ঠু এবং নিরপেক্ষ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে। এজন্য অন্তর্বর্তীকালীন সরকার এবং নির্বাচন কমিশনকে বিশেষ ধন্যবাদ জানাই। জনগণের প্রত্যাশিত এই নির্বাচন অনুষ্ঠানের জন্য গণতন্ত্রের ইতিহাসে আপনাদের অবদান স্মরণীয় হয়ে থাকবে। নিরপেক্ষ নির্বাচন অনুষ্ঠানের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বিচার বিভাগীয় কর্মকর্তা, জনপ্রশাসন, সশস্ত্র বাহিনী এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সকল কর্মকর্তা সদস্য এবং রিটার্নিং অফিসার, সহকারী রিটার্নিং অফিসার, প্রিজাইডিং অফিসার, সহকারী প্রিজাইডিং অফিসার এবং পোলিং অফিসারসহ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিবর্গ আপনাদের আন্তরিকতা এবং দায়িত্বশীল ভূমিকা ছাড়া অবাধ এবং সুষ্ঠু নির্বাচন সম্ভব হতো না। আপনাদেরকে অসংখ্য ধন্যবাদ।
তারেক রহমান বলেন, এই নির্বাচনে দেশি এবং বিদেশি গণমাধ্যম এবং পর্যবেক্ষকদের ভূমিকাও ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আপনাদের প্রতিও রইল অকৃত্রিম শুভেচ্ছা। ৭১-এর স্বাধীনতা অর্জনের যুদ্ধ থেকে ২০২৪ সালে দেশ এবং জনগণের স্বাধীনতা রক্ষার যুদ্ধ— এই দীর্ঘ সময়ে দেশ গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে যারা শহীদ হয়েছেন, হতাহত হয়েছেন, যাদের রক্ত মাড়িয়ে কষ্টের সিঁড়ি বেয়ে আজকের এই গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ, সেই সব বীর শহীদদের প্রতি জানাই গভীর শ্রদ্ধা। মহান আল্লাহর দরবারে তাদের মাগফেরাত কামনা করছি। যারা মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে প্রাণ দিয়েছেন, হতাহত হয়েছেন দেশের গণতন্ত্রকামী জনগণ আপনাদের ভূমিকা কে গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করবে ইনশাআল্লাহ।
‘প্রিয় দেশবাসী, বিএনপি রাষ্ট্র মেরামতের রূপরেখা উপস্থাপন করেছিল। অন্যান্য গণতান্ত্রিক দল এবং সারাদেশের জনগণের সঙ্গে মতবিনিময়ের মাধ্যমে ৩১ দফা প্রণয়ন করেছিল। ৩১ দফার আলোকে ঘোষণা করা হয়েছে দলীয় ইশতেহার। একই সঙ্গে কয়েকটি বিষয়ে নোট অব ডিসেন্ট দিয়ে বিএনপি জুলাই সনদেও স্বাক্ষর করেছে। আমরা জনগণের কাছে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ প্রত্যাশিত প্রতিটি অঙ্গীকার পর্যায়ক্রমিকভাবে বাস্তবায়ন করব ইনশাআল্লাহ।’
বিএনপি চেয়ারম্যান আরও বলেন, সারাদেশে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল বিএনপির সর্বস্তরের নেতা-কর্মী সমর্থক ছাড়াও দেশের গণতন্ত্রকামী জনগণের সামনে আজকের এই সময়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং আনন্দের। এমন এক আনন্দঘন পরিবেশে আপসহীন দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার অনুপস্থিতি আমাদেরকে করেছে ভারাক্রান্ত। রাষ্ট্র ও রাজনীতিতে জনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠার এমন একটি গণতান্ত্রিক সময়ের প্রত্যাশায় তিনি ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে আপোসহীন লড়াই করেছিলেন। স্বৈরাচার কিংবা ফ্যাসিবাদের সঙ্গে কখনো আপোস করেননি। দেশ এবং জনগণের স্বার্থের প্রশ্নে বরাবরই তিনি ছিলেন অটল অবিচল। আমরা আল্লাহর দরবারে মরহুমা খালেদা জিয়ার মাগফেরাত কামনা করছি।
তারেক রহমান বলেন, প্রিয় দেশবাসী, স্বাধীনতার ঘোষকের প্রতিষ্ঠিত বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল বিএনপিকে দেশের জনগণ আবারও রাষ্ট্র পরিচালনার ম্যান্ডেট দিয়েছেন। জনগণ বিএনপির প্রতি যে বিশ্বাস এবং ভালোবাসা দেখিয়েছেন। এবার জনগণের জীবনমান উন্নয়নের জন্য নিরলস কাজের মাধ্যমে জনগণের এই বিশ্বাস এবং ভালোবাসা প্রতিদান দিতে আমাদেরকে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করতে হবে। এবার আমি সারাদেশের বিএনপির সর্বস্তরের নেতা-কর্মী সমর্থকদের ধন্যবাদ জানিয়ে বলতে চাই, শত নির্যাতন, নিপীড়নের পরও আপনারা রাজপথ ছাড়েননি। গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে অটুট ছিলেন, অনড় ছিলেন। এবার দেশ গড়ার পালা আমাদের। দেশ পুনর্গঠনের এই যাত্রায় আপনি-আমি আমাদের প্রত্যেককে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে অবশ্যই।
তারেক রহমান আরও বলেন, আমরা গণতন্ত্র এবং মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার এই বিজয়কে শান্তভাবে, শান্তির সঙ্গে, দায়িত্বশীলতার মাধ্যমে উদযাপন করতে চাই। নির্বাচনোত্তর বাংলাদেশে যাতে কোথাও কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা না ঘটে এজন্য শত উসকানির মুখেও আমি সারা বাংলাদেশে বিএনপির সর্বস্তরের নেতা-কর্মীদের শান্ত ও সতর্ক থাকার আহ্বান জানাচ্ছি। কোনো অপশক্তি যাতে পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটানোর সুযোগ নিতে না পারে এজন্য নির্বাচনোত্তর নিরঙ্কুশ বিজয় অর্জনের পরও আমি সারাদেশে বিএনপি এবং জোটভুক্ত দলের সর্বস্তরের নেতা-কর্মীদের বিজয় মিছিল বের করতে নিষেধ করেছিলাম। আমরা আল্লাহর দরবারে শুকরিয়া আদায়ের মাধ্যমে বিজয় উৎসব পালন করেছি। আমার বক্তব্য স্পষ্ট, যেকোনো মূল্যে অবশ্যই শান্তি এবং শৃঙ্খলা বজায় রাখতে হবে। কোনো রকমের অন্যায় কিংবা বেআইনি কর্মকাণ্ড আমরা বরদাস্ত করব না। দল-মত-ধর্ম-বর্ণ কিংবা ভিন্ন মত যাই থাকুক কোনো অজুহাতে অবশ্যই দুর্বলের উপরে সবলের আক্রমণ আমরা মেনে নেব না।
বিএনপি চেয়ারম্যান বলেন, ন্যায়পরায়ণতা হবে আদর্শ। আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করা না গেলে আমাদের সকল চেষ্টা ব্যর্থ হয়ে যেতে পারে। আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় সরকারি দল কিংবা বিরোধী দল, অন্য মত কিংবা ভিন্ন মত প্রতিটি বাংলাদেশি নাগরিকের জন্য আইন সমান। আইনের প্রয়োগ হবে বিধিবদ্ধ নিয়মে। নির্বাচনে একে অপরের বিরুদ্ধে কিংবা এক দল আর এক দলের বিরুদ্ধে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে গিয়ে নির্বাচনের মাঠে হয়তো কোথাও কোথাও নিজেদের মধ্যে ভুল বোঝাবুঝির সৃষ্টি হয়ে থাকতে পারে। তবে এ ধরনের বিরোধ যেন প্রতিশোধ প্রতিহিংসায় রূপ না নেয় সে ব্যাপারে সবাইকে সতর্ক থাকার জন্য আমি আন্তরিকভাবে অনুরোধ করছি।

নিজস্ব প্রতিবেদক