ভ্রাম্যমাণ ট্রাকে টিসিবির পণ্য মিললেও চাহিদার তুলনায় সরবরাহ কম
রমজান মাস মানেই নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের বাজারে বাড়তি দাম, বাড়তি চাহিদা। পবিত্র এই মাসে সারা দেশের সঙ্গে নওগাঁর নিম্নবিত্ত ও মধ্যবিত্ত শ্রেণির মানুষদের বাজারে গিয়ে প্রয়োজনীয় পণ্য কিনতে হিমশিম খেতে হয়। তাই রমজান মাসে জেলাজুড়ে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্য সহনীয় রাখতে জেলার ১১টি উপজেলার ৯৯টি ইউনিয়ন ও তিনটি পৌরসভায় ভ্রাম্যমাণ ট্রাকের মাধ্যমে গত ১৭ ফেব্রুয়ারি থেকে টিসিবির পণ্য বিক্রি শুরু হয়েছে। এই কার্যক্রম চলবে আগামী ১২ মার্চ পর্যন্ত।
সহনীয় মূল্যে টিসিবির প্রয়োজনীয় পাঁচটি পণ্য পেয়ে খেটে খাওয়া নিম্ন ও সীমিত আয়ের মানুষদের মাঝে অনেকটাই স্বস্তি ফিরেছে। এমন কার্যক্রমে কিছুটা স্বস্তি মিললেও এসব পণ্য পেতে অনেকটাই নাভিশ্বাসে পড়তে হচ্ছে ভোক্তাদের। চাহিদার তুলনায় বরাদ্দ অনেক কম হওয়ার কারণে আগে গেলে আগে পাবে এমন যুদ্ধে জয় করতে ভোররাত থেকেই অনেকেই লাইন দিয়ে অপেক্ষা করছেন টিসিবির পণ্য পেতে।
আবার টিসিবির এই পণ্য অনেকের জন্য আয়ের মৌসুমি উৎসে পরিণত হয়েছে। টিসিবির এই পণ্য পেতে লাইনে দাঁড়িয়ে অনেক মধ্যবিত্তদেরও অপেক্ষা করতে দেখা গেছে। পুরো রমজান মাস জুড়ে জেলার ১১টি উপজেলার প্রত্যক ইউনিয়ন ও পৌর সভার একটি করে নির্দিষ্ট স্থানে নির্দিষ্ট দিনে এই টিসিবির পণ্য বিক্রি করা হচ্ছে। বিভিন্ন এলাকায় টিসিবির পণ্য ক্রয় করা ভোক্তারা যেমন স্বস্তি প্রকাশ করেছেন আবার অভিযোগও রয়েছে বিস্তর। বিশেষ করে ডিলাররা পণ্য বিক্রিতে সময়সূচি মেনে না চলার কারণে ঘণ্টার পর ঘণ্টা ভোক্তাদের অপেক্ষায় থাকতে হয়। এতে করে নিম্নআয়ের মানুষদের চরম ভোগান্তিতে পড়তে হচ্ছে। যদি ডিলাররা নিয়ম মেনে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে পণ্য বিক্রি করেন তাহলে ভোক্তাদের ভোগান্তি অনেকাংশে কমতো বলে দাবি ভোক্তাদের।
রাণীনগর উপজেলা পরিষদ প্রাঙ্গণে টিসিবির ট্রাকের জন্য অপেক্ষা করছিলেন প্রায় দুই শতাধিক নারী-পুরুষ। ট্রাক দাঁড়ানোর স্থানে কেউ কেউ ইট রেখে সিরিয়াল দিয়ে বসে আছেন। আবার কেউ অপেক্ষা করতে করতে যখন শুনছেন ট্রাক চলে এসেছে তখন দৌড়ে গিয়ে লাইনে ‘কে আগে, কে পরে’ এর জন্য অনেকে বাকবিতণ্ডায় জড়িয়ে পড়েন। নিম্নআয়ের এই মানুষদের কেউ এসেছেন ভোরে, কেউ এসেছেন সকাল ছয়টায়, আবার কেউ এসেছেন সকাল আটটায় কিংবা নয়টায়। অনেকে অপেক্ষা করতে করতে হতবিহ্বল হয়ে পড়েন। তবুও সাশ্রয়ী মূল্যে পণ্য পাওয়ার আশায় ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করছেন খেটে খাওয়া শ্রমজীবী ও নিম্ন আয়ের মানুষরা।
উপজেলার খট্টেশ্বর গ্রামের ভ্যানচালক লসির উদ্দিন বলেন, তিনি ভ্যান গাড়ি চালানো বন্ধ রেখে টিসিবির পণ্য নিতে সূর্য ওঠার আগে থেকে অপেক্ষা করছেন। ভ্যান চালিয়ে তাকে সংসার চালাতে হয়। রমজান মাস এলেই বাজারে জিনিসের দামে আগুন লাগে। তাই কিছুটা সাশ্রয়ী দামে টিসিবির পণ্য পেতে লাইন দিয়ে বসে আছেন। এতে করে তার অনেক খরচ বেঁচে যাবে। তবে বরাদ্দ আরো বেশি করে দিলে খেটে খাওয়া অনেক মানুষ স্বস্তি পেতো।
পশ্চিম বালুভরা গ্রামের ৭৫ বছরের ভিক্ষুক সখিনা বিবি বয়সের ভারে ঠিকমতো হাঁটতেও পারেন না। খবর পেয়ে টাকা ধার করে লাঠিতে ভর করে এসেছিলেন উপজেলা পরিষদ প্রাঙ্গণে টিসিবির পণ্য নিতে। টিসিবির ওই ট্রাকের পেছনে তখন অন্তত তিন শতাধিক মানুষের ভিড় ছিল। ভিড়ের মধ্যে ধাক্কাধাক্কিতে কয়েকবার মেয়েদের সারি থেকে ছিটকে যান। ধাক্কাধাক্কিতে সারি থেকে কয়েকবার ছিটকে পড়ে গেলেও শেষ পর্যন্ত তিনি টিসিবির পণ্য পেয়েছেন।
সিম্বা গ্রামের দিনমজুর রহিদুল ইসলাম জানান, গতবার রোজায় টিসিবির জিনিস বিক্রির আগে সবার হাতে হাতে সিরিয়াল অনুযায়ী স্লিপ দিয়ে দিতো। এবার সেটা করেনি। এ কারণে লাইনে দাঁড়ানো নিয়ে বিশৃঙ্খলা হয়েছে। ধাক্কাধাক্কি করে লাইনে যে আগে দাঁড়াতে পারছে, সেই আগে পণ্য পাচ্ছে। যদি নিয়ম মাফিক পণ্য দেওয়া হয় তাহলে কাউকেই হয়রানির শিকার হতে হতো না। তাই আগামীতে ভোগান্তি আর হয়রানি বন্ধে নিয়মমাফিক পণ্য বিতরণ করতে তিনি সংশ্লিষ্টদের সুদৃষ্টি কামনা করেন।
রাণীনগর উপজেলার টিসিবির ডিলার আব্দুর রাজ্জাক মোল্লা বলেন, প্রতিদিন টিসিবির পণ্য বগুড়া আঞ্চলিক কার্যালয় থেকে নিয়ে আসতে হয়। অনেক সময় বগুড়া থেকে ট্রাক আসতে আসতে দুপুর হয়ে যায়। ফলে সকাল ১০টা থেকে বিতরণ করার কথা থাকলেও তা সম্ভব হয়ে ওঠে না। এছাড়া চাহিদার তুলনায় পণ্য কম থাকায় বিশৃঙ্খলার সৃষ্টি হয়। গত বারের মতো এক সাথে চার থেকে পাঁচটা পয়েন্টে পণ্য বিক্রি করা গেলে এতো চাপ হতো না। মানুষ শান্তিমতো পণ্য কিনতে পারতেন। সাধ্যমতো লাইনে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষদের সিরিয়াল বজায় রেখে পণ্য বিক্রি করার চেষ্টা করা হয়। এছাড়া বয়স্ক কিংবা প্রতিবন্ধী মানুষদের অগ্রাধিকার ভিত্তিতে পণ্য দেওয়া হয়। আগামীতে ভোক্তাদের ভোগান্তি ও হয়রানি কমাতে নিয়ম মাফিক পণ্য বিক্রির চেষ্টা অব্যাহত রাখা হবে।
জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম জানান, ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশ (টিসিবি) এর ডিলারদের মাধ্যমে জেলার খেটে খাওয়া শ্রমজীবী নিম্ন ও মধ্যম আয়ের মানুষরা সাশ্রয়ী মূল্য ৮০ টাকা দরে ১ কেজি চিনি, ৭০ টাকা দরে ২ কেজি মশুর ডাল, ১১৫ টাকা দরে ২ লিটার ভোজ্য তেল, ৬০ টাকা দরে ১ কেজি ছোলা ও ৮০ টাকা দরে আধা কেজি খেজুর পাচ্ছেন। প্রতি ট্রাক থেকে চারশ মানুষ এই পণ্যগুলো নিতে পারছেন। যেহেতু চাহিদার তুলনায় পণ্য অনেক কম, তাই ধৈর্য সহকারে ভোক্তাদের পণ্য সংগ্রহ করার অনুরোধ। ভোগান্তি ও হয়রানি এড়িয়ে জেলাজুড়ে খোলা ট্রাকে নিয়ম মেনে টিসিবির পণ্য বিক্রি করতে ডিলারদের প্রতি কঠোর নির্দেশনা প্রদান করা হয়েছে। কোন স্থানে কোন অনিয়মের সত্যতা পাওয়া গেলে ওই ডিলারের বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

আসাদুর রহমান জয়, নওগাঁ