৭৪টি ফ্লাইট বাতিল, যাত্রীদের ভোগান্তি-দুর্ভোগ
ইরানে হামলা ও মধ্য প্রাচ্যের কয়েকটি দেশে পাল্টা হামলার পর বাংলাদেশ থেকে এখন পর্যন্ত ৭৪টি ফ্লাইট বাতিল করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষ৷
ইরান, ইরাক, কুয়েত, সংযুক্ত আরব আমিরাত, বাহরাইন, কাতার ও জর্ডানের আকাশসীমা বন্ধ করে দেয়ায় এই পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে বলে ডয়চে ভেলেকে জানিয়েছেন শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমান বন্দরের নির্বাহী পরিচালক গ্রুপ ক্যাপ্টেন এস এম রাগীব সামাদ৷
এর ফলে ঢাকায় শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমান বন্দরে মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে যাওয়ার জন্য অপেক্ষমান যাত্রীরা বিপাকে পড়েছেন৷ কেউ কেউ বিমান বন্দরে শনিবার থেকে অপেক্ষা করছেন৷ তারা ঠিক জানেন না কখন যেতে পারবেন৷ তাদের থাকার কোনো ব্যবস্থাও করা হচ্ছেনা বলে অভিযোগ তাদের৷ তাদের বিমান বন্দর থেকে ট্রাভেল এজেন্ট - যাদের কাছ থেকে টিকিটি কিনেছেন তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করতে বলা হচ্ছে৷ অন্যদিকে সিভিল এভিয়েশন ও বিমান বন্দরের পক্ষ থেকে খোঁজ খবর নিয়ে যাত্রীদের বিমানবন্দরে আসতে বলা হয়েছে৷ তাদের বিমানবন্দরে ভিড় না করার জন্য আহ্বান জানানো হয়েছে৷
রোববার (১ মার্চ) শাহজালাল বিমান বন্দরে গিয়ে দেখা যায় অনেকই অপেক্ষা করছেন৷ তাদের মধ্যে নারীও রয়েছেন৷ তারা মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে যাবেন৷ কেউ নতুন কাজ নিয়ে যাওয়ার অপেক্ষায়৷ আবার কেউ ছুটিতে দেশে এসেছিলেন৷ কিন্তু এখন তারা বিপাকে পড়েছেন৷ দুপুর দেড়টার দিকে কথা হয় হৃদয় হোসেনের সঙ্গে৷ তিনি শারজাহ হয়ে মদিনায় যাবেন৷ কিন্তু তখনো তিনি জানেন না তিনি যেতে পারবেন কিনা৷ তবুও তিনি এয়ায়পোর্টে এসেছেন বিকেল ৪টায় তার ফ্লাইটের সময় দেয়া হয়েছে৷
হৃদয় হোসেন বলেন, ‘‘অনিশ্চিত অবস্থার মধ্যে আছি৷ তবুও সকালেই এসে অপেক্ষা করছি৷ কোনো খোঁজ পাচ্ছি না৷ জানি না শেষ পর্যন্ত যেতে পারব কিনা৷”
আরেক তরুণ একই গন্তব্যে যাবেন৷ তার ফ্লাইট রাত ৯টায়৷ তবুও অনিশ্চয়তার কারণে আগেই এসেছেন৷ খোঁজ খবর নিচ্ছেন৷
মোখলেসুর রহমান দুবাই যাবেন৷ তিনি সেখানে কাজ করেন৷ দেশে ছুটিতে এসেছিলেন৷ রোববার সকাল ১০টার দিকে তিনি বিমান বন্দরে আসেন৷ বিকেল ৪টার দিকে তার ফ্লাইট ছিল৷ কিন্তু আসার পর তাকে জানানো হয় ওই ফ্লাইট বাতিল হয়েছে৷ আগে জানানো হয়নি৷ তিনি বলেন, ‘‘আমাদের যাদের কাছ থেকে টিকিট কেটেছি তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করতে বলা হয়৷ তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করলে আমাদের বিমান বন্দরেই অপেক্ষা করতে বলা হয়৷ দুবাই এয়ারপোর্টের পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে যাওয়ার ব্যবস্থা করা হবে৷ কিন্তু সেটা তখন তা তো কেউ বলতে পারছে না৷”
আরেকজন কাজ নিয়ে সৌদি আরব যাবেন৷ সকালে ফ্লাইট ছিলো৷ কিন্তু সেটা বাতিল হয়েছে৷ দুপুর দেড়টার দিকে তিনি জানান, তাদের পরবর্তী ফ্লাইট কখন হতে পারে তা তারা জানেন না৷ তবুও বিমানবন্দরে বসে আছেন৷
এরই মধ্যে বেসামরিক বিমান পরিবহণমন্ত্রী আফরোজা খানম, প্রতিমন্ত্রী এম রশিদুল মিল্লাত এবং প্রবাসী কল্যাণমন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী বিমানবন্দর পরিদর্শন করেছেন৷ তবে তাতে যাত্রীদের ভোগান্তি কমছে না৷
যাত্রীদের অভিযোগ, পরিস্থিতির গভীরতা তারাও বুঝতে পারছেন৷ কিন্তু তারা কোনো তথ্য পাচ্ছেন না৷ ‘‘আমরা কার সঙ্গে যোগাযোগ করব তাও বুঝে উঠতে পরছি না”, বলেন তাদের একজন৷
শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমান বন্দরের নির্বাহী পরিচালক গ্রুপ ক্যাপ্টেন এস এম রাগীব সামাদ বলেন, ‘‘২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে ২ মার্চ পর্যন্ত ৩ দিনে মোট ৭৪টি ফ্লাইট বাতিল করেছে বিভিন্ন এয়ারলাইন্স৷ তাদের কাছ থেকে আমরা এই তথ্য পেয়েছি৷”
তাদের দেওয়া তথ্য মতে- ২৮ ফেব্রুয়ারি শনিবার মোট ২৩টি ফ্লাইট বাতিল হয়৷ এরমধ্যে রয়েছে এমিরেটসের একটি, গালফ এয়ারের একটি, ফ্লাই দুবাইয়ের একটি, এয়ার অ্যারাবিয়ার তিনটি, ইউএস-বাংলা এয়ারলাইন্সের ছয়টি এবং বিমানের ১১টি৷
১ মার্চ রোববার বাতিল করা হয়েছে ৪০টি ফ্লাইট৷ এরমধ্যে জাজিরা এয়ারওয়েজের দুটি, এমিরেটস এয়ার লাইন্সের পাঁচটি, গালফ এয়ারের দুটি, ফ্লাই দুবাইয়ের চারটি, কাতার এয়ার ওয়েজের দুটি, সালাম এয়ারের দুটি, এয়ার অ্যারাবিয়ার আটটি, কুয়েত এয়ার ওয়েজের দুটি, ইউএস-বাংলা এয়ারলাইন্সের চারটি ও বিমানের ৯টি৷
২ মার্চ সোমবার ১১টি ফ্লাইট বাতিল করার আগাম ঘোষণা দেওয়া হয়েছে৷ তার মধ্যে আছে- কাতার এয়ার ওয়েজের চারটি, এমিরেটস এয়ারলাইন্সের পাঁচটি এবং গালফ এয়ারের দুটি৷
ইউএস-বাংলা এয়ার লাইন্সের পরিচালক (জনসংযোগ) মো. কামরুল ইসলাম ডয়চে ভেলেকে জানান, ‘‘শনিবার আমরা আমাদের সব ফ্লাইটই বাতিল করে দিয়েছি৷ কিন্তু রোববার যেহেতু সৌদি আরব ও ওমানের আকাশ এখন ফ্রি আছে তাই জেদ্দা, রিয়াদ এবং মাসকাটের ফ্লাইটগুলো আজকে (রোববার) থেকে আবার চালু করে দিয়েছি৷ দুবাই, শারজাহ, আবুধাবি ও দোহার ফ্লাইটগুলো স্থগিত আছে৷ পরিস্থিতি স্বাভাবিক হওয়ার ওপর নির্ভর করছে কবে চালু করা যাবে৷”
মো. কামরুল ইসলাম বলেন, ‘‘যেসব গন্তব্যে আজকে (রোববার) থেকে আমাদের ফ্লাইট চালু হয়েছে, সেই সব ফ্লাইটের যাত্রী যারা আটকা পড়েছেন তাদের আমরা যাওয়ার ব্যবস্থা করছি৷ যাদের ভিসা সমস্যা আছে তাও আমরা দেখছি৷ কিন্তু সমস্যা হচ্ছে তারা বিভিন্ন ট্রাভেল এজেন্টদের মাধ্যমে টিকিট কিনেছেন৷ তাদের ফোন নাম্বারও আমাদের কাছে নেই৷ ফলে যোগাযোগে সমস্যা হচ্ছে৷”
তার কথা, ‘‘অনেক যাত্রী বিমানবন্দরে এসে বিপাকে পড়েছেন৷ আসলে পরিস্থিতি তো কী হবে আমরাও জানতাম না৷ আর আমরা যে তাদের বিমানবন্দরে আসতে নিষেধ করব তাদের ফোন নম্বরও আমাদের কাছে ছিল না৷ ফলে তাদের ভোগান্তি হয়েছে৷ তাদের জন্য আমরা কিছু করতে পারিনি৷”
বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের জনসংযোগ ব্যাবস্থাপক আনন্দ সান্যাল ডয়চে ভেলেকে বলেন, ‘‘দোহা, দুবাই এবং আবুধাবি এই তিনটি গন্তব্য ছাড়া মধ্যপ্রাচ্যের আর যেসব দেশে আমাদের ফ্লাইট আছে সেগুলো আমরা চালু করে দিচ্ছি৷ তবে ওই তিনটিতে কবে চালু হবে তা পরিস্থিতির ওপর নির্ভর করছে৷”
সিভিল অ্যাভিয়েশনের একজন কর্মকর্তা জানান, এখন সৌদি আরব এবং ওমানের আকাশ নিরাপদ এবং সেখানে কোনো নিষেধাজ্ঞা নাই ফলে অন্যান্য সব এয়ারলাইন্সই ঢাকা থেকে ওই রুটে ফ্লাইট পরিচালনা ফের শুরু করে দিয়েছে বা করবে৷
বেসামরিক বিমান পরিবহণ প্রতিমন্ত্রী এম রশিদুল মিল্লাত ডয়চে ভেলেকে বলেন, ‘‘মধ্যপ্রাচ্যের যেসব দেশের আকাশ নিরাপদ না এবং নিষেধাজ্ঞা আছে সেখানে তো ফ্লাইট অপারেশন সম্ভব নয়৷ তবে কয়েকটি রুটে আবার চালু হয়েছে৷ সেইসব রুটের যারা আটকা পড়েছেন তারা যাতে দ্রুত যেতে পারেন আমরা সেই ব্যবস্থা করছি৷ আর আমরা যাত্রীরা যাতে সঠিক তথ্য পান তার ব্যবস্থা করছি৷ যাত্রীরা যেন খবর নিয়ে বিমান বন্দরে আসেন৷ আমরা নিয়মিত আপডেট দেব৷”
এক প্রশ্নের জবাবে এম রশিদুল মিল্লাত বলেন, ‘‘শনিবার রাতে যারা বিমানবন্দরে আটকে পড়েন তাদের কাছে আমরা গিয়েছি৷ কথা বলেছি৷ কিছু যাত্রীকে হোটেলে থাকারও ব্যবস্থা করা হয়েছে৷ পরিস্থিতির ওপর তো এখন অনেক কিছু নির্ভর করছে৷ আমরা বিকল্প চিন্তাও করছি৷ বিশেষ করে যে যাত্রীরা মধ্য প্রচ্যের বিভন্ন দেশকে ট্রানজিট হিসাবে ব্যবহার করে ইউরোপ বা অন্য কোনো দেশের যাত্রী৷”
মধ্যপ্রাচ্যের অধিকাংশ বাংলাদেশি যাত্রীই বাংলাদেশের প্রবাসী কর্মী৷ তবে এর বাইরেও ইউরোপসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে যেতে অনেক এয়ারলাইন্সই মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন বিমান বন্দরকে ট্রানজিট হিসাবে ব্যবহার করেন৷ সেই যাত্রীরাও আটকা পড়েছেন৷

ডয়চে ভেলে