‘বিশেষ ব্যক্তিদের সুযোগ দিতে দুটি সংস্থার নিয়োগে বয়সসীমা তুলে দেওয়া হয়েছে’
বিশেষ ব্যক্তিদের সুযোগ করে দিতে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন এবং বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান ও সদস্য পদে বয়সসীমা তুলে দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ করেছে বিরোধী দল।
আজ বৃহস্পতিবার (৩০ এপ্রিল) জাতীয় সংসদে রাষ্ট্রায়ত্ত্ব এ দুটি সংস্থা সম্পর্কিত দুটি পৃথক সংশোধনী বিল পাস হওয়ার পর অনির্ধারিত আলোচনায় এ অভিযোগ তোলা হয়। এ সময় ‘দলীয় বিবেচনায়’ নিয়োগ দেওয়া হয়েছে অভিযোগ তুলে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরের অপরসারণের দাবি তোলা হয়।
ডেপুটি স্পিকার কায়সার কামালের সভাপতিত্বে বৃহস্পতিবার সংসদে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (সংশোধন) বিল এবং ২০২৬ এবং বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ (সংশোধন) বিল, ২০২৬ পাস হয়। এতে দুই নিয়ন্ত্রক সংস্থায় চেয়ারম্যানসহ সংশ্লিষ্টদের বয়সসীমা তুলে দেওয়া হয়েছে। এ বিল দুটির বিষয়ে স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য রুমিন ফারহানার সংশোধনী প্রস্তাব দিয়েছিলেন। নিয়ম অনুসারে তার সংশোধনী প্রস্তাব নিষ্পত্তি করে বিল দুটি পাস হয়। রুমিন ফারহানা তার সংশোধনী প্রস্তাবে আলোচনারও সুযোগ পান। জামায়াতে ইসলামী বা এনসিপির কোনো সদস্যের সংশোধনী প্রস্তাব না থাকায় আলোচনার সুযোগ ছিল না। তবে বিল দুটি পাস হওয়ার পর পয়েন্ট অব অর্ডারে দাঁড়িয়ে এনসিপির সংসদ সদস্য আখতার হোসেন বয়স বাড়ানোর প্রসঙ্গ টেনে উদ্বেগ জানান।
তিনি বলেন, সরকার দল সংসদে সংখ্যাগরিষ্ঠ হওয়ায় তারা চাইলে আইন পাস করতে পারে। তবে যে দুটি বিল পাস হল, তার বিষয়বস্তু নিয়ে যথেষ্ট ব্যাখ্যা হয়নি। আইন দুইটার ক্ষেত্রে বয়সের যে বাধ্যতাকতা ছিল সেই বাধ্যতাগুলোকে উঠিয়ে নেওয়া হয়েছে। সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের চেয়ারম্যান ও সদস্যদের ক্ষেত্রে ৬৫ বছরের এবং বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষের ক্ষেত্রে ৬৭ বছরের বয়সসীমা ছিল, সেটিই তুলে দেওয়া হয়েছে।
বিল পাসের সময় অর্থমন্ত্রীর দেওয়া বক্তব্যের প্রসঙ্গ টেনে আখতার বলেন, সরকার বলছে যোগ্য ও দক্ষ লোক আনার জন্য বয়সসীমা তোলা হচ্ছে। তবে প্রশ্ন হল, এটি কোনো নীতির ভিত্তিতে হচ্ছে, নাকি নির্দিষ্ট কাউকে সামনে রেখে করা হচ্ছে।
তিনি বলেন, যেভাবে বাংলাদেশ ব্যাংকে একটা নিয়োগ হয়েছে সেভাবে যদি কোনো বিশেষ ব্যক্তিদেরকে মাথায় রেখে বয়সের বাধ্যবাধকতা উঠিয়ে দেওয়া হয় তাহলে যে দক্ষ ও যোগ্য লোকের কথা বলা হচ্ছে সেই জায়গাটাতে বৈপরীত্য তৈরি করবে।
শেয়ার মার্কেট ও বীমা কর্পোরেশনের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, এগুলো কিন্তু আর্থিক প্রতিষ্ঠান। দেশের অর্থ সম্পদগুলো যদি এখান থেকে লুটপাটের মত কোনো পরিবেশ ভবিষ্যতে তৈরি হয় তার জন্য কিন্তু সরকার দলকে দায়ী থাকতে হবে।
জবাবে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, বিল দুটি কেন আনা হয়েছে, তা তিনি আগেই পরিষ্কার করেছেন। ১৯৯৩ সালে আইনটি করার সময়ে গড় বয়স ও কর্মক্ষমতার বাস্তবতা ভিন্ন ছিল। আপনার এই বিলটা যখন ৯৩ তে হলো সিকিউরিটি অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন তখন গড় বয়স ছিল ৫৭ বছর। এখন গড় বয়স হচ্ছে ৭২ বছর। আপনি কি এই লোকগুলোকে কর্মকাণ্ডের বাইরে রাখতে চান? বাংলাদশের এই নাগরিকগুলোকে, এই অভিজ্ঞ লোকগুলোকে, তাদেরকে কর্মকাণ্ডের বাইরে রাখতে চান?
তিনি আরও বলেন, বিশ্বের প্রায় প্রত্যেকটি দেশে যেখানে সাকসেসফুলি সিকিউরিটি এক্সচেঞ্জ কমিশন অপারেট করছে, তাদের এখানে কোনো বয়সসীমা নেই। তারা সফলভাবে এগুলো পরিচালনা করছে। পেশাদার প্রতিষ্ঠানে বয়সসীমা বেঁধে দিলে যোগ্য ব্যক্তিদের কাজ করার ক্ষেত্রে সীমাবদ্ধতা তৈরি হয়। একই যুক্তি বীমা খাতের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য।
অর্থমন্ত্রী বলেন, এখানে ইমোশনের কোনো বিষয় নাই। দিস ইজ এ প্রফেশনাল জব এবং একটা ইকোনমিকে প্রফেশনালি চালাতে গেলে এই পরিবর্তন আনতে হবে।
এরপর বিরোধীদলীয় নেতা শফিকুর রহমান বলেন, সময় সংকটের কারণে আগের অনেক আইন প্রণয়নের ক্ষেত্রে বিরোধী দল তাদের অধিকার পুরোপুরি প্রয়োগ করতে পারেনি, কিন্তু এই দুই বিলের ক্ষেত্রে তেমন কোনো প্রেক্ষাপট ছিল না। তার অভিযোগ, এখানে বিরোধী দলের অধিকার খর্ব হয়েছে।
তিনি বলেন, সরকারের সাম্প্রতিক বিভিন্ন পদক্ষেপ জনগণের আকাঙ্ক্ষার বিপরীতে গেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর নিয়োগের প্রসঙ্গ টেনে তিনি প্রশ্ন তোলেন, যোগ্যতার নামে বাছাই এভাবে চললে দেশ কীভাবে এগোবে।
বিরোধীদলীয় নেতা বলেন, আমরা তো কার ইনটেনশন কি সেটা দেখতে পারব না। এটা মনের ব্যাপার। আমরা দেখব তার প্রকাশটাকে, বাস্তবায়নটাকে, কিভাবে এটা রিফ্লেক্ট করছে সমাজে।
জবাবে অর্থমন্ত্রী বলেন, বিল পাস হওয়ার পর এ ধরনের আলোচনা কার্যপ্রণালির বিধির বাইরে, তবু প্রশ্ন ওঠায় তিনি উত্তর দিচ্ছেন। তিনি দাবি করেন, বিএনপি সরকারগুলোর সময় বাংলাদেশ ব্যাংক ও সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনে সব নিয়োগই ছিল ‘নন পলিটিক্যাল এপয়েন্টমেন্ট’।
তিনি বলেন, বিএনপির নিয়োগে কোনো সময় রাজনৈতিক বিবেচনা করা হয় নাই এবং যোগ্য ব্যক্তিতে সেখানে দেওয়া হয়েছে। সেই ধারা এই সরকার অব্যাহত রাখবে।
একই সঙ্গে তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রী সিদ্ধান্ত দিয়েছেন, আর্থিক সেক্টরে কোনো রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বকে নিয়োগ দেওয়া হবে না।
পরে বিরোধী দলের উপনেতা সৈয়দ আবদুল্লাহ মোহাম্মদ তাহের বলেন, প্রধানমন্ত্রীর এমন সিদ্ধান্ত থাকলে তারা সেটিকে স্বাগত জানায়। তবে বর্তমান বাংলাদেশ ব্যাংক গভর্নরের একটি রাজনৈতিক পরিচয় আছে বলে তার জানা আছে এবং এ নিয়ে তৈরি হওয়া তথ্যগত বিভ্রান্তি দূর হওয়া উচিত।
তিনি বলেন, গভর্নর বিএনপির নির্বাচন পরিচালনা কমিটির সদস্য ছিলেন বলে যদি সত্যি হয়, তাহলে প্রধানমন্ত্রীর ঘোষিত নীতির আলোকে তার জায়গায় নতুন গভর্নর নিয়োগ দেওয়া উচিত।
স্পিকার তখন অর্থমন্ত্রীকে প্রশ্ন করেন, নির্বাচন পরিচালনা কমিটিতে থাকলে সেটি দলীয় পরিচয় কি না।
জবাবে অর্থমন্ত্রী বলেন, দলকে সমর্থন করা মানে দলের লোক না। তিনি আরও বলেন, কোনো দলের নির্বাচনী কার্যক্রমে সহায়তা করা মানেই ওই ব্যক্তি দলের সদস্য নন। তার ভাষায়, বাংলাদেশে নির্বাচনী কার্যক্রম বড় পরিসরের কাজ, সেখানে সমর্থক অনেকেই অংশ নেন, কিন্তু তাতে তারা দলীয় সদস্য হয়ে যান না।
বিল পাস
বিল দুটি পাসের মাধ্যমে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) চেয়াম্যান ও কমিশনার পদে এবং বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান ও সদস্য পদে সর্বোচ্চ বয়স সীমা তুলে দেওয়া হয়েছে।
এতদিন আইনে ছিল, কোনো ব্যক্তির বয়স ৬৫ বছর পূর্ণ হলে তিনি বাংলাদেশ সিকিউটিরিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের চেয়ারম্যান বা কমিশনার পদে নিযুক্ত হওয়ার উপযুক্ত বিবেচিত হন না বা পদে বহাল থাকতে পারেন না। বিলে এই বিধানটি বাদ দেওয়া হয়েছে।
অন্যদিকে বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ আইনে বলা ছিল, কোনো ব্যক্তির ৬৭ বছর পূর্ণ হলে তিনি বীমা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান বা সদস্য হতে পারবেন না। সংসদে পাস হওয়া বিলে এই বিধানটি বাদ দেওয়া হয়েছে।

নিজস্ব প্রতিবেদক