পশুরহাট ইজারায় দুই কোটি টাকা রাজস্ব হারাল সরকার
পবিত্র ঈদুল আজহা উপলক্ষে ঢাকা জেলার কেরানীগঞ্জ উপজেলায় ৮টি অস্থায়ী কোরবানির পশুর হাট বসলেও এবার হাট ইজারার রাজস্ব আয়ে বড় ধরনের ছন্দপতন ঘটেছে। স্থানীয় বিএনপি নেতাদের সিন্ডিকেট এবং অন্য দলের নেতাকর্মীদের দরপত্র জমাদানে বাধা ও হামলার কারণে গত বছরের তুলনায় এবার সরকারের রাজস্ব আয় কমেছে অর্ধেকেরও বেশি।
উপজেলা প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, গত বছর ২০২৫ সালে যেখানে এই হাটগুলো থেকে ৩ কোটি ৩০ লাখ টাকা রাজস্ব আদায় হয়েছিল, সেখানে চলতি বছর ২০২৬ সালে তা নেমে এসেছে মাত্র ১ কোটি ২০ লাখ ৫০ হাজার টাকায়। অর্থাৎ, শুধু কেরানীগঞ্জ উপজেলা থেকেই সরকার এবার ২ কোটি ১০ লাখ টাকার রাজস্ব হারিয়েছে।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, দক্ষিণ কেরানীগঞ্জ ও কেরানীগঞ্জ মডেল থানা এলাকার হাটগুলোর ইজারা মূল্যে নজিরবিহীন ধস নেমেছে। ২০২৫ সালে দক্ষিণ কেরানীগঞ্জের আগানগরের আমবাগিচা হাটটি ১ কোটি ৭০ লাখ টাকায় ইজারা নিয়েছিলেন আগানগর ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি আরশাদ রহমান সপু। অথচ এবার ২০২৬ সালে একই হাট মাত্র ৫৯ লাখ ৩৩ হাজার টাকায় ইজারা পেয়েছেন স্থানীয় বিএনপি নেতা ও ব্যবসায়ী মো. আনোয়ার হোসেন।
একইভাবে, গত বছর ১৫ লাখ ২৫ হাজার টাকায় ইজারা হওয়া জিনজিরা বাজারের অস্থায়ী পশুর হাটটি এবার মাত্র ৭ লাখ টাকায় ইজারা পেয়েছেন দক্ষিণ কেরানীগঞ্জ থানা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক মোজাদ্দেদ আলী বাবু। শুভাঢ্যা ইউনিয়নের হাসনাবাদ হাটটি গত বছর বিএনপি নেতা সেলিম মেম্বার ৬১ লাখ টাকায় নিলেও এবার তিনি তা পেয়েছেন মাত্র ২৩ লাখ ১০ হাজার টাকায়।
কেরানীগঞ্জ মডেল থানাধীন রোহিতপুর ইউনিয়নের নতুন সোনাকান্দার বড় হাটটি গত বছর ৬ লাখ ৫০ হাজার টাকায় ইজারা নেওয়া স্থানীয় বিএনপি নেতা শাহাবুদ্দিন মেম্বার এবার নিয়েছেন ৪ লাখ ৫০ হাজার টাকায়। গত বছর প্রথম চালু হওয়া মিলেনিয়াম সিটি হাটটি (নবাবী হাট) এনসিপি নেতা বকুল ৭১ লাখ ২৪ হাজার টাকায় ইজারা নিলেও এবার তা মাত্র ২৬ লাখ ৬০ হাজার টাকায় পেয়েছেন কেরানীগঞ্জ মডেল থানা ছাত্রদলের আহ্বায়ক সাইফুল ইসলাম। এছাড়া বাস্তা ইউনিয়নের রাজাবাড়ী হাট, রসুলপুর হাট এবং কলাতিয়া ইউনিয়নের খাড়াকান্দি হাটে এবার দরপত্রের অর্ধেক মূল্যেও কেউ টেন্ডার জমা দেয়নি। ধারণা করা হচ্ছে, এগুলো থেকে এখন সমঝোতার মাধ্যমে নামমাত্র খাস কালেকশন করা হবে।
জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য মো. ইমরান হোসেন বলেন, এনসিপির পক্ষ থেকে কেউ যেন দরপত্র কিনতে না পারে, সেজন্য বিএনপি নেতারা দল বেঁধে উপজেলা পরিষদে অবস্থান নেন। আমাদের নেতাকর্মীরা কেরানীগঞ্জ মডেল থানাধীন একটি হাটের টেন্ডার সিডিউল কিনতে গেলে বিএনপি নেতারা তাদের ওপর হামলা চালান। বিষয়টি ইউএনও, ঢাকার ডিসি এবং স্থানীয় দুই থানাকে জানানো হলেও কেউ কোনো ব্যবস্থা নেয়নি। বিগত ফ্যাসিস্ট সরকারের বিরুদ্ধে রক্ত ঝরিয়ে যে দেশ গড়ার স্বপ্ন দেখেছিলাম, বর্তমান সরকারদলীয় নেতাকর্মীদের আচরণে সেই আগের ফ্যাসিস্ট সরকারের রূপই ফুটে উঠছে।
একই কথা বলছেন জাতীয় নাগরিক পার্টির ছাত্রশক্তির কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য ও বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের (কেরানীগঞ্জ উপজেলা) আহ্বায়ক আল-আমিন মিনহাজ। তিনি বলেন, আমরা ২০২৪-এর গণঅভ্যুত্থানের পর দেশটাকে যেভাবে দেখতে চেয়েছিলাম, তা হচ্ছে না। শুধু কেরানীগঞ্জ নয়, সারা বাংলাদেশের হাটগুলোতে অন্য কোনো দল বা সাধারণ মানুষকে সিডিউল পর্যন্ত কিনতে দেওয়া হয়নি। আমাদের ওপর মব তৈরি করে বাধা দেওয়া হয়েছে। কেরানীগঞ্জের হাটগুলো থেকে সরকার ২ কোটি টাকার বেশি রাজস্ব হারিয়েছে। সারা দেশের ৫০০টিরও বেশি উপজেলায় এভাবে কত শত কোটি টাকা রাজস্ব ক্ষতি হলো, তা ভাবার বিষয়।
সমঝোতার অভিযোগের বিষয়ে দক্ষিণ কেরানীগঞ্জ থানা বিএনপির সদস্য ও হাসনাবাদ অস্থায়ী পশুর হাটের ইজারাদার মো. সেলিম মেম্বার বলেন, সমঝোতার অভিযোগ সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন ও মিথ্যা। উন্মুক্ত দরপত্রের মাধ্যমেই হাটের ইজারা দেওয়া হয়েছে। আমরা সেভাবেই ইজারা পেয়েছি।
অন্যদিকে কেরানীগঞ্জ মডেল থানাধীন মিলেনিয়াম সিটি (নবাবী হাট) অস্থায়ী পশুর হাটের ইজারাদার এবং কেরানীগঞ্জ মডেল থানা ছাত্রদলের আহ্বায়ক মো. সাইফুল ইসলামও অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, যেখানে ওপেন টেন্ডার হয়েছে, সেখানে সমঝোতার প্রশ্নই আসে না। এই হাটের জন্য একাধিক সিডিউল বিক্রি হয়েছে এবং একাধিক টেন্ডারও জমা পড়েছে। তারা বিভিন্নভাবে গুজব ছড়াচ্ছে। আমরা জানতে পেরেছি, শেষ দিন পর্যন্ত প্রায় ছয়টি সিডিউল বিক্রি হয়েছিল। অন্যরা কেনো সিডিউল কিনতে পারেননি বা টেন্ডার জমা দেননি, সেটা সম্পূর্ণ তাদের বিষয়।
এ বিষয়ে কেরানীগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. উমর ফারুক বলেন, আমাদের পক্ষ থেকে নিরাপত্তার কোনো ঘাটতি ছিল না। আর হাটের ইজারা গত বছরের চেয়ে কম হওয়ার কারণ হলো, টেন্ডার সিডিউলে যারা সর্বোচ্চ দর হেঁকেছেন, নিয়ম অনুযায়ী তারাই ইজারা পেয়েছেন।

মাসুদ রানা, ঢাকা (কেরানীগঞ্জ)