প্রভাবশালী ব্যক্তির নির্দেশ ও উসকানিতে গুলিবর্ষণে হত্যাকাণ্ড
জুলাই গণঅভ্যুত্থানে কুষ্টিয়ায় ছয়জনকে হত্যা, শেখ হাসিনার সঙ্গে ষড়যন্ত্র করে দমন-নিপীড়নে সহায়তা করা ও উসকানি দিয়ে মানবতাবিরোধী অপরাধের আটটি অভিযোগ আনা হয়েছে জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দলের (জাসদ) সভাপতি হাসানুল হক ইনুর বিরুদ্ধে।
আজ মঙ্গলবার (৩০ জুন) বেলা দেড়টার পর রায় ঘোষণা করবেন আর্ন্তজাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২। বিচারপতি নজরুল ইসলাম চৌধুরীর নেতৃত্বে তিন সদস্যর বেঞ্চ এ রায় ঘোষণা করবেন। ট্রাইব্যুনালের অপর সদস্যরা হলেন বিচারপতি মো. মঞ্জুরুল বাছিদ ও বিচারপতি নূর মোহাম্মদ শাহরিয়ার কবীর। এ মামলায় হাসানুল হক ইনু একমাত্র আসামি।
জবানবন্দিতে মামলা দশজন সাক্ষীরা ইনুর বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র, উসকানি, হত্যার সঙ্গে জড়িতের বিষয়টি তুলে ধরেন পুলিশ কর্মকর্তা হালিমা খাতুন।
ট্রাইব্যুনালে ইনুর মামলায় জবানবন্দিতে পুলিশ কর্মকর্তা হালিমা খাতুন বলেন, আমি বর্তমানে এবং ঘটনাকালীন কুষ্টিয়া জেলার ভেড়ামারা থানাধীন দশমাইল পুলিশ তদন্ত কেন্দ্রে ইনচার্জ হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলাম। বর্তমান মামলায় তদন্তকারী কর্মকর্তা তানভীর হাসান জোয়া, বিজ্ঞ প্রসিকিউটর ও তদন্ত সংস্থার কো-অর্ডিনেটর তদন্ত সংশ্লিষ্ট বিষয়ে আমাকে জিজ্ঞাসাবাদ করলে, আমি আমার বক্তব্য প্রদান করি। ২০২৪ সালের ১৫ আগস্ট এ মামলা সংক্রান্তে বিভিন্ন তথ্য-উপাত্ত সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রচারিত ও প্রকাশিত হচ্ছিল। ওই সকল সংগৃহীত ভিডিও ফুটেজ এবং স্থিরচিত্রের লিংক বা উৎস পর্যালোচনা করে জানা যায় যে, আন্দোলন দমন করার জন্য এবং নিরীহ ছাত্র-জনতার আন্দোলন নস্যাৎ করার উদ্দেশ্যে বিগত সরকারের প্রভাবশালী ব্যক্তি এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর শীর্ষ কর্মকর্তা ও কতিপয় অতিউৎসাহী কর্মকর্তা ও সদস্য কর্তৃক বেআইনি জনতাবদ্ধে গুলিবর্ষণ, গুলিবর্ষণের আদেশ এবং উসকানিমূলক বক্তব্য ও বিবৃতি প্রদান করে হত্যাকাণ্ড সংঘটিত করেছিল। উক্ত ভিডিও ফুটেজ এবং তথ্যাদি যাচাইয়ের অংশ হিসেবে আমি কুষ্টিয়া জেলার ভেড়ামারা থানাধীন দশমাইল এলাকায় ২০২৪ সালের ১৮ জুলাই সহিংসতার ঘটনাটি তদন্তকারী কর্মকর্তার নিকট সবিস্তারে বর্ণনা করি। ওইদিন আন্দোলনরত ছাত্র-জনতার শান্তিপূর্ণ মিছিলের ওপর কতিপয় উগ্র সন্ত্রাসী ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য আক্রমণ চালায়। এ আক্রমণে বহু ছাত্র-জনতা আহত হন। আমি উক্ত জবানবন্দি প্রদান করি এবং তদন্তকারী কর্মকর্তা আমার এই বক্তব্য লিপিবদ্ধ করেন।
আরও পড়ুন : জুলাইয়ে হাসিনার দমন-নিপীড়নে ‘সায় দেওয়া’ ইনুর রায় আজ
মামলার এজাহার সূত্র জানায়, ২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থান চলাকালে কুষ্টিয়ায় ছয়জন নিহতের ঘটনা এবং শেখ হাসিনার সঙ্গে কলরেকর্ডের কথোপকতনের অডিওতে আন্দোলনকারীদের দমন-নিপীড়ন ও হত্যায় উসকানি দিয়ে ষড়যন্ত্র, সহায়তার অভিযোগে মানবতাবিরোধী অপরাধে হাসানুল হক ইনুর বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে মামলা করা হয়।
২০২৫ সালের ২৫ মার্চ মামলার তদন্ত শুরু হয়। ওই বছর ১১ সেপ্টেম্বর মামলাটির তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করা হয়। পরে গত বছরের ২ নভেম্বর এ মামলায় অভিযোগ (চার্জ) গঠন করে তার বিচার শুরুর আদেশ দেন ট্রাইব্যুনাল। মামলায় প্রসিকিউশনের পক্ষ থেকে ইনুর বিরুদ্ধে আটটি সুনির্দিষ্ট অভিযোগ আনা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে— নিজের নির্বাচনী এলাকা কুষ্টিয়ায় ছয়জনকে হত্যাসহ আন্দোলনকারীদের ওপর হামলায় উসকানি দেওয়া, শেখ হাসিনার সঙ্গে থেকে আন্দোলনকারীদের দমনে গুলির নির্দেশ দেওয়া, কুষ্টিয়ার পুলিশ সুপারকে ফোন করে আন্দোলনকারীদের গুলির নির্দেশ দেওয়া ইত্যাদি।
এ মামলায় প্রসিকিউশন পক্ষে দশজন এবং আসামিপক্ষে দুজন সাফাই সাক্ষ্য দেন। চলতি বছর ১৩ এপ্রিল যুক্তিতর্ক উপস্থাপন শুরু হয়ে ১৩ মে শেষ হয়। জুলাই গণঅভ্যুত্থান চলাকালে কুষ্টিয়ায় নিহতদের মধ্যে রয়েছেন— শ্রমিক আশরাফুল ইসলাম, সুরুজ আলী বাবু, শিক্ষার্থী আবদুল্লাহ আল মুস্তাকিন, উসামা, ব্যবসায়ী বাবলু ফরাজী ও চাকরিজীবী ইউসুফ শেখ।
আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর ২০২৪ সালের ২৬ আগস্ট রাজধানীর উত্তরা থেকে হাসানুল হক ইনুকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। তদন্ত কর্মকর্তার দেওয়া তথ্যমতে, মামলাটির তদন্ত শুরু হয় ২০২৫ সালের ৩ মার্চ। পরে তদন্ত কর্মকর্তা ২০২৫ সালের ১১ সেপ্টেম্বর প্রতিবেদন দাখিল করেন। ২০২৫ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি চার্জ গঠন করা হয়। চলতি বছরের ১৩ মে যুক্তিতর্ক শেষে মামলাটি রায়ের জন্য অপেক্ষমান রাখা হয়।
এ মামলায় ট্রাইব্যুনালে শুনানি করেন চিফ প্রসিকিউটর আমিনুল ইসলাম, প্রসিকিউটর গাজী এম এইচ তামিম, প্রসিকিউটর আব্দুস সাত্তার তরাফদার, প্রসিকিউটর মীজানুল ইসলাম, প্রসিকিউটর ফারুক আহমেদ, প্রসিকিউটর আব্দুস সাত্তার পালোয়ান প্রমুখ। অপরদিকে হাসানুল হক ইনুর পক্ষে শুনানিতে ছিলেন আইনজীবী মনসুরুল হক চৌধুরী ও নাজনীন আহসান।

নিজস্ব প্রতিবেদক