ঢাকার সঙ্গে অংশীদারত্ব আরও গভীর করতে আগ্রহী ওয়াশিংটন : মার্কিন রাষ্ট্রদূত
বাংলাদেশে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত ব্রেন্ট টি ক্রিস্টেনসেন বলেছেন, ঢাকার সঙ্গে অংশীদারত্ব আরও গভীর করতে আগ্রহী ওয়াশিংটন। আজ শনিবার (৪ জুলাই) মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ২৫০তম স্বাধীনতা বার্ষিকী উপলক্ষে বাংলাদেশ জাতীয় সংসদের দক্ষিণ প্লাজায় এক বর্ণাঢ্য অনুষ্ঠানে তিনি এ কথা বলেন।
অনুষ্ঠানে মার্কিন রাষ্ট্রদূত বলেন, একটি মুক্ত, উন্মুক্ত, নিরাপদ এবং সমৃদ্ধ ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলের অভিন্ন লক্ষ্য নিয়ে বাণিজ্য, নিরাপত্তা, জ্বালানি, স্বাস্থ্য ও বিমান চলাচল খাতে দুই দেশ দ্বিপাক্ষিক সহযোগিতা আরও সম্প্রসারিত করছে। বাংলাদেশ জাতীয় সংসদ ভবনকে এই উৎসবের একটি উপযুক্ত ভেন্যু হিসেবে উল্লেখ করে তিনি বলেন, এই প্রতিষ্ঠানটি যে গণতান্ত্রিক প্রতিশ্রুতির প্রতিনিধিত্ব করে, বাংলাদেশ তা পুনরুদ্ধার করতে সক্ষম হয়েছে। দেশের বর্তমান গণতান্ত্রিক উত্তরণকে স্বাগত জানিয়ে তিনি বলেন, ২৫০ বছর ধরে গণতন্ত্রের যে অর্থ এবং তাৎপর্য, তা উদযাপনের জন্য এর চেয়ে ভালো স্থান ও মুহূর্ত আর হতে পারে না।
১৭৭৬ সালের ৪ জুলাই আমেরিকার স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র স্বাক্ষরের কথা স্মরণ করে মার্কিন রাষ্ট্রদূত বলেন, স্বাধীনতা, সমতা এবং সুখের অন্বেষণের মতো মৌলিক নীতিগুলো বিশ্বজুড়ে গণতান্ত্রিক আন্দোলনকে অনুপ্রাণিত করেছে এবং এটি বাংলাদেশেও একইভাবে অনুরণিত হচ্ছে। সম্প্রতি দুই দেশের মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্য চুক্তি স্বাক্ষরের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, এটি দ্বিপাক্ষিক ব্যবসা-বাণিজ্য ও যৌথ সমৃদ্ধির নতুন সুযোগ তৈরি করবে।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের একটি বক্তব্য উদ্ধৃত করে ক্রিস্টেনসেন বলেন, ‘আমেরিকা ফার্স্ট মানে আমেরিকা একা নয়’। ওয়াশিংটন এমন অংশীদারত্বকে মূল্যায়ন করে যারা নিজেদের জনগণের স্বার্থে কাজ করে এবং বাংলাদেশ তেমনই একটি অংশীদার। মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও-র বক্তব্য উল্লেখ করে তিনি বলেন, ওয়াশিংটন বাংলাদেশের সঙ্গে অর্থনৈতিক ও নিরাপত্তা সহযোগিতা আরও জোরদার করতে চায়। এ সময় তিনি জাতীয় সংসদে ‘ককাস অব আমেরিকা’ গঠনের উদ্যোগকে স্বাগত জানান এবং জাতীয় সংসদ ভবনের আধুনিক স্থাপত্য ঐতিহ্যে মার্কিন স্থপতি লুই আই কানের ঐতিহাসিক অবদানকে স্বীকৃতি দিতে ‘অ্যাম্বাসেডরস ফান্ড ফর কালচারাল প্রিজারভেশন’-এর অধীনে একটি নতুন প্রকল্প চালুর ঘোষণা দেন।
এর আগে অনুষ্ঠানের শুরুতে জাতীয় সংসদের স্পিকারের অনুমোদন ও সংসদীয় নেতৃত্বের সম্মতিতে গঠিত ১০ সদস্যের সংসদীয় ককাসের আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেন ককাসের কো-চেয়ারম্যান ড. মো. মাহবুবুর রহমান, যার নেতৃত্ব দিচ্ছেন ড. মো. ওসমান ফারুক।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে জাতীয় সংসদের স্পিকার ব্যারিস্টার কায়সার কামাল বলেন, এ আয়োজনটি বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে গত পাঁচ দশকেরও বেশি সময় ধরে পারস্পরিক শ্রদ্ধা, গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ, শান্তি ও সমৃদ্ধির ওপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠা দীর্ঘস্থায়ী বন্ধুত্বেরই প্রতিফলন। তিনি বলেন, মার্কিন স্থপতি লুই আই কানের নকশা করা এই জাতীয় সংসদ ভবন যেমন দুই দেশের গভীর ঐতিহাসিক সংযোগের প্রতীক, তেমনি আমেরিকার স্থাপত্য ঐতিহ্যে বাংলাদেশি-আমেরিকান স্ট্রাকচারাল ইঞ্জিনিয়ার ফজলুর রহমান খানের অবদানও অনস্বীকার্য।
১৯৭১ সালে জর্জ হ্যারিসনের ঐতিহাসিক ‘কনসার্ট ফর বাংলাদেশ’-এর কথা স্মরণ করে জাতীয় সংসদের স্পিকার বলেন, সংগীত দীর্ঘকাল ধরে দুই দেশের মধ্যে একটি অনন্য সেতু হিসেবে কাজ করেছে। বাংলাদেশ জাতীয় সংসদ এবং মার্কিন কংগ্রেসের মধ্যে দ্বিপাক্ষিক সহযোগিতা আগামী দিনে গণতান্ত্রিক চর্চা ও সংসদীয় সম্পর্ককে আরও সুদৃঢ় করবে বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।
অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথির বক্তব্যে চিফ হুইপ মো. নূরুল ইসলাম বলেন, জাতীয় সংসদে এই ফ্রিডম ২৫০ উদযাপন বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার জোরালো গণতান্ত্রিক বন্ধনের প্রতীক। বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে শক্তিশালী করতে এবং বিভিন্ন খাতে সহযোগিতা সম্প্রসারণে আমেরিকার ধারাবাহিক সমর্থন প্রত্যাশা করেন তিনি।
অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত থেকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে ২৫০তম স্বাধীনতা বার্ষিকীর শুভেচ্ছা জানান জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা ও বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান। তিনি সংসদীয় ককাস গঠনকে স্বাগত জানিয়ে বলেন, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের একটি দীর্ঘদিনের পরীক্ষিত বন্ধু। আমাদের স্বাধীনতা যুদ্ধের তাদের অবদান রয়েছে। এছাড়া রোহিঙ্গা সমস্যা ও শরণার্থীদের মানবিক সহায়তা প্রদান এবং কোভিড-১৯ মহামারির সংকটকালীন সময়ে আমেরিকার সহযোগিতা অত্যন্ত প্রশংসনীয়। পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও অভিন্ন স্বার্থের ভিত্তিতে আগামী দিনেও দুই দেশের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক আরও বিস্তৃত হবে এবং এর মাধ্যমে গণতন্ত্র, মানবাধিকার ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতা আরও শক্তিশালী হবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ২৫০তম স্বাধীনতা বার্ষিকী উদযাপনের অংশ হিসেবে অনুষ্ঠানে মার্কিন সেনাবাহিনীর ২৫তম ইনফ্যান্ট্রি ডিভিশন ব্যান্ডের একটি বিশেষ সংগীত পরিবেশনা দর্শকদের মুগ্ধ করে। ঐতিহ্যবাহী মার্কিন ও বাংলাদেশি গানের সুর একই মঞ্চে একইসঙ্গে পরিবেশন করে দুই দেশের সংস্কৃতির মেলবন্ধন তুলে ধরা হয়। বর্ণিল ও মর্যাদাপূর্ণ এই অনুষ্ঠানে অন্তর্বর্তী সরকারের বিভিন্ন উপদেষ্টা, মন্ত্রিসভার সদস্যবৃন্দ, জাতীয় সংসদের সংসদ সদস্যবৃন্দ, ঢাকাস্থ মার্কিন দূতাবাসের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাবৃন্দ, বাংলাদেশে নিযুক্ত বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রদূত ও হাইকমিশনারগণ এবং সমাজের বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ উপস্থিত ছিলেন।

মোঃ জাকের হোসেন (Md Zaker Hossain)