স্থায়ী বাঁধের অভাবে ২৫ বছরে বিলীন আড়াই কিলোমিটার কুয়াকাটা সৈকত
সাগরের উত্তাল ঢেউয়ের লাগাতার আঘাতে ভয়াবহ ভাঙনের মুখে পড়েছে দেশের অন্যতম পর্যটন কেন্দ্র পটুয়াখালীর কুয়াকাটা সমুদ্র সৈকত। গত ২৫ বছরে অন্তত আড়াই কিলোমিটার দীর্ঘ বেলাভূমি সাগরগর্ভে বিলীন হয়েছে। হারিয়ে গেছে প্রাকৃতিক সৌন্দর্যমণ্ডিত একাধিক স্পট, ২০০ একর আয়তনের নারকেল বাগানের প্রায় ৯৯ শতাংশ এবং বিভিন্ন স্থাপনা। তবে দীর্ঘদিন ধরে পরিকল্পনা ও প্রকল্পের আলোচনা হলেও এখন পর্যন্ত সৈকত রক্ষায় কোনো স্থায়ী প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা বাস্তবায়িত হয়নি।
সৈকতের শূন্য পয়েন্টে আট বছর ধরে ডাব বিক্রি করা স্বপন মিয়া বলেন, আর মনে হয় এখানে দোকান করা যাবে না। এ বছরই হয়তো আমার দোকান ঢেউয়ে ভেসে যাবে। একই ধরনের শঙ্কা প্রকাশ করেছেন সৈকতের শত শত ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী। তাদের ভাষ্য, চলতি বছরেই তিন থেকে চার দফা সাগরের তাণ্ডবে সৈকতের বড় অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এতে ব্যবসা-বাণিজ্য মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় তারা হতাশ হয়ে পড়েছেন।
প্রতি বর্ষা মৌসুমেই উত্তাল ঢেউয়ের আঘাতে সৈকতের দীর্ঘ এলাকা ভাঙনের কবলে পড়ে। সাম্প্রতিক ভাঙনে ট্যুরিজম পার্ক, নির্মাণাধীন সড়ক, জাতীয় উদ্যান ও অসংখ্য গাছপালা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বর্তমানে ট্যুরিজম পার্ক, মসজিদ-মন্দির এবং বেড়িবাঁধের বাইরের সাগরসংলগ্ন বিভিন্ন স্থাপনা চরম ঝুঁকিতে রয়েছে।
স্থানীয় ব্যবসায়ী সালাহ উদ্দিন বলেন, জোয়ারের সময় এখন পর্যটকরা সৈকতে হাঁটতেই পারেন না। সৈকত অনেকটা নদীর পাড়ের মতো হয়ে গেছে। ছাতা-বেঞ্চিতে বসে প্রাকৃতিক সৌন্দর্য উপভোগের সুযোগও নেই।
পর্যটক আহসান উদ্দিন বলেন, জোয়ারের সময় গোসলে নামা অত্যন্ত বিপজ্জনক। ভাঙন এলাকায় ঘূর্ণিস্রোত তৈরি হয়। কংক্রিটের ভাঙা অংশে আহত হওয়ার ঝুঁকি থাকে। প্রাণহানির ঘটনাও ঘটেছে। সৈকত রক্ষায় দ্রুত স্থায়ী পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন।
পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) কলাপাড়া কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, ২০০৩ সাল থেকে কুয়াকাটা সৈকত রক্ষায় একাধিকবার উন্নয়ন প্রকল্পের প্রস্তাব মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। ২০১৮ সালে সম্পূর্ণ সরকারি অর্থায়নে ২১২ কোটি টাকা ব্যয়ে শূন্য পয়েন্টের উভয় পাশে পাঁচ কিলোমিটার এলাকা সংরক্ষণের একটি প্রকল্প গ্রহণ করা হলেও তা বাস্তবায়নের মুখ দেখেনি।
বর্তমানে সৈকতের শূন্য পয়েন্টের প্রায় ৩০০ মিটার এলাকায় জরুরি ভিত্তিতে স্থাপন করা জিও টিউব ও জিও ব্যাগই একমাত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা হিসেবে রয়েছে। তবে এসবের বালু বেরিয়ে গেছে, শ্যাওলা জমে পিচ্ছিল হয়ে পড়েছে। এতে প্রায়ই পর্যটক আহত হচ্ছেন। ট্যুরিস্ট পুলিশ জানিয়েছে, জোয়ারের সময় গোসলে নেমে এসব জিও ব্যাগ ও টিউবের ফাঁদে আটকে এ পর্যন্ত তিনজন পর্যটকের মৃত্যু হয়েছে।
স্থানীয় বাসিন্দা, পর্যটক এবং বিনিয়োগকারীরা আশঙ্কা প্রকাশ করে বলেন, দ্রুত কার্যকর স্থায়ী প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা গ্রহণ না করলে কুয়াকাটার আরও বড় অংশ সাগরে বিলীন হবে। একই সঙ্গে বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাও হুমকির মুখে পড়বে।
পাউবো কলাপাড়ার নির্বাহী প্রকৌশলী মো. শাহ আলম বলেন, ২০২৩ সালে ‘কুয়াকাটা সমুদ্র সৈকত রক্ষা ও উন্নয়ন’ নামে একটি প্রকল্প গ্রহণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ৭৫৯ কোটি ৫৬ লাখ ৭৯ হাজার টাকা ব্যয়ের প্রস্তাবিত এ প্রকল্পের আওতায় ভাঙনপ্রবণ প্রায় ১২ কিলোমিটার এলাকা সংরক্ষণের পরিকল্পনা রয়েছে। প্রকল্পে ৬৮টি গ্রোয়েন নির্মাণ, ট্যুরিজম পার্ক ও মসজিদ-মন্দির এলাকায় ৬০০ মিটার প্রতিরক্ষা কাজ এবং ২ দশমিক ৭ কিলোমিটার স্লিপিং ডিফেন্স নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে। প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে সৈকতের ভাঙন অনেকাংশে নিয়ন্ত্রণে আসবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।
পাউবোর তথ্য অনুযায়ী, ৪৮ নম্বর পোল্ডারের ১৭ দশমিক ২৫০ কিলোমিটার থেকে ৩৭ দশমিক ২৫০ কিলোমিটার পর্যন্ত প্রায় ২০ কিলোমিটার এলাকাই কুয়াকাটা সমুদ্র সৈকতের অন্তর্ভুক্ত। এর মধ্যে গঙ্গামতি লেক থেকে আন্ধারমানিক নদীর মোহনা পর্যন্ত প্রায় সাড়ে ১০ কিলোমিটার এলাকা পর্যটকদের সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত হয়। এই অংশের মধ্যে প্রায় ৫ দশমিক ১ কিলোমিটার এলাকা তীব্র ভাঙনের শিকার এবং এর প্রায় আড়াই কিলোমিটার বর্তমানে অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। ২০২৩ সালে জরুরি ভিত্তিতে প্রায় দুই কিলোমিটার এলাকায় জিও টেক্সটাইল ব্যাগ ও জিও টিউব স্থাপন করা হয়।
কুয়াকাটা হোটেল-মোটেল ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মোতালেব শরীফ বলেন, কুয়াকাটার সবচেয়ে বড় সমস্যা এখন সৈকতের স্থায়ী সুরক্ষা নিশ্চিত করা। এরপর প্রয়োজন মেরিন ড্রাইভ নির্মাণ। সাগরভাঙন রোধে দ্রুত স্থায়ী পরিকল্পনা বাস্তবায়ন না হলে পর্যটন শিল্প বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়বে।
কুয়াকাটা বিচ ম্যানেজমেন্ট কমিটির সদস্য সচিব ও কলাপাড়ার সদ্য বিদায়ী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা কাউছার হামিদ বলেন, সৈকত রক্ষায় স্থায়ী ও কার্যকর ব্যবস্থা নিতে পানি উন্নয়ন বোর্ডকে তাগিদ দেওয়া হয়েছে। দ্রুত উদ্যোগ গ্রহণ না করলে দেশের অন্যতম পর্যটন কেন্দ্র কুয়াকাটার অস্তিত্বই হুমকির মুখে পড়তে পারে।

কাজল বরণ দাস, পটুয়াখালী