ইতিহাস চর্চাই জাতির আত্মপরিচয় ও ভবিষ্যৎ নির্মাণের ভিত্তি : ডেপুটি স্পিকার
জাতীয় সংসদের ডেপুটি স্পিকার ব্যারিস্টার কায়সার কামাল বলেছেন, ইতিহাস চর্চাই জাতির আত্মপরিচয় ও ভবিষ্যৎ নির্মাণের ভিত্তি।
আজ বুধবার (৮ জুলাই) ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-শিক্ষক কেন্দ্র (টিএসসি) মিলনায়তনে অনুষ্ঠিত ইতিহাস বিভাগের ২০তম সেমিস্টার ব্যাচের নবীন বরণ অনুষ্ঠানে এ কথা বলেন।
ডেপুটি স্পিকার বলেন, আমিও আপনাদের মতো ১৯৮৯–৯০ শিক্ষাবর্ষে ঐতিহ্যবাহী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের একজন ছাত্র ছিলাম। ছাত্রজীবনের স্মৃতি কখনো মুছে যায় না। আজ এই মিলনায়তনে উপস্থিত হয়ে আমার মনে হচ্ছে, যেন আমি আবার সেই দিনগুলোতে ফিরে গেছি। এখানে আমার অনেক শ্রদ্ধেয় শিক্ষক উপস্থিত রয়েছেন। তাদের সান্নিধ্য আমাকে গভীরভাবে আবেগাপ্লুত করেছে।
ব্যারিস্টার কায়সার কামাল বলেন, একদিন আমিও আপনাদের মতো এই বিভাগের করিডোরে বুকভরা স্বপ্ন, প্রত্যাশা এবং কিছুটা শঙ্কা নিয়ে হেঁটেছি। কিন্তু এই বিভাগ আমাকে শুধু পাঠ্য বইয়ের জ্ঞান দেয়নি; শিখিয়েছে মানুষকে বুঝতে, সমাজকে বিশ্লেষণ করতে এবং দেশ ও জাতির প্রতি দায়িত্ববোধ নিয়ে কাজ করতে। ইতিহাস বিভাগ আমার চিন্তা, মূল্যবোধ ও নেতৃত্বের ভিত্তি নির্মাণ করেছে।
নবীন শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে ডেপুটি স্পিকার বলেন, আপনারা এমন একটি বিভাগে ভর্তি হয়েছেন, যেখানে শুধু অতীতের ঘটনা মুখস্থ করা শেখানো হয় না। ইতিহাস আমাদের শেখায় কেন একটি ঘটনা ঘটেছিল, তার সামাজিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপট কী ছিল এবং সেই অভিজ্ঞতা থেকে ভবিষ্যতের জন্য কী শিক্ষা গ্রহণ করা যায়। ইতিহাস একটি জাতির আত্মপরিচয়ের আয়না। যে জাতি তার ইতিহাসকে জানে না, সে ভবিষ্যতের পথও আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে নির্মাণ করতে পারে না।
ব্যারিস্টার কায়সার কামাল আরও বলেন, এই বিভাগে অধ্যয়নের মাধ্যমে আপনারা যুক্তিনির্ভর চিন্তাশক্তি, বিশ্লেষণী ক্ষমতা, গবেষণামনস্কতা এবং সত্য অনুসন্ধানের মানসিকতা অর্জন করবেন। এসব গুণ শুধু একজন ইতিহাসবিদ হওয়ার জন্য নয়; রাষ্ট্র পরিচালনা, প্রশাসন, বিচারব্যবস্থা, কূটনীতি, সাংবাদিকতা, শিক্ষা, গবেষণা, উন্নয়ন এবং করপোরেট নেতৃত্বসহ জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ।
নিজের অভিজ্ঞতার কথা উল্লেখ করে ডেপুটি স্পিকার বলেন, জীবনের নানা প্রতিকূলতা, সংগ্রাম ও চ্যালেঞ্জ অতিক্রম করার পেছনে ইতিহাস বিভাগে অর্জিত শিক্ষা আমাকে সাহস ও প্রেরণা দিয়েছে। আজ আমি যে অবস্থানে রয়েছি, তার পেছনে এই বিভাগের অবদান আমি গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করি।
ডেপুটি স্পিকার বলেন, আপনাদের মধ্য থেকেই ভবিষ্যতের শিক্ষক, গবেষক, বিসিএস কর্মকর্তা, কূটনীতিক, বিচারক, সাংবাদিক, লেখক, উদ্যোক্তা, নীতিনির্ধারক এবং রাষ্ট্রনায়কেরা উঠে আসবেন। তাই বিশ্ববিদ্যালয় জীবনকে শুধু একটি ডিগ্রি অর্জনের পর্যায় হিসেবে নয়, বরং নিজেকে একজন যোগ্য, মানবিক ও দায়িত্বশীল নাগরিক হিসেবে গড়ে তোলার সুযোগ হিসেবে গ্রহণ করতে হবে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ঐতিহাসিক ভূমিকার কথা তুলে ধরে ব্যারিস্টার কায়সার কামাল বলেন, প্রাচ্যের অক্সফোর্ডখ্যাত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেবল উচ্চশিক্ষার একটি প্রতিষ্ঠান নয়; এটি বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক আন্দোলন, অসাম্প্রদায়িক চেতনা এবং জাতীয় মুক্তির ইতিহাসের অন্যতম প্রধান কেন্দ্র। ১৯৫২ সালের মহান ভাষা আন্দোলন, ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধ, ১৯৯০ সালের গণঅভ্যুত্থান এবং গণতন্ত্র ও জনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠার প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ আন্দোলনে এই বিশ্ববিদ্যালয় পথপ্রদর্শকের ভূমিকা পালন করেছে।
ডেপুটি স্পিকার বলেন, দেশ যখনই কোনো সংকট, দুর্যোগ বা জাতীয় চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হয়েছে, তখনই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় জাতিকে দিকনির্দেশনা দিয়েছে। এই বিশ্ববিদ্যালয় সব সময় একটি আলোকবর্তিকার মতো জাতিকে সামনে এগিয়ে যাওয়ার সাহস যুগিয়েছে। তাই আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি কঠিন সময়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় জাতির জন্য আশা, প্রেরণা ও সম্ভাবনার প্রতীক।
নবীন শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে ডেপুটি স্পিকার ব্যারিস্টার কায়সার কামাল আরও বলেন, নিয়মিত ক্লাসে উপস্থিত থাকুন, প্রতিদিনের পড়াশোনা প্রতিদিন সম্পন্ন করুন এবং সময়ানুবর্তিতা ও শৃঙ্খলাকে জীবনের অংশ করে তুলুন। মনে রাখবেন, মেধা গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু মেধার সঠিক বিকাশ ঘটে অধ্যবসায়, সততা, শৃঙ্খলা এবং পরিশ্রমের মাধ্যমে। বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে সহনশীলতা, পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ, মুক্তচিন্তা ও মানবিক মূল্যবোধ চর্চা করুন।
ডেপুটি স্পিকার আশা প্রকাশ করে বলেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের দীর্ঘ গৌরবময় ঐতিহ্য আপনারাও সমুন্নত রাখবেন। দেশ-বিদেশে নিজেদের কর্মদক্ষতা, সততা ও মেধার মাধ্যমে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি আরও উজ্জ্বল করবেন। আপনাদের সাফল্যই হবে এই বিভাগের এবং এই বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বোচ্চ অর্জন। আমি আপনাদের প্রত্যেকের উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ কামনা করছি। আল্লাহ আপনাদের সহায় হোন।

নিজস্ব প্রতিবেদক