৬ মাসে নওগাঁয় ২৫ মরদেহ উদ্ধার
সামাজিক অবক্ষয়, পারিবারিক সহিংসতা, জমিজমা নিয়ে বিরোধ, দেনা-পাওনার দ্বন্দ্ব, মাদক, নৈতিক মূল্যবোধের অবক্ষয় ও প্রযুক্তির অপব্যবহারের মতো নানা কারণে নওগাঁ জেলায় উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে হত্যাকাণ্ডের ঘটনা। একের পর এক খুনের ঘটনায় সাধারণ মানুষের মধ্যে আতঙ্ক বিরাজ করছে। এতে অনেক পরিবার যেমন তাদের একমাত্র উপার্জনক্ষম সদস্যকে হারাচ্ছে, তেমনি অনেক পরিবার অর্থনৈতিক ও সামাজিকভাবে চরম সংকটে পড়ছে।
তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে জুন মাস পর্যন্ত জেলার বিভিন্ন উপজেলা থেকে অন্তত ২৫টি মরদেহ উদ্ধার করেছে পুলিশ। এসব ঘটনার অধিকাংশই হত্যা, পারিবারিক সহিংসতা কিংবা রহস্যজনক মৃত্যুর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট।
ছয় মাসের কয়েকটি আলোচিত ঘটনা-
গত ২৯ জুন মহাদেবপুর উপজেলার ছোট মহেশপুর গ্রামে বৃষ্টির পানি নিষ্কাশনকে কেন্দ্র করে ভাতিজা চপলের হাতে চাচা আব্দুল জব্বার (৬৫) নিহত হন।
২৮ জুন সদর উপজেলার নামাজগড় গাউসুল আজম কামিল মাদ্রাসার অষ্টম শ্রেণির ছাত্র আব্দুল্লাহ আল নিরবের (১৪) মরদেহ মাদ্রাসা সংলগ্ন এলাকা থেকে উদ্ধার করা হয়।
১৭ জুন আত্রাই উপজেলার শাহাগোলা রেললাইনের পাশ থেকে শিক্ষক নেয়ামুল বাশিরের (৫৩) রক্তাক্ত মরদেহ উদ্ধার করা হয়। স্বজনরা জানান, সিএনজিচালিত অটোরিকশায় নওগাঁ যাওয়ার পথে তিনি নিখোঁজ হন এবং পরদিন তার মরদেহ মেলে। এ ঘটনায় অজ্ঞাতনামা আসামিদের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে।
৮ জুন মান্দা উপজেলার হাটোর গ্রামে আম পাড়াকে কেন্দ্র করে মাদক ব্যবসায়ীদের মারধরে তৈয়বুর রহমান মোল্লা (৬৫) মারা যান।
৭ জুন একই উপজেলার ছুটিপুর গ্রামে জমি সংক্রান্ত বিরোধে লাঠির আঘাতে নিহত হন আব্দুল হামিদ (৬৫)।
৭ মে নওগাঁ সদর উপজেলার আরজি-নওগাঁ এলাকায় বিয়ের দেড় মাসের মাথায় যৌতুকের দাবিতে গৃহবধূ ফাল্গুনিকে শ্বাসরোধে হত্যার অভিযোগ ওঠে স্বামী মোরশেদের বিরুদ্ধে।
২০ এপ্রিল নিয়ামতপুর উপজেলার বাহাদুরপুর গ্রামে জমি নিয়ে বিরোধের জেরে একই পরিবারের চার সদস্য- হাবিবুর রহমান (৩৫), তার স্ত্রী পপি সুলতানা (২৫), ছেলে পারভেজ রহমান (৯) ও মেয়ে সাদিয়া আক্তারকে (৩) গলা কেটে হত্যা করা হয়।
১ এপ্রিল পোরশা উপজেলার শীতলি ডাঙ্গাপাড়া গ্রামে একটি ডিম ভাজাকে কেন্দ্র করে স্বামী আব্দুল মকিমের মারধরে মরজিনা খাতুন রুপসির (২৬) মৃত্যু হয়। নিহতের বৃদ্ধ বাবা মশিউর রহমান বলেন, জামাই এখন কারাগারে এবং তাদের ৬টি সন্তানকে নিয়ে তিনি চরম মানবেতর জীবন কাটাচ্ছেন।
৬ মার্চ আত্রাই উপজেলার বলরামচক গ্রামে মাদকাসক্ত জয় সরকার (২৫) তার স্ত্রী বৃষ্টি রানী (২০) ও আড়াই বছরের কন্যা জিনি সরকারকে হত্যা করে নিজে আত্মহত্যা করেন।
১৮ জানুয়ারি ধামইরহাট উপজেলার নানাইচ গ্রামে সিরিয়াল কিলার গোলাম মোরশেদের হামলায় গুরুতর আহত কলেজছাত্রী উম্মে হাবিবা চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান।
এছাড়াও এই ছয় মাসে সাপাহার, পোরশা, পত্নীতলা, বদলগাছী, রানীনগর ও সদর উপজেলার বিভিন্ন স্থান থেকে আরও বেশ কয়েকটি ঝুলন্ত, ভাসমান ও নিখোঁজ ব্যক্তির মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ।
সংশ্লিষ্টদের মতে, সমাজে নিজস্ব সংস্কৃতি ও নৈতিক শিক্ষার চর্চার অভাব, পারিবারিক বন্ধনের দুর্বলতা, মাদকের বিস্তার, বেকারত্ব ও প্রযুক্তির অপব্যবহার তরুণদের অপরাধের দিকে ঠেলে দিচ্ছে।
নওগাঁর সমাজকর্মী নাইস পারভীন বলেন, সাম্প্রতিক অধিকাংশ হত্যাকাণ্ডে তরুণদের সম্পৃক্ততা উদ্বেগজনক। সন্তানদের প্রতি অভিভাবকদের নজরদারি বাড়াতে হবে এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড জোরদার করতে হবে।
নওগাঁ জজ আদালতের আইনজীবী মো. মাহ্ফুজুর রহমান বলেন, ধর্মীয় ও নৈতিক শিক্ষার প্রসার ঘটাতে পারলে এই ধরনের অপরাধ অনেকাংশে কমিয়ে আনা সম্ভব।
নওগাঁর পুলিশ সুপার মোহাম্মদ তারিকুল ইসলাম বলেন, জেলার অধিকাংশ হত্যাকাণ্ডই পারিবারিক বিরোধ বা সহিংসতার জেরে ঘটছে। ভাই ভাইকে কিংবা স্বামী স্ত্রীকে হত্যা করার মতো ঘটনা ঘটছে।
পুলিশ সুপার আরও বলেন, অধিকাংশ ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের ইতোমধ্যেই গ্রেপ্তার করা হয়েছে। সামাজিক অবক্ষয় প্রতিরোধে জেলা পুলিশ বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে মাদক, বাল্যবিবাহ ও সাইবার অপরাধ প্রতিরোধে সচেতনতামূলক সভা পরিচালনা করছে।

আসাদুর রহমান জয়, নওগাঁ