জিয়াউর রহমান হত্যাকাণ্ড : যেভাবে ধরা পড়েন পলাতক আসামি মেজর মোজাফফর
চলতি বছর গ্রেপ্তার হওয়া অবসরপ্রাপ্ত লেফটেন্যান্ট জেনারেল মাসুদ উদ্দিন চৌধুরীর সহযোগীকে গ্রেপ্তার করতে গিয়ে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউটরের হাতে শনাক্ত হন শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান হত্যাকাণ্ডের পলাতক আসামি মেজর (অব.) মোজাফফর হোসেন।
গত ১৬ জুলাই রাজধানীর বনানীর একটি বাড়ি থেকে ৭৭ বছর বয়সী দণ্ডপ্রাপ্ত পলাতক এই আসামিকে গ্রেপ্তার করা হয়। পরদিন তাকে মিলিটারি পুলিশের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে।
মোজাফফর হোসেনকে গ্রেপ্তারের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের অন্যতম নৃশংস এই হত্যাকাণ্ডটি আবারও নতুন করে আলোচনায় এসেছে।
যেভাবে ধরা পড়লেন মোজাফফর হোসেন
তদন্তকারী সংস্থার সূত্র জানায়, জুলাই অভ্যুত্থানের সময় সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারের দায়িত্বে থাকা আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের (আইসিটি) একটি অভিযোগের তদন্তের সূত্র ধরে মোজাফফর হোসেনের অবস্থান শনাক্ত করা হয়।
চলতি বছরের শুরুর দিকে গ্রেপ্তার হওয়া অবসরপ্রাপ্ত লেফটেন্যান্ট জেনারেল মাসুদ উদ্দিন চৌধুরীর মোবাইল ফোন ফরেনসিক পরীক্ষা করার সময় কিছু সন্দেহজনক নম্বরের খোঁজ পান আইসিটির তদন্ত কর্মকর্তারা। পরে পুলিশ তাদের গোয়েন্দা ও প্রযুক্তিগত বিশ্লেষণের মাধ্যমে নিশ্চিত হয়, নম্বরগুলো পলাতক মেজর মোজাফফর হোসেনের। এর পরই বনানীতে আত্মগোপনে থাকা অবস্থায় তাকে গ্রেপ্তার করা হয়।
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউটর তানভীর জোহা এনটিভি অনলাইনকে বলেন, লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) মাসুদ উদ্দিন চৌধুরীর ব্যক্তিগত সচিবকে (পিএস) খুঁজছিলাম। পরে মাসুদ উদ্দিন চৌধুরীর মোবাইল ফোনে নম্বর খুঁজতে গিয়ে সন্দেহজনক একটি নম্বর পাই। ওই নম্বর থেকে একাধিকবার কল ও এসএমএস আদান প্রদান করা হয়। পরে সেই সূত্র ধরে মোজাফফর হোসেনকে খুঁজে বের করে গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)।
নথি অনুযায়ী, ১৯৮১ সালের ৩০ মে চট্টগ্রাম সার্কিট হাউসে সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের ওপর সংঘটিত হামলায় সরাসরি অংশ নেওয়া সশস্ত্র সেনা কর্মকর্তাদের একজন হলেন মোজাফফর হোসেন। হত্যাকাণ্ডের পর থেকেই তিনি দীর্ঘ সাড়ে চার দশক ধরে পলাতক ছিলেন।
চট্টগ্রাম সার্কিট হাউসের সেই রক্তাক্ত ভোর
১৯৮১ সালের ২৯ মে দুই দিনের সফরে চট্টগ্রাম যান তৎকালীন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান। রাতে তিনি চট্টগ্রাম সার্কিট হাউসে অবস্থান করছিলেন।
৩০ মে ভোর আনুমানিক ৪টার দিকে একদল সেনা কর্মকর্তা আচমকা সার্কিট হাউসে হামলা চালায়। সামরিক যানবাহন নিয়ে পুরো এলাকা ঘিরে ফেলে নির্বিচারে গুলি ছুড়তে ছুড়তে তারা ভবনের দোতলায় রাষ্ট্রপতির কক্ষে প্রবেশ করে। সেখানেই ব্রাশফায়ারে নির্মমভাবে হত্যা করা হয় রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানকে।
রাষ্ট্রপতির নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা কর্নেল এহসান এবং ক্যাপ্টেন হাফিজও ঘাতকদের গুলিতে ঘটনাস্থলেই নিহত হন।
গোপন দাফন ও পরবর্তী ঘটনাপ্রবাহ
হত্যাকাণ্ডের পর সার্কিট হাউস থেকে মরদেহ সরিয়ে চট্টগ্রামের রাঙ্গুনিয়ার একটি পাহাড়ের পাদদেশে রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান, কর্নেল এহসান ও ক্যাপ্টেন হাফিজকে গোপনে দাফন করা হয়।
১ জুন সরকারি বাহিনী চট্টগ্রামের নিয়ন্ত্রণ পুনরুদ্ধার করার পর এই কবরের সন্ধান পায়। এরপর লাশগুলো তুলে প্রথমে চট্টগ্রাম সেনানিবাসে এবং পরে হেলিকপ্টারযোগে ঢাকায় আনা হয়। শেরেবাংলা নগরের ক্রিসেন্ট লেকের পাশে লাখো মানুষের জানাজা শেষে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় সমাহিত করা হয় জিয়াউর রহমানকে।
অন্যদিকে, এই ব্যর্থ সেনা অভ্যুত্থানের মূল পরিকল্পনাকারী মেজর জেনারেল আবুল মনজুর হাটহাজারীতে পুলিশের কাছে আত্মসমর্পণ করলেও পরে সেনা হেফাজতে থাকা অবস্থায় তিনি নিহত হন। এছাড়া অভিযানের সময় নিহত হন আরও কয়েকজন বিদ্রোহী কর্মকর্তা।
সামরিক আদালত ও বিচার
হত্যাকাণ্ড এবং ব্যর্থ অভ্যুত্থানের দায়ে গঠিত একটি সামরিক আদালতে ১৮ জন সেনা কর্মকর্তার বিচার করা হয়। বিচার শেষে ১৩ জনকে মৃত্যুদণ্ড এবং ৫ জনকে বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড দেওয়া হয়।
মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্তদের মধ্যে ১২ জনের রায় দ্রুত কার্যকর করা হলেও, আহত এক কর্মকর্তার রায় কার্যকর হয় ঘটনার প্রায় দুই বছর পর। এছাড়া ২০ জন সেনা কর্মকর্তাকে চাকরি থেকে বরখাস্ত করা হয়েছিল।
সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, দীর্ঘ ৪৫ বছর পর মোজাফফর হোসেন গ্রেফতার হওয়ার ফলে এই মামলার দণ্ডপ্রাপ্ত পলাতক আসামিদের সংখ্যা এখন শূন্যের কোঠায় নেমে এলো।
সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান হত্যাকাণ্ডের দীর্ঘ ৪৫ বছর পর দণ্ডপ্রাপ্ত পলাতক আসামি সাবেক সেনা কর্মকর্তা মোজাফফর হোসেনকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। গত ১৬ জুলাই রাজধানীর বনানীর একটি বাড়ি থেকে ৭৭ বছর বয়সী এই আসামিকে গ্রেপ্তার করা হয়। পরদিন তাঁকে মিলিটারি পুলিশের কাছে হস্তান্তর করা হয়।

নিজস্ব প্রতিবেদক